ইরান, ট্রাম্প, খোমেনি, ইসরায়েল
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প   ছবি: সংগৃহীত

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে ‘ন্যায্য অভিযান’ অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, যতক্ষণ না ‘সব লক্ষ্য অর্জিত হচ্ছে’, ততক্ষণ এই লড়াই চলবে। এই প্রক্রিয়ায় আরও মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন। ট্রাম্প আরও বলেন, "দুঃখজনক হলেও সত্য, এটি শেষ হওয়ার আগে আরও প্রাণহানি হতে পারে। এটাই বাস্তবতা—সম্ভবত আরও প্রাণ যাবে, তবে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করব যেন তা না হয়।" তিনি যোগ করেন, "কিন্তু আমেরিকা তাঁদের মৃত্যুর বদলা নেবে এবং যারা মূলত সভ্যতার বিরুদ্ধেই যুদ্ধ ঘোষণা করেছে, সেই সন্ত্রাসীদের ওপর চরম শাস্তিমূলক আঘাত হানবে।"

রবিবার ট্রুথ সোশ্যাল-এ পোস্ট করা এক ভিডিও বার্তায় ট্রাম্প আবারও ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধকে যুক্তরাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি দাবি করেন, "ইরানের শাসনব্যবস্থা যদি দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক অস্ত্রে সজ্জিত হয়, তবে তা প্রতিটি আমেরিকানের জন্য ভয়াবহ হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।" শনিবারের হামলার আগে থেকেই ট্রাম্প ও তাঁর শীর্ষ কর্মকর্তারা বারবার একই ধরনের বক্তব্য দিয়ে আসছিলেন। ওই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বের বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ সদস্য নিহত হন।

তবে আজ পর্যন্ত তাঁরা এমন কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি, যা নিশ্চিত করে যে ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে আঘাত করার মতো দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে বা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। তেহরান দীর্ঘ দিন ধরেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান যদি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সিদ্ধান্তও নিত, তবুও তা বাস্তবে রূপ দিতে কয়েক বছর সময় লাগত। উল্লেখ্য, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা চলাকালীনই ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে এই হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র।

ইরানের আঞ্চলিক প্রতিশোধমূলক হামলায় রবিবার তিনজন মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার বিষয়টিও ট্রাম্প উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, "যাঁরা আমাদের জাতির জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন, সেই প্রকৃত আমেরিকান দেশপ্রেমিকদের জন্য আমরা সমগ্র জাতি আজ শোকাহত। আমরা সেই ন্যায্য অভিযান চালিয়ে যাব, যার জন্য তাঁরা জীবন দিয়েছেন।"

রবিবারের এই ভাষণটি ট্রাম্পের সারাদিন দেওয়া বিভিন্ন সাক্ষাৎকারের সঙ্গে ছিল সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী। ওই সাক্ষাৎকারগুলোতে তিনি কূটনৈতিক সমাধানের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। আটলান্টিক ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের ‘নতুন নেতৃত্ব’ প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, "তারা কথা বলতে চায় এবং আমিও কথা বলতে রাজি হয়েছি, তাই আমি তাদের সঙ্গে কথা বলব।"

তিনি আরও বলেন, "যা করা খুব বাস্তবসম্মত এবং সহজ ছিল, তা তাদের আরও আগেই করা উচিত ছিল। তারা বড্ড বেশি দেরি করে ফেলেছে।" হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা আল জাজিরাকে নিশ্চিত করেছেন যে, ট্রাম্প ইরানের নতুন নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে ইচ্ছুক।

এর আগে রবিবার, খামেনির হত্যাকাণ্ডের পর সরকার পরিচালনার জন্য ইরান তিন সদস্যের একটি অন্তর্বর্তীকালীন নেতৃত্ব পরিষদ ঘোষণা করে। এই পরিষদে রয়েছেন—প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি গোলাম-হোসেইন মহসেনি-ইজেই এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের সদস্য আয়াতুল্লাহ আলিরেজা আরাফি।

ট্রাম্প স্বীকার করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় যুক্ত কয়েকজন মধ্যস্থতাকারী ইতিমধ্যে নিহত হয়েছেন। কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের অতীত রেকর্ডের কারণে ইরানের নতুন নেতৃত্ব তাদের সঙ্গে আলোচনায় জড়াতে সতর্ক থাকবে। গত বছরের জুনেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা চলাকালীন ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে হামলা চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন নেতৃত্ব হয়তো দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের পথ বেছে নিতে পারে, যা রাজনৈতিকভাবে ট্রাম্পের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। ট্রাম্প আটলান্টিককে বলেন, "যাঁদের সঙ্গে আমরা আলোচনা করছিলাম, তাঁদের অধিকাংশই আর নেই। কারণ সেটা ছিল একটা বড় আঘাত।"

রবিবারের ভাষণে ট্রাম্প কোনো কূটনৈতিক প্রস্তাবের কথা উল্লেখ করেননি; বরং তিনি ইরানে ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা সরকার পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি আবারও ইরানের রিভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি), সেনাবাহিনী এবং পুলিশের সদস্যদের অস্ত্র সমর্পণ করার বিনিময়ে সাধারণ ক্ষমার প্রস্তাব দেন। তিনি হুঁশিয়ারি দেন, যদি তাঁরা তা না করেন, তবে তাঁদের জন্য "নিশ্চিত মৃত্যু" অপেক্ষা করছে।

তিনি আবারও "স্বাধীনতাকামী ইরানি দেশপ্রেমিকদের" এই মুহূর্তটি কাজে লাগিয়ে সাহসী, বীরোচিত ভূমিকা পালন করে নিজেদের দেশ পুনরুদ্ধার করার আহ্বান জানান। জানুয়ারি মাসে বিক্ষোভকারীদের ওপর সরকারের দমন-পীড়নের জবাবে ইরানে হামলার যে হুমকি তিনি দিয়েছিলেন, দৃশ্যত সেটির প্রসঙ্গ টেনেই ট্রাম্প বলেন, "আমি আপনাদের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম এবং আমি সেই প্রতিজ্ঞা পূরণ করেছি। বাকিটা আপনাদের ওপর নির্ভর করছে। আমরা আপনাদের সাহায্য করার জন্য পাশে থাকব।"

অঞ্চলজুড়ে যখন লড়াই চলছে, তখনই ট্রাম্প এই বক্তব্য দিলেন। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কার্যক্রম তদারককারী সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) রবিবার এর আগে ঘোষণা করেছিল যে, তাদের তিনজন সেনা নিহত হয়েছেন এবং আরও পাঁচজন "গুরুতর আহত" হয়েছেন। তবে তারা বিস্তারিত কোনো তথ্য জানায়নি।

মার্কিন সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ইরানি হামলায় নিহতরা কুয়েতে মোতায়েন ছিলেন। ইরান কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, জর্ডান, বাহরাইন এবং ওমানের বিরুদ্ধেও একযোগে হামলা চালিয়েছে। এদিকে, ইরানে এখন পর্যন্ত অন্তত ২০১ জন নিহত এবং ৭৪৭ জন আহত হয়েছেন। আর ইসরায়েলে অন্তত ৯ জন নিহত এবং ১২১ জন আহত হয়েছেন।

উত্তেজনা শুরু হওয়ার পর থেকে কুয়েতে অন্তত একজন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে তিনজন এবং ইরাকে দুইজন নিহত হয়েছেন। ইরানের আইআরজিসি রবিবার জানিয়েছিল যে, তারা চারটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন বিমানবাহী রণতরীকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। তবে এক মার্কিন কর্মকর্তা আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, এতে কোনো ক্ষতি হয়নি।

রবিবার ফক্স নিউজকে দেওয়া পৃথক এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানে ৪৮ জন "নেতা" নিহত হয়েছেন, যদিও নিহতদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা হয়নি। ট্রুথ সোশ্যাল-এ এক পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র "ইরানের ৯টি নৌযান ধ্বংস ও ডুবিয়ে দিয়েছে, যার মধ্যে কয়েকটি ছিল তুলনামূলক বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ।"

তিনি আরও বলেন, "অন্য একটি হামলায় আমরা তাদের নৌ সদর দপ্তর অনেকটা ধ্বংস করে দিয়েছি।" সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ এক পোস্টে সেন্টকম দাবি করেছে, আইআরজিসি-র "আর কোনো সদর দপ্তর অবশিষ্ট নেই।"

এদিকে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি এবিসি নিউজকে বলেছেন, ইরানের সামরিক কমান্ড বা চেইন অফ কমান্ড বিঘ্নিত হয়েছে। ফলে ইউনিটগুলো "স্বাধীন এবং কিছুটা বিচ্ছিন্নভাবে" কাজ করছে। তিনি জানান, তারা "আগেই দেওয়া সাধারণ নির্দেশনার ভিত্তিতে" অপারেশন পরিচালনা করছে। তবুও আরাকচি জোর দিয়ে বলেন, "আমাদের জনগণকে রক্ষা করতে এবং সুরক্ষা দিতে আমরা নিজেদের জন্য কোনো সীমারেখা দেখছি না।"

সূত্র : আল জাজিরা

আরটিএনএন/এআই