জাপান, নির্বাচন, দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের বড় অংকের ব্যয়ের নীতির সমর্থক তাকাইচি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি   ছবি: সংগৃহীত

টোকিওতে বসবাসরত ৪৮ বছর বয়সী গ্রাফিক ডিজাইনার এবং দুই সন্তানের মা ইদা বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য হিসেবে জাপানি চালের দাম এতটাই বেড়েছে যে এখন প্রতিদিন ভাত খাওয়াটা তার কাছে বিলাসিতা মনে হয়। আল জাজিরাকে ইদা বলেন, “আমার মনে আছে, কয়েক বছর আগেও ৫ কেজি (১১ পাউন্ড) চালের দাম ছিল প্রায় ৩,০০০ ইয়েন (১৯ ডলার)। কিন্তু এখন তা বেড়ে ৪,০০০ থেকে ৫,০০০ ইয়েন (২৫ থেকে ৩২ ডলার) হয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “আমার পরিবারে প্রতি মাসে প্রায় ১০ কেজি (২২ পাউন্ড) চাল লাগে। চাল বাঁচাতে এখন আমাদের সপ্তাহে কয়েকবার পাস্তা বা নুডলস খেয়ে থাকতে হচ্ছে।”

জাপানের লক্ষ লক্ষ ভোটারের মতো ইদার কাছেও রবিবারের সাধারণ নির্বাচনের প্রধান ইস্যু হলো জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়। এই নির্বাচনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির নেতৃত্বাধীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) জোটের মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে বিরোধী দল ‘সেন্ট্রিস্ট রিফর্ম অ্যালায়েন্স’-এর সাথে। সাধারণ জাপানিদের জন্য গত এক বছরে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে, কারণ দ্রব্যমূল্য বাড়লেও সেই হারে বাড়েনি মানুষের আয়।

জাপান সরকারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নভেম্বরে মুদ্রাস্ফীতি-সামঞ্জস্যপূর্ণ মজুরি ২.৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যা টানা ১১ মাস ধরে সাধারণ মানুষের আয়ের নিম্নগতির নির্দেশক। জাপানে সার্বিক মুদ্রাস্ফীতি ২ থেকে ৩ শতাংশের মধ্যে থাকলেও খাদ্যের দাম বাড়ছে অনেক দ্রুতগতিতে। ২০২৩ সালে খারাপ ফলনের কারণে সৃষ্ট সংকটে গত বছর চালের দাম প্রায় ৬৮ শতাংশ বেড়েছে। জাপানি মুদ্রা ইয়েনের মান কমে যাওয়ায় আমদানি করা পণ্য, যেমন কফি ও চকলেটের দামও দ্রুত বেড়েছে, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে।

টোকিওর ২৯ বছর বয়সী আইটি কনসালটেন্ট নাও হানাওকা আল জাজিরাকে বলেন, “আমি শখ করে ব্রিটিশ চা কিনতে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে গিয়েছিলাম, কিন্তু দেখলাম কয়েক বছর আগের তুলনায় এর দাম দেড় গুণ বেড়ে গেছে। তাই আমি আর কিনিনি।” হানাওকা আরও যোগ করেন, “গত বছর একটি কনফারেন্সের জন্য বিদেশে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু ইয়েনের দুর্বল অবস্থার কারণে কনফারেন্স ফি দেওয়াটাই অসম্ভব হয়ে পড়ে।”

গত মাসে এনএইচকে-এর এক জরিপে দেখা গেছে, ৪৫ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, দ্রব্যমূল্য কমানোর পদক্ষেপগুলোই তাদের ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। টোকিওর সোফিয়া ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক কোইচি নাকানো আল জাজিরাকে বলেন, “আয় না বাড়লেও জিনিসের দাম বাড়ছে। ফলে মানুষ অনুভব করছে যে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কেনাও এখন কঠিন হয়ে পড়ছে।” নাকানো আরও বলেন, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির পাশাপাশি বয়স্ক জনসংখ্যা অধ্যুষিত এই সমাজে উচ্চ কর এবং সামাজিক নিরাপত্তা খাতে অতিরিক্ত ব্যয় পরিবারগুলোর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।

‘আমাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নকারী নীতির ওপর গুরুত্ব দিন’

জাপানের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিজের অবস্থান শক্ত করতে চাওয়া কট্টর রক্ষণশীল নেতা সানায়ে তাকাইচি জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোকে তার নির্বাচনী প্রচারণার কেন্দ্রবিন্দু করেছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের বড় অংকের ব্যয়ের নীতির সমর্থক তাকাইচি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তার জোট ক্ষমতায় ফিরলে খাদ্য ও কোমল পানীয়ের ওপর ৮ শতাংশ কর দুই বছরের জন্য স্থগিত করা হবে।

গত বছর জাপানে কোভিড-১৯ মহামারির পর সবচেয়ে বড় প্রণোদনা প্যাকেজ (২১.৩ ট্রিলিয়ন ইয়েন বা ১৩৬ বিলিয়ন ডলার) অনুমোদনের পর এই কর ছাড়ের প্রতিশ্রুতি এলো। ওই প্যাকেজে বিদ্যুৎ বিলে ভর্তুকি, নগদ অর্থ সহায়তা এবং ফুড ভাউচারের ব্যবস্থা ছিল। তবে তাকাইচির অর্থনৈতিক পরিকল্পনা জাপানের আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। জাপানে বয়স্ক জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে এবং জিডিপির তুলনায় ঋণের হার ২৩০ শতাংশ, যা উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।

গত মাসে নির্বাচনের ঘোষণা দিয়ে তাকাইচি যখন কনজাম্পশন ট্যাক্স (ভোক্তা কর) কমানোর পরিকল্পনা প্রকাশ করেন, তখন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা জাপানি বন্ড বিক্রি করতে শুরু করেন, যার ফলে বন্ডের ইয়েল্ড (সুদ বা আয়ের হার) রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছে। জাপানি ভোটাররাও তাকাইচির কর কমানোর পরিকল্পনাকে সন্দেহের চোখে দেখছেন। তারা প্রশ্ন তুলছেন, সরকার কীভাবে এই ১০ ট্রিলিয়ন ইয়েন (৬৩.৭ বিলিয়ন ডলার) ঘাটতি পূরণ করবে।

গত মাসে ‘দ্য নিক্কেই’ পত্রিকার এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, অর্ধেকেরও বেশি উত্তরদাতা বিশ্বাস করেন না যে কর স্থগিত করলে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সমস্যার কার্যকর সমাধান হবে। সাম্প্রতিক নির্বাচনী প্রচারণায় তাকাইচি কৌশলে তার এই প্রতিশ্রুতির কথা এড়িয়ে যাচ্ছেন।

আইটি কনসালটেন্ট হানাওকা, যিনি বিরোধী জোটকে ভোট দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন, বলেন, “সানায়ে তাকাইচি এত দ্রুত তার অবস্থান পরিবর্তন করেন যে তাকে বিশ্বাস করা কঠিন।” তিনি আরও বলেন, “রাজনীতিবিদদের উচিত তাৎক্ষণিক নগদ অর্থ সহায়তার দিকে নজর না দিয়ে এমন সব নীতি গ্রহণ করা, যা ১০ বা ২০ বছর পর আমাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করবে।”

তবে জরিপ বলছে, তাকাইচির জোট বিরোধী দলগুলোর তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে এবং সহজে জয়ী হওয়ার পথে। ‘দ্য আসাহি’ পত্রিকার সোমবারের জরিপ অনুযায়ী, এলডিপি এবং তাদের জোটসঙ্গী জাপান ইনোভেশন পার্টি ৪৬৫ আসনের প্রতিনিধি পরিষদে ৩০০টি আসন জিততে পারে।

নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন বাকি থাকলেও দুই সন্তানের মা ইদা এখনও সিদ্ধান্ত নেননি কাকে ভোট দেবেন। তিনি বলেন, “সত্যি বলতে, আমি একই মুখগুলোর নতুন নতুন দলের নাম নিয়ে রাজনীতিতে আসা দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি।”

সূত্র : আল জাজিরা

আরটিএনএন/এআই