নির্বাচন, বিএনপি, জামায়াত
এই নীরবতা কি সত্যিই কোনো নতুন অধ্যায়ের সূচনা, নাকি পুরোনো রাজনীতিরই আরেক পুনরাবৃত্তি?   ছবি: সংগৃহীত

নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই যেন অনিশ্চয়তার মেঘ ঘন হচ্ছে দেশের রাজনীতির আকাশে। কে জিতবে- দাঁড়িপাল্লা, নাকি ধানের শীষ? এই প্রশ্নের সোজাসাপটা উত্তর এখন কারো কাছেই নেই। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা–উপজেলার সাধারণ মানুষের কথাবার্তায় স্পষ্ট- দেশের রাজনৈতিক মানসিকতায় কিছু একটা পরিবর্তন আসছে। বিশেষ করে ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলোতে জামায়াত সমর্থিত ছাত্র সংগঠন শিবিরের একক বিজয় যেন সবার নির্বাচনী ভাবনায় বিস্তর পরিবর্তন এনেছে।

মিরপুরের একটি আবাসিক ভবনের দারোয়ান মো. দুলাল। সারাদিন গেটের পাশে বসে মানুষ দেখেন, কথা শোনেন। নির্বাচন ঘিরে আশঙ্কা রয়েছেন  তিনি বলেন, “এইবার ভোট হইবো কিনা, সেইটাই বড় প্রশ্ন। বাইরের দেশ চাইলে ভোট বন্ধও কইরা দিতে পারে।” তবু নিজের আন্দাজ জানাতে ভুললেন না তিনি- "ঢাকা-১৫ আসনে দাঁড়িপাল্লা জিততে পারে, তবে সারাদেশে জামায়াতের আসন সংখ্যা ৩০ থেকে ৫০-এর বেশি হবে না। আর সরকার গঠন করবে বিএনপি" এমনটাই ধারণা তার।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের আবু বক্কর এখন ঢাকায় টাইলস বসানোর কাজ করেন। রাজনীতি নিয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছেন না তিনি। তবে একটা পরিবর্তন চোখে পড়ছে তার কাছে—‘আগে জামায়াত এতো শক্তিশালী আছিল না। এখন ওদের অনেক প্রভাব দেখা যাইতেছে। দেশে তো এখন দুইটাই দল, আওয়ামী লীগ নাই, কোন দল জিতবো, কইতে পারতেছি না।’

মিরপুর-১০ নম্বরে পান বিক্রি করেন রহমত আলী। প্রথমে রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে চাননি। একটু থেমে হঠাৎ বললেন, ‘সত্য কথা কমু? এইবার জামায়াতই আইবো।” তার ভাষায় "বিএনপির চাঁদাবাজি মানুষকে ক্লান্ত করে তুলেছে, সারাদেশে মানুষ বিরক্ত, এইবার দাঁড়িপাল্লা ম্যালা ভোট পাইবো।’

তেজগাঁও কলেজের শিক্ষার্থী মো. আসিফ আদনান বিষয়টাকে দেখছেন একটু বিশ্লেষণী চোখে। তার মতে, ‘জামায়াত একা দুর্বল ছিল, কিন্তু এনসিপির সাথে জোট হওয়ায় তারা শক্তিশালী হয়েছে। জেন-জির কাছে দুই দলই এ মূহুর্তে তুমুল জনপ্রিয়। এবার বিএনপির সাথে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। তবে কে সরকার গঠন করবে, তা এখনই বলা কঠিন।’

তবে এই প্রবল অনিশ্চয়তার মধ্যেও ভিন্ন মত আছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. লাদেন মনে করেন, ‘এই সংকটময় সময়ে বিএনপি ছাড়া অন্য কোনো দল দেশ চালাতে পারবে না। জামায়াত ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের পক্ষের শক্তি নয়।’ তার চোখে, সরকার গঠনের দৌড়ে বিএনপিই এগিয়ে।

পল্লবীতে রিকশা চালান আব্দুর রাজ্জাক, বাড়ি কুড়িগ্রামে। দীর্ঘদিন ঢাকায় থেকেও গ্রামের খবর নিতে ভোলেননি। তার কণ্ঠে কোনো দ্বিধা নেই— ‘এইবার দাঁড়িপাল্লা ছাড়া আর কোনো কথা নাই। মানুষ বিএনপিও দেখছে, আওয়ামী লীগও দেখছে, যেই লাউ- সেই কদু। এইবার বদল দরকার।’

তবে অধিকাংশ জনতার কণ্ঠে কথা নেই। অনেকেই চুপ, যেন তার ঘিরে ধরেছে—এক আশ্চর্য নীরবতা! অতীতের রাজনৈতিক নিপীড়ন, ভয় আর অনিশ্চয়তা—তাদের মুখ বন্ধ করে রেখেছে। কিন্তু এই নীরবতাই যেন বড়ো কোনো ঝড় বা বিপ্লবের বার্তা দিচ্ছে। একটা পরিবর্তনের ইঙ্গিত, রুচি বদলের আভাস, সব মিলিয়ে এক—ঐতিহাসিক ও নীরব ভোট বিপ্লবের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

সর্বশেষ কথা, ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। ভোটের বাক্স খুললেই জানা যাবে এই নীরবতা কি সত্যিই কোনো নতুন অধ্যায়ের সূচনা, নাকি পুরোনো রাজনীতিরই আরেক পুনরাবৃত্তি?। তবে একটি বিষয়ে প্রায় সবাই একমত—বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে অনিশ্চিত ও আনপ্রেডিক্টেবল নির্বাচন সম্ভবত এবারই হতে যাচ্ছে।

আরটিএনএন/এআই