ইরান, ট্রাম্প, খোমেনি, আরাকচি, ওমান, ইরান
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি ও ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সায়্যিদ বদর হামাদ আল বুসাইদি   ছবি: সংগৃহীত

তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ওমানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় বসতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। মনে করা হচ্ছে, নতুন করে মার্কিন হামলা ঠেকানোর জন্য এটিই হতে পারে অন্যতম শেষ সুযোগ। গত জুনে ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর এই প্রথম দুই পক্ষ আলোচনায় বসছে। সে সময় ইসরায়েলের ১২ দিনের টানা বোমা হামলার শেষ পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রও তাতে যোগ দিয়েছিল।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বুধবার জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন এই আলোচনার পরিধি বাড়াতে চায়। তারা ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল, আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন এবং ‘নিজ দেশের জনগণের প্রতি আচরণ’ নিয়েও কথা বলতে আগ্রহী। তবে, কয়েক দিনের জল্পনা-কল্পনার পর ইরানি আলোচকরা সন্তুষ্ট যে, অন্তত প্রাথমিকভাবে শুধুমাত্র পারমাণবিক বিরোধ নিয়েই আলোচনা হবে।

সামরিক হুমকি ও মধ্যস্থতাকারী

এই আলোচনার আবহ তৈরি হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্রমাগত সতর্কবার্তার মধ্যে। তিনি হুমকি দিয়েছেন, আলোচনায় কোনো অগ্রগতি না হলে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন স্ট্রাইক গ্রুপ থেকে ইরানের ওপর সামরিক হামলা চালানো হবে। গত মাসে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের ওপর রক্তক্ষয়ী দমন-পীড়নের পর যুক্তরাষ্ট্র ওই অঞ্চলে তাদের নৌ-উপস্থিতি জোরদার করেছে, যা ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ২০ বছরেরও বেশি অভিজ্ঞতাসম্পন্ন পরমাণু আলোচক আব্বাস আরাঘচির বিপরীতে থাকছেন ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং প্রেসিডেন্টের জামাতা জ্যারেড কুশনার।

আস্থার সংকট ও নিরাপত্তা শঙ্কা

ইরান নিশ্চয়তা চাইছে যে, যুক্তরাষ্ট্র এই আলোচনাকে সরকার পরিবর্তনের কোনো ‘কৌশল’ বা ধোঁকা হিসেবে ব্যবহার করছে না। এর আগে গত জুনে ইসরায়েলের আকস্মিক হামলার কারণে দুই পক্ষের আলোচনা মাঝপথে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ওই হামলায় অন্তত ১,০০০ ইরানি নিহত হন এবং দেশটির তিনটি পারমাণবিক কেন্দ্র ধ্বংস হয়ে যায়।

বৈঠকের আগে তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল, কাতার, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিসর ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের উপস্থিতিতে তুরস্কে এই আলোচনা হোক। মুসলিম দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের উপস্থিত থাকার পরিকল্পনা এটাই প্রমাণ করে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সমঝোতার ওপর তাদের জাতীয় নিরাপত্তাও নির্ভর করছে। অন্যদিকে, তেহরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, তারা আক্রান্ত হলে ওই অঞ্চলে ইসরায়েল বা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালাতে দ্বিধা করবে না।

সমঝোতার পথ ও অর্থনৈতিক সংকট

ইরান সাফ জানিয়েছে, নিজ মাটিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার—যা ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তিতে স্বীকৃত ছিল—তা নিয়ে কোনো আপস করা হবে না। সমঝোতার একটি সম্ভাব্য পথ হতে পারে, ইরান নির্দিষ্ট কয়েক বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত রাখতে রাজি হবে। অথবা, একটি আঞ্চলিক কনসোর্টিয়াম গঠন করা হবে যা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করবে এবং অঞ্চলটিকে একটি সমন্বিত বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচির দিকে এগিয়ে নেবে। ইরান তাদের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোতে নতুন করে পরিদর্শনের সুযোগ দেওয়ার বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি চাইবে।

গত জুনে ইসরায়েলি হামলার পর ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়ালের মান অর্ধেক হয়ে গেছে। সেই সঙ্গে খাদ্যপণ্যের মুদ্রাস্ফীতি ১০০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছানোয় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এর জেরেই ডিসেম্বরের শেষের দিকে দেশটিতে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল, যা নিরাপত্তা বাহিনী নিষ্ঠুরভাবে দমন করে।

একপর্যায়ে ট্রাম্প বিক্ষোভকারীদের উৎসাহিত করে বলেছিলেন, “সাহায্য আসছে”। কিন্তু ইসরায়েল ও মার্কিন সেনাবাহিনী সম্ভাব্য ইরানি পাল্টা হামলার মোকাবিলায় পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল না বলে যুক্তরাষ্ট্র তখন সরাসরি হামলা থেকে বিরত থাকে। 

সূত্র : দা গার্ডিয়ান

আরটিএনএন/এআই