ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার অবশেষে শাসক লেবার পার্টির যাচাইকরণ বা 'ভেটিং' প্রক্রিয়াটি জনসমক্ষে প্রকাশ করতে সম্মত হয়েছেন। যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে পিটার ম্যানডেলসনকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। বিলিয়নিয়ার যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টাইনের সঙ্গে এই কূটনীতিকের সম্পর্কের নতুন তথ্য ফাঁস হওয়ার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মার্কিন বিচার বিভাগের (DOJ) তদন্ত সংক্রান্ত ফাইলে দেখা গেছে, ২০০৮ সালে নাবালিকার সঙ্গে যৌন সংসর্গের দায়ে এপস্টাইনের সাজা হওয়ার পরও ম্যানডেলসন তার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। তবে বর্তমানে ম্যানডেলসনের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ হলো, তিনি প্রয়াত এই বিতর্কিত ধনকুবেরের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করেছেন এবং শেয়ার বাজারের সংবেদনশীল গোপন তথ্য তার কাছে পাচার করেছেন।
উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে যৌন কেলেঙ্কারি ও পাচারের অভিযোগে দ্বিতীয়বার বিচারের মুখোমুখি হওয়ার আগেই কারাগারে আত্মহত্যা করেন এপস্টাইন। বৃহস্পতিবার, এপস্টাইনের সঙ্গে ম্যানডেলসনের সম্পর্ক জানা সত্ত্বেও তাকে রাষ্ট্রদূত নিয়োগের জন্য এপস্টাইনের শিকারদের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী স্টারমার।
স্টারমার বলেন, "এটি আগে থেকেই জানা ছিল যে ম্যানডেলসন এপস্টাইনকে চিনতেন। কিন্তু আমাদের কেউই জানত না এই সম্পর্কের গভীরতা এবং অন্ধকার দিকটি কতটা ভয়াবহ ছিল।" তিনি আরও বলেন, "আমি দুঃখিত। আপনাদের সঙ্গে যা হয়েছে তার জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী। ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা আপনাদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং ম্যানডেলসনের মিথ্যা কথায় বিশ্বাস করে তাকে নিয়োগ দেওয়ায় আমি লজ্জিত।"
পিটার ম্যানডেলসন কে এবং তার বিরুদ্ধে অভিযোগ কী?
শুক্রবার এপস্টাইনের ফাইলের নতুন কিস্তি প্রকাশের পর থেকেই ব্রিটিশ মিডিয়ায় তোলপাড় শুরু হয়েছে। ফাঁস হওয়া ইমেইলগুলো থেকে জানা যায়, প্রায় ১৫ বছর আগে ম্যানডেলসন অবৈধভাবে বাজারের গোপন তথ্য এপস্টাইনকে পাচার করেছিলেন বলে সন্দেহ করছে সরকার। সদ্য প্রকাশিত এই ফাইলে ৩০ লাখেরও বেশি নথিপত্র এবং হাজার হাজার ছবি ও ভিডিও রয়েছে।
৭২ বছর বয়সী ম্যানডেলসন একজন প্রবীণ লেবার রাজনীতিবিদ এবং ১৯৯৭ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার ও গর্ডন ব্রাউনের মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন। গত সপ্তাহে তিনি হাউস অফ লর্ডস থেকে পদত্যাগ করেন। ২০২৪ সালে লেবার পার্টি ক্ষমতায় ফেরার পর তাকে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত করা হয়েছিল। তবে গত রোববার তিনি দল থেকেও পদত্যাগ করেন।
ব্রিটিশ মিডিয়ায় প্রকাশিত এক চিঠিতে ম্যানডেলসন বলেন, "জেফরি এপস্টাইনকে ঘিরে যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে, তার সঙ্গে আবারও আমার নাম জড়ানোয় আমি অনুতপ্ত। দলকে আর কোনো বিব্রতকর পরিস্থিতিতে না ফেলতে আমি সদস্যপদ ত্যাগ করছি।"
২০০৯ সালে যখন তিনি যুক্তরাজ্যের বাণিজ্যমন্ত্রী ছিলেন, তখনই তিনি সংবেদনশীল তথ্য ফাঁস করেছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে। গত সেপ্টেম্বরে এপস্টাইনের সঙ্গে ইমেইল চালাচালির জেরে তাকে রাষ্ট্রদূতের পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়। মঙ্গলবার যুক্তরাজ্য পুলিশ তার বিরুদ্ধে সরকারি অফিসে অসদাচরণের অভিযোগে তদন্ত শুরু করেছে, যার সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।
জেফরি এপস্টাইন কে ছিলেন?
নিউ ইয়র্কে বেড়ে ওঠা বিলিয়নিয়ার জেফরি এপস্টাইন সেলিব্রেটি ও রাজনীতিবিদদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার জন্য পরিচিত ছিলেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি শত শত কিশোরীকে যৌন নির্যাতন করেছেন। ২০১৯ সালে যৌন পাচারের অভিযোগে তিনি গ্রেপ্তার হন এবং বিচারের আগেই কারাগারে মারা যান।
২০০৮ সালে তিনি একজন নাবালিকাকে পতিতা বৃত্তিতে বাধ্য করার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন এবং ১৩ মাস কারাদণ্ড ভোগ করেন। তার সহযোগী ও প্রাক্তন প্রেমিকা জিসলেইন ম্যাক্সওয়েল বর্তমানে ২০ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন।
ম্যানডেলসন ও এপস্টাইনের সম্পর্কের গভীরতা
সেপ্টেম্বরে ম্যানডেলসনকে বরখাস্ত করার সময় ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছিল, নতুন পাওয়া ইমেইল প্রমাণ করে যে তাদের সম্পর্ক ধারণার চেয়েও অনেক গভীর ছিল। 'দ্য সান' পত্রিকায় প্রকাশিত ইমেইলে দেখা যায়, ২০০৮ সালে এপস্টাইনের সাজার আগে ম্যানডেলসন তাকে "দ্রুত মুক্তির জন্য লড়াই" করতে বলেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, "আমি তোমাকে অনেক সম্মান করি। ব্রিটেনে এমনটা কখনোই ঘটত না।"
নতুন ফাইলে দেখা যাচ্ছে, ২০০৩-২০০৪ সালে এপস্টাইন ম্যানডেলসন বা তার সঙ্গীর অ্যাকাউন্টে মোট ৭৫,০০০ ডলার পাঠিয়েছিলেন। এছাড়া ২০০৯ সালে তার সঙ্গী রেইনাল্ডোকে অস্টিওপ্যাথি কোর্সের জন্য ১০,০০০ পাউন্ড দেওয়া হয়।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, ম্যানডেলসন বাজারের গোপন খবর এপস্টাইনকে দিতেন। ২০১০ সালের মে মাসে এক ইমেইলে তিনি জানান, ৫০০ বিলিয়ন ইউরোর বেইলআউট প্যাকেজ প্রায় চূড়ান্ত। পরদিন সকালেই ইউরোপীয় সরকারগুলো সেই ঘোষণা দেয়। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউনের পদত্যাগের ইঙ্গিতও তিনি আগেই এপস্টাইনকে দিয়েছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী স্টারমারের প্রতিক্রিয়া
ব্যাপক চাপের মুখে প্রধানমন্ত্রী স্টারমার ম্যানডেলসনের নিয়োগ প্রক্রিয়া প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি সংসদে স্বীকার করেন যে, তিনি তাদের বন্ধুত্বের কথা জানতেন, কিন্তু ম্যানডেলসন বারবার মিথ্যা কথা বলে তাদের বিভ্রান্ত করেছেন। স্টারমার বলেন, "ম্যানডেলসন আমাদের দেশ, সংসদ এবং দলের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। আমি তাকে নিয়োগ দিয়ে অনুতপ্ত।"
স্টারমারের ওপর প্রভাব
এই ঘটনায় স্টারমারের পদত্যাগের দাবিও উঠেছে। কনজারভেটিভ এমপি লুক ইভান্স বলেন, "শেষ পর্যন্ত স্টারমারই তাকে নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তাই তাকেই এর ব্যাখ্যা দিতে হবে।" এমপি এস্টার ম্যাকভে মন্তব্য করেন, "আজ স্টারমারের পতন শুরু হলো। তার বিচারবুদ্ধি এই দেশকে ধ্বংস করছে।"
যদিও স্টারমার দাবি করেছেন যে যথাযথ প্রক্রিয়া মেনেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু 'দ্য টাইমস' জানিয়েছে, ভেটিংয়ের সময় মাত্র দুই পৃষ্ঠার একটি নোট দেওয়া হয়েছিল। সেখানে উল্লেখ ছিল যে ২০০৯ সালে ম্যানডেলসন এপস্টাইনের ম্যানহাটনের বাড়িতে ছিলেন। অর্থাৎ সরকার আগে থেকেই জানত যে সাজার পরেও তাদের যোগাযোগ ছিল।
সূত্র : আল জাজিরা
আরটিএনএন/এআই
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!