একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড, সাতটি প্রাণহানি, আর এক যুগের দীর্ঘ প্রতীক্ষা—তবুও বিচার শেষের দেখা নেই। নারায়ণগঞ্জ সাত খুন মামলার চূড়ান্ত রায় এখনো আপিল বিভাগে আটকে আছে। ফলে ফাঁসির দণ্ড কার্যকর না হওয়ায় হতাশা, ক্ষোভ ও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। শুধু সাত খুনের নয়, দেশের আরও কিছু আলোচিত ঘটনার মামলা বছরের পর বছর ধরে ঝুলে আছে। যেমন বিশ্বজিৎ দাস হত্যা, তনু হত্যা, সাগর-রুনি হত্যা ও ইলিয়াস আলী গুম। এসব ঘটনায়ও বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, আইনজীবী চন্দন সরকারসহ ৭ জন অপহরণের শিকার হন। এরপর ৩০ এপ্রিল ও ১ মে শীতলক্ষ্যা নদীতে একে একে ভেসে ওঠে তাদের মরদেহ—যা পুরো দেশকে নাড়িয়ে দেয়।
২০১৭ সালে বিচারিক আদালত ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। পরে হাইকোর্ট ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে। কিন্তু সেই রায় এখনো আপিল বিভাগে ঝুলে আছে। এক যুগ পেরিয়েও চূড়ান্ত বিচার না হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে—ন্যায়বিচার কি আদৌ সময়মতো মিলছে?
নিহতদের স্বজনদের অভিযোগ, বারবার আশ্বাস পেলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখছেন না তারা। তাদের আশঙ্কা—জীবদ্দশায় এই মামলার ফাঁসি কার্যকর দেখতে পারবেন কি না।
এক যুগ পেরিয়ে যাওয়া নারায়ণগঞ্জ সাত খুন মামলা আজ শুধু একটি মামলা নয়—এটি বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার সক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্বজনদের প্রশ্ন, বিচার কি সত্যিই একদিন সম্পূর্ণ হবে, নাকি সময়ের স্রোতে হারিয়ে যাবে এই নৃশংসতার জবাব?
ভিকটিমদের একজন গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম। তার মেয়ে রোজা মনি জন্মের আগেই বাবাকে হারায়। স্ত্রী সামসুর নাহারের কণ্ঠে এখনো সেই বেদনার ভার। তিনি বলেন, ১২ বছর হয়ে গেল, আমি ভাবিনি বিচার পেতে এত সময় লাগবে।
আরেক স্বজন সেলিনা ইসলাম বলেন, হাইকোর্ট পর্যন্ত রায় হয়েছে, কিন্তু ১০ বছরেও কার্যকর হয়নি। আমরা অনিশ্চয়তায় আছি।
আইনজীবীদের মতে, এই দীর্ঘসূত্রতার মূল কারণ বিচারক সংকট ও কোর্টের স্বল্পতা। প্রতিদিন আপিল বিভাগে প্রায় ৫০টি মামলা জমা হলেও নিষ্পত্তি হয় মাত্র ৫টি—ফলে মামলাজট বাড়ছেই।
এ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট আপিল বিভাগের সিনিয়র আইনজীবী সরওয়ার আহমেদ সংবাদমাধ্যম আরটিএনএনকে বলেন, বিচারক নিয়োগ বাড়ানো এবং নতুন বেঞ্চ চালু করা গেলে এই মামলাসহ হাজারো ঝুলে থাকা মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি সম্ভব।
তিনি বলেন, সেভেন মার্ডারস ঘটনার অন্যতম আসামি ছিল তৎকালীন এক প্রভাবশালী মন্ত্রীর মেয়ে জ্যামাতা ও সেনাবাহিনীর একজন অফিসার। আর এ কারণেই মামলাটি তখন দীর্ঘ সময় ঝুলে ছিল। তবে যে কোন সরকারের স্বদিচ্ছা থাকলে আলোচিত মামলাগুলো দ্রুত সমাধান সম্ভব বলে মনে করেন সরওয়ার আহমেদ। এক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে তিনি তারেক রহমানের গ্রেনেড হামলার মামলাটাকে টেনে আনেন।
বহুল আলোচিত এই মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, আমরা চাই, দ্রুত আপিল বিভাগে এই মামলাটির শুনানি হোক। শুনানির পর যে রায় হয়, তা কার্যকর হোক।
তবে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আবুল কালাম আজাদ জাকির বলেন, সরকার মামলাটির বিষয়ে আন্তরিক এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে চূড়ান্ত রায় নিশ্চিত করতে কাজ চলছে। তবে বাস্তবতা বলছে—সময় গড়াচ্ছে, কিন্তু বিচার এখনো অধরা।
অপরাধ বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক আরটিএনএনকে বলেন, অতীতের রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার অপব্যবহার অনেক আলোচিত মামলার বিচার বিলম্বিত করেছে। স্বৈরাচার আমলে যারাই দেশ ও জনগণের পক্ষে কথা বলেছিলেন তারাই নানাভাবে নির্যাতন-নিপীড়ন ও হত্যা -খুনের শিকার হয়েছিলেন। সুতরাং সেই সরকারের কাছে সঠিক বিচার প্রত্যাশা করাটাও ভুল।
তিনি বলেন, নতুন সরকারের উচিত হাইকোর্টের বিচারক সংকট যথাযথ সমাধান করে এবং একটি বিশেষ বেঞ্চ তৈরি করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যুগের পর যুগ ঝুলে থাকা আলোচিত মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করা।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার বেশ কয়েকটি আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড আজও বিচারহীনতার প্রতীক হয়ে রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পুরান ঢাকার ভিক্টোরিয়া পার্কের সামনে প্রকাশ্যে নৃশংসভাবে খুন হওয়া দর্জি দোকানি বিশ্বজিৎ দাস (১৪ বছর আগে), কুমিল্লার বহুল আলোচিত তনু হত্যা (১০ বছর আগে), সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড (১৪ বছর আগে) এবং বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর রহস্যজনক গুম (১৩ বছর আগে)। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এসব ঘটনার বিচার প্রক্রিয়া শেষ না হওয়ায় জনমনে ক্ষোভ, হতাশা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!