রাষ্ট্রে স্থিতিশীলতা আনতে জুলাই বিপ্লব থেকে উৎসারিত প্রশ্নসমূহের মীমাংসা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া।
শনিবার (১৭ জানুয়ারি) নিজের ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ কথা বলেন।
ইকবাল করিম ভূঁইয়ার পোস্টটি পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো-
আসন্ন নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। বিএনপি ও জামায়াত— দুই দলই জয়ের জন্য সর্বশক্তি প্রয়োগ করছে। নির্বাচনী প্রচারণায় রাজনীতির মাঠ ধীরে ধীরে উত্তপ্ত হচ্ছে। যেমন, একাত্তরে জামায়াতের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভূমিকার কথা বিএনপি তুলে ধরছে; এর বিপরীতে বিএনপির শাসনামলে অসাফল্যতা ও বিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ব্যর্থতার কথা প্রচার করছে জামায়াত।
দেখে মনে হচ্ছে, জুলাই বিপ্লব কোনো কিছুই বদলাতে পারেনি। আবারও ফিরে এসেছে পুরোনো দোষারোপের রাজনীতি। এত আত্মত্যাগ ও রক্তপাতের পর দেশের মানুষ এটা আশা করেনি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমরা এখনো সেই পুরোনো অচলায়তন থেকে বেরোতে পারিনি। পারিনি গত ৫৪ বছরের ভঙ্গুর, বিশৃঙ্খল ও বুড়োদের গণতন্ত্রের বাইরে আলাদা, নতুন ও সতেজ তারুণ্যময় কিছু গড়ে তুলতে। বারবারই আমরা ব্যর্থ হচ্ছি!
দেশবাসীর সম্মিলিত প্রত্যাশার বিপরীতে, রাজনীতিকদের কাছে পুরোনো বন্দোবস্তই বেশি স্বস্তিকর বলে দৃশ্যমান হচ্ছে। তাই এখন জাতির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কিছু মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তাদের কাছে তোলা আমাদের জন্য ফরজ হয়ে উঠেছে। দুঃখজনকভাবে, বুদ্ধিজীবী ও গণমাধ্যম এসব বিষয়ে সম্পূর্ণ নীরব এবং নতুন ক্ষমতা বিন্যাসের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতেই বেশি তৎপর। সাধারণ মানুষের জন্য গৌণ বিষয়গুলোই রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে মুখ্য হয়ে উঠছে, আর দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দলের মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি চরম পর্যায়ের দিকে ছুটছে।
মানুষকে পুরোনো রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর বা মিঠে কথার বাহুল্য-স্রোতে ভেসে যাওয়া থেকে বিরত রাখা চাই। সকলকে রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে নিম্নোক্ত প্রশ্নগুলো তুলতে হবে-
১. জুলাই বিপ্লব সম্পর্কে তাদের ধারণা কী, এবং বাংলাদেশের ইতিহাসে এই মহান ঘটনার স্থান তারা কোথায় দিতে চাইবেন? শহিদদের সম্মান জানাতে, নিহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে, পঙ্গু হয়ে যাওয়া মানুষদের পুনর্বাসন করতে এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে তাদের কী কী পরিকল্পনা আছে?
২. আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) নিয়ে তারা কী ধরনের অবস্থান নেবে? বর্তমান কার্যক্রম ও প্রক্রিয়াগুলো আরও জোরালোভাবে এগিয়ে নেবে, নাকি গতি কমিয়ে দেবে, যাতে অপরাধীরা বিচার এড়িয়ে যেতে পারে?
৩. অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত বিভিন্ন কমিশন একাধিক সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছে। সেগুলো তারা কীভাবে এবং কোন সময়সীমার মধ্যে বাস্তবায়ন করবে?
৪. জুলাই বিপ্লবের পর বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে। এর তাৎক্ষণিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিচারব্যবস্থা এখন পুরোনো অসৎ ধারা, বিপুল সংখ্যক ঝুলে থাকা মামলা, অপর্যাপ্ত ডিজিটাল ব্যবস্থা, রাজনৈতিক নিপীড়ন, সম্পদের ঘাটতি, দীর্ঘসূত্রিতা ও গড়িমসি, দক্ষ ও স্বচ্ছ বিচার দেওয়ার সীমিত সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক অশুভ প্রভাবের সমস্যায় আক্রান্ত। এসব সংকট সমাধানে দলগুলো কী কী পদক্ষেপ নেবে?
৫. বিচারব্যবস্থার মতোই, জুলাই বিপ্লবের পর পুলিশ বাহিনীও ভেঙে পড়েছে। এর প্রধান সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি (ঘুষ, আঁতাত), রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হওয়া, মানবাধিকার লঙ্ঘন (নৃশংসতা, বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ড), গুরুতর সম্পদ ও সরঞ্জামের ঘাটতি (দুর্বল অবকাঠামো, পুরোনো প্রযুক্তি, কম বেতন) এবং জনআস্থার অভাব। যার ফলে সুরক্ষার পরিবর্তে বাড়ছে হয়রানি। অতিরিক্ত কাজের চাপ ও খারাপ কর্মপরিবেশে কর্মকর্তাদের মানসিক অবসাদও পরিস্থিতিকে আরও অধঃপতিত করছে। এসব সমস্যা সমাধানে দলগুলোর কী পরিকল্পনা আছে?
৬. জুলাই বিপ্লবের পর বেসামরিক প্রশাসনও ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়েছে। এখানে প্রধান সমস্যাগুলো হলো সর্বব্যাপী দুর্নীতি, রাজনৈতিক ও দলীয় হস্তক্ষেপ, অদক্ষতা, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার অভাব, আমলাতান্ত্রিক মানসিকতা (শাসকসুলভ আচরণ, পরিবর্তনে অনীহা), সেবা প্রদানে অনাগ্রহ্য, পদোন্নতি-সংকটসহ ভারী কাঠামো, প্রযুক্তি গ্রহণে অনাগ্রহ এবং কেন্দ্র-নির্ভর নীতিনির্ধারণ। এরূপ কারণে মানুষের আস্থা সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে এবং সুশাসন ও সেবা প্রদান ব্যাহত হচ্ছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে কী পরিকল্পনা আছে?
৭. ডিজিএফআই-এর বিরুদ্ধে দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থে অপব্যবহার, গুম ও নির্যাতনের মতো মানবাধিকার লঙ্ঘন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়া এবং সামরিক ও বেসামরিক ভূমিকার সীমারেখা ঝাপসা হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ এই সংস্থাকে পুনর্গঠন করতে রাজনৈতিক দলগুলোর কী পরিকল্পনা আছে?
৮. র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)-এর প্রধান সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন। যেমন বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন, গুম এবং সাজানো ও মিথ্যা মামলার অভিযোগ। এর ফলে আন্তর্জাতিক মহলে নিন্দা, নিষেধাজ্ঞার আহ্বান (যেমন ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা) এবং ‘ডেথ স্কোয়াড’ হিসেবে অভিযুক্ত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে, যা প্রতিষ্ঠানটির জবাবদিহিতা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। র্যাব নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর কী পরিকল্পনা আছে?
৯. বাংলাদেশে সম্পদ বণ্টন অত্যন্ত অসম। দেশের শীর্ষ ১০ শতাংশ মানুষের হাতে রয়েছে মোট সম্পদের অর্ধেকেরও বেশি (প্রায় ৫৮ শতাংশ)। আর নিচের ৫০ শতাংশের হাতে রয়েছে ৫ শতাংশেরও কম। এতে সমাজে চরম বৈষম্য স্পষ্ট রূপ পরিগ্রহ করেছে। যদিও আয় বৈষম্যের মাত্রা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থেকেছে, তবু প্রবৃদ্ধির সুফল মূলত ধনীদেরই উপকারে এসেছে। যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ উপেক্ষিত থেকেছে, ওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি রিপোর্ট ২০২৬-এ যার উল্লেখ পাওয়া যায়। ধনী-গরিবের এই বিশাল ব্যবধান বা ধন বৈষম্য সহনীয় পর্যায়ে আনতে রাজনৈতিক দলগুলোর কী পরিকল্পনা ও কর্মসূচি আছে?
১০. পার্বত্য চট্টগ্রাম দীর্ঘদিন ধরে সংঘাতের আগুনে জ্বলছে। রোহিঙ্গা সংকট, কুকি-চিন সমস্যা এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলগুলোর কী পরিকল্পনা আছে?
১১. আমাদের পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য কী হবে এবং সেগুলো অর্জনের কৌশল কী? যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা তারা কীভাবে মোকাবিলা করবে? ভারতের প্রতি অবস্থান কী হবে? ফ্যাসিস্ট শাসনামলে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তিগুলোর ভবিষ্যৎ কী? করিডোর ইস্যু এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের চলমান বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন নিয়ে তাদের নীতি কী হবে?
১২. নানান বিরোধে বিভক্ত ও ভাঙা একটি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার কোনো পরিকল্পনা কি রাজনৈতিক দলগুলোর আছে? থাকলে, তারা কীভাবে তা বাস্তবায়ন করবে? আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে বাইরে রাখার ক্ষেত্রে ঐক্যের ভিত্তি কি হবে? ফ্যাসিবাদী এই রাজনৈতিক শক্তির বিষয়ে দলগুলোর অবস্থান কী?
১৩. বাংলাদেশের একটি সর্বসম্মত ইতিহাস গড়ে তোলার কোনো পরিকল্পনা কি তাদের আছে? জাতির পিতা ও স্বাধীনতার ঘোষক এমন সকল বিতর্কের অবসান ঘটবে কি করে এবং কোন পদ্ধতিতে?
১৪. লুটেরা ব্যবসায়ী ও অলিগার্কদের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর নীতি কী হবে? বিদেশে পাচার করা অর্থ ফেরত আনার জন্য তারা কী পদক্ষেপ নেবে? ব্যাপক লুটপাটে ভেঙে পড়া আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে পুনর্গঠন করা হবে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কীভাবে পুনরুজ্জীবিত করা হবে?
১৫. ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতিতে বিভক্ত দেশের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্য ও সম্প্রীতির ক্ষেত্রে বিপদের ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। তারা এটা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করার পাশাপাশি উন্নতির ধারায় স্থাপন করবে?
দেশবাসীর সামনে উপস্থাপন করা পরিবার কার্ড, কৃষক কার্ড ইত্যাদি কর্মসূচির চেয়ে উল্লেখিত প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। চলমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গত কয়েক মাস ধরে তাদের ‘সংস্কার সার্কাস’ প্রদর্শন করে এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থেকে জনতার দৃষ্টি সফলভাবে সরিয়ে রাখতে পেরেছে। দেশ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যখন আমাদের সামনে এসব নিয়ে আলোচনা করার সময় এখন আর হাতে নেই। তবুও, জরুরি কিছু প্রশ্নের জবাব চাওয়ার দাবী দেরিতে হলেও তুলে ধরা ভালো। আসুন, হাতে থাকা সীমিত সময়টুকুর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করি।
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!