৯ তলা থেকে লাফ তিন বোনের
৯ তলা থেকে লাফ তিন বোনের   ছবি: সংগৃহীত

ভারতের উত্তর প্রদেশের গাজিয়াবাদে তিন কিশোরী বোনের আত্মহত্যার ঘটনায় তদন্ত যত গভীরে যাচ্ছে, ততই সামনে আসছে পারিবারিক জটিলতা ও আর্থিক সংকটের একাধিক অজানা দিক। পুলিশি তদন্তে উঠে এসেছে, তিন বোনের বাবা চেতন কুমারের পারিবারিক জীবন ও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তগুলো এই ঘটনার পেছনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

তদন্তকারীদের দাবি, চেতন কুমারের তিনজন স্ত্রী রয়েছেন—সুজাতা, হিনা ও টিনা। বিস্ময়করভাবে তারা তিনজনই আপন বোন। এই পারিবারিক কাঠামো ও পারস্পরিক সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই পরিবারের ভেতরে চাপ ও অস্থিরতা তৈরি করছিল বলে ধারণা করছে পুলিশ।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার কিছুদিন আগে চেতন কুমার তার মেয়েদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনগুলো কেড়ে নেন এবং বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের জন্য সেগুলো বিক্রি করে দেন। অতিরিক্ত ‘কোরিয়ান কনটেন্ট’ দেখা এবং অনলাইন গেমে আসক্তির অভিযোগ তুলে তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে তদন্তে জানিয়েছেন। তবে এই সিদ্ধান্তের পর থেকেই তিন কিশোরী চরম মানসিক চাপে ভুগছিল বলে পুলিশের প্রাথমিক ধারণা।

পেশায় শেয়ার ব্রোকার চেতন কুমারের আর্থিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত নাজুক। তদন্তে জানা গেছে, তার ওপর প্রায় দুই কোটি রুপির ঋণের চাপ ছিল এবং পরিবারের দৈনন্দিন খরচ মেটাতে তিনি হিমশিম খাচ্ছিলেন। এই আর্থিক সংকট পারিবারিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তোলে।

ঘটনার রাতে কোরিয়ান বিনোদনের বড় ভক্ত তিন বোন মায়ের মোবাইল ফোন ব্যবহার করার চেষ্টা করে। তবে তারা যে কোরিয়ান অ্যাপ ও কনটেন্টে প্রবেশ করতে চেয়েছিল, সেগুলোতে ঢুকতে পারেনি। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, নিশিকা (১৬), প্রাচী (১৪) ও পাখি (১২) অনলাইন গেম খেলতে বা তাদের কোরিয়ান বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছিল না, যা তাদের হতাশা আরও বাড়িয়ে দেয়।

ফরেনসিক তদন্তেও মায়ের ফোনে কোনো কোরিয়ান অ্যাপ ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সাইবার ক্রাইম ইউনিট বর্তমানে আইএমইআই নম্বরের মাধ্যমে বিক্রি হয়ে যাওয়া মোবাইল ফোনগুলোর ক্রেতাদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছে, যাতে প্রয়োজনীয় ডিজিটাল তথ্য উদ্ধার করা যায়।

পুলিশ আরও জানিয়েছে, তিন বোন তাদের বাবার প্রতি অত্যন্ত অনুরক্ত ছিল। সেই কারণেই তারা রেখে যাওয়া হাতে লেখা সুইসাইড নোটে বাবার উদ্দেশেই বার্তা লিখেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নোটে মায়ের নামের কোনো উল্লেখ না থাকায় বিষয়টি তদন্তকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

হাতে লেখা চিঠি, অন্যান্য বার্তা এবং আঙুলের ছাপ ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়েছে। এসব রিপোর্ট হাতে পেলে ঘটনার পেছনের মানসিক ও পারিবারিক কারণ আরও স্পষ্ট হবে বলে মনে করছে পুলিশ।

এদিকে চেতন কুমারের অতীত নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। ২০১৫ সালে গাজিয়াবাদের সাহিবাবাদ থানার রাজেন্দ্র নগর এলাকার একটি ফ্ল্যাটে তার লিভ-ইন সঙ্গিনীর রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনা সামনে এসেছে। সে সময় পুলিশ ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে ধরে নিয়ে মামলা খারিজ করেছিল। তবে বর্তমান ঘটনার প্রেক্ষাপটে সেই পুরোনো ঘটনাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

তদন্তকারীরা বলছেন, সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং চূড়ান্ত ফরেনসিক ও সাইবার রিপোর্ট পাওয়ার পরই ঘটনার পূর্ণ চিত্র পরিষ্কার হবে। তিন কিশোরীর এই মর্মান্তিক মৃত্যু শুধু একটি পারিবারিক ট্র্যাজেডি নয়, বরং মানসিক স্বাস্থ্য, পারিবারিক চাপ ও ডিজিটাল নির্ভরতার জটিল বাস্তবতাকেও সামনে এনে দিয়েছে।