ভারত, নিউজিল্যান্ড, টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপ
টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ফাইনালে মুখোমুখি ভারত ও নিউজিল্যান্ড   ছবি: সংগৃহীত

রোববার (৮ মার্চ) আহমেদাবাদে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে মাঠে নামবে ভারত। এই ম্যাচে জিতলে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম দল হিসেবে তিনবার শিরোপা জয়ের অনন্য রেকর্ড গড়বে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা। গত ৭ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ২০২৬ সালের এই আসরের পর্দা নামতে যাচ্ছে এক রোমাঞ্চকর ফাইনালের মধ্য দিয়ে। শিরোপা নির্ধারণী এই মহারণে হট ফেভারিট এবং টুর্নামেন্টের অন্যতম স্বাগতিক ভারতের মুখোমুখি হবে ডার্ক হর্স হিসেবে পরিচিত কিউইরা। নিউজিল্যান্ডের সামনেও রয়েছে ইতিহাস গড়ার সুযোগ; কারণ তারা মুখিয়ে আছে নিজেদের প্রথম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শিরোপা জয়ের স্বাদ পেতে।

ভারতের শক্তি ও দুর্বলতা কী কী?

বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা ঠিক যেভাবে টুর্নামেন্ট শুরু করেছিল—হট ফেভারিট হিসেবে—ঠিক সেভাবেই ফাইনালেও মাঠে নামছে। তবে টুর্নামেন্টের মাঝপথে তাদের কিছুটা উত্থান-পতন নিউজিল্যান্ডের জন্য বড় আশার জায়গা হতে পারে। ভারতের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তাদের স্কোয়াডের গভীরতা বা বেঞ্চ স্ট্রেংথ। বিশ্বের এক নম্বর টি-টোয়েন্টি ব্যাটার হয়েও অভিষেক শর্মার এই টুর্নামেন্টটি খুব একটা ভালো কাটছিল না, ঠিক তখনই ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হন সঞ্জু স্যামসন।

অভিষেকের এই ওপেনিং পার্টনার (স্যামসন) নিজের শেষ দুই ইনিংসে দুটি ফিফটি তুলে নিয়েছেন, যা ভারতের ছন্দে ফেরা এবং ফাইনালে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে। স্যামসন মূলত অভিষেক এবং ইশান কিষাণের মাঝে ব্যাট করতে নেমেছেন। কিষাণ যদিও টপ অর্ডারে এখনও বেশ কার্যকরী, তবে স্যামসনের বিধ্বংসী রূপ এবং এই দুই বাঁহাতি ব্যাটারের জুটি ভাঙার কৌশল ভারতের ব্যাটিংয়ে 'গেম-চেঞ্জার' হিসেবে কাজ করেছে।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সেমিফাইনালে জসপ্রিত বুমরাহ'র শেষ ওভারটি ছিল জয়ের মূল নিয়ামক; যেখানে তিনি মাত্র ৬ রান দিয়েছিলেন। ম্যাচসেরার পুরস্কার জেতা স্যামসনও অকপটে স্বীকার করেছেন যে, এই পুরস্কার মূলত বুমরাহরই প্রাপ্য ছিল, কারণ তিনি না থাকলে ভারত হয়তো ফাইনালেই উঠতে পারত না। ডানহাতি এই পেসারের নিখুঁত বোলিং, বিশেষ করে চাপের মুহূর্তে তার নির্ভুল ইয়র্কার সত্যিই প্রশংসনীয়। পাশাপাশি ১২ উইকেট নিয়ে টি-টোয়েন্টি র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ বোলার বরুণ চক্রবর্তী ভারতের স্পিন আক্রমণের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

সেমিফাইনালে ৩৫ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে ঘরের মাঠের বিপুল সমর্থন ভারতের জয়ে বড় প্রভাব ফেলেছিল। যদিও সে ম্যাচে ইংল্যান্ড ভারতকে প্রবল চাপে ফেলে দিয়েছিল এবং একপর্যায়ে পুরো স্টেডিয়াম স্তব্ধ হয়ে পড়েছিল। তবে এখন ফাইনালে ভারতের সেই 'দ্বাদশ খেলোয়াড়' বা দর্শকরা আরও বড় রূপ ধারণ করবে, কারণ ১ লাখ ৩২ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার স্টেডিয়ামে নীল জার্সির পক্ষে গগনবিদারী সমর্থন দেখা যাবে।

ভারতের গলার কাঁটা নড়বড়ে ব্যাটিং
স্যামসনের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দলের বাকি টপ অর্ডারের ফর্মহীনতাকে পুরোপুরি ঢাকতে পারেনি। বিশ্বের এক নম্বর টি-টোয়েন্টি ব্যাটার হিসেবে টুর্নামেন্টে খেলতে আসা অভিষেক টানা তিন ম্যাচে শূন্য রানে (ডাক) আউট হন। সুপার এইটে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে একটি ফিফটি করে তিনি নিজের প্রতিভার ঝলক দেখালেও, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খুব সহজেই আউট হয়ে যান।

নিউজিল্যান্ডের শক্তি ও দুর্বলতা কী কী?

একক তারকার চেয়ে দলগত শক্তিতেই ভরসা
নিউজিল্যান্ড আইসিসির বড় টুর্নামেন্টগুলোতে অংশগ্রহণকারী ছোট দেশগুলোর একটি হলেও, বছরের পর বছর ধরে তারা তখনই সেরা পারফরম্যান্স দেখিয়েছে, যখন তারা একক খেলোয়াড়ের বদলে একটি সুসংগঠিত দল হিসেবে খেলেছে। এবারের আসরেও এর ব্যতিক্রম হয়নি।

কয়েক বছর ধরে ব্ল্যাকক্যাপসদের হয়ে খেলা অনেক বড় তারকার অনুপস্থিতি সত্ত্বেও, কিউইদের ১ থেকে ১১ নম্বর পর্যন্ত খেলোয়াড়দের যে সম্মিলিত শক্তি রয়েছে, তা যেকোনো দলকে ধসিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। সেমিফাইনালে চরম মূল্য চুকিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা এই বিষয়টি খুব ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছে।

অধিনায়ক মিচেল স্যান্টনারের নেতৃত্ব এবং বিশ্বমানের স্পিন বোলিং হয়তো এই দলটির মূল শক্তি। তারা চুপচাপ থাকলেও বড় প্রতিপক্ষের জৌলুস, খ্যাতি বা অহংকারে মোটেও বিচলিত হয় না। গ্লেন ফিলিপস এবং রাচিন রবীন্দ্রর মতো ব্যাটিং অলরাউন্ডারদের সহায়তা নিয়ে স্যান্টনার যেকোনো মুহূর্তে তাদের অলরাউন্ড দক্ষতার সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে পারেন।

টিম সাইফার্ট ও ফিন অ্যালেনের ওপেনিং জুটির ভয়ংকর রূপ সেমিফাইনালে প্রোটিয়াদের বিপক্ষেই দেখা গেছে, বিশেষ করে অ্যালেনের অসাধারণ সেঞ্চুরিটি ছিল দেখার মতো।

কিউইদের ম্যাচ উইনারদের তালিকা বোলিংয়েও বিস্তৃত। লকি ফার্গুসনের গতি এবং ম্যাট হেনরি ও জ্যাকব ডাফির পেস আক্রমণের পাশাপাশি ইশ সোধি এবং কোল ম্যাককঞ্চির স্পিন দলটিকে দারুণ ভারসাম্য দিয়েছে। উল্লেখ্য, দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ম্যাককঞ্চি ২ উইকেট নিয়ে দলের জয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

ফিল্ডিং
গত এক দশক বা তারও বেশি সময় ধরে বিশ্ব ক্রিকেটে সেরা ফিল্ডিংয়ের প্রসঙ্গ এলে নিউজিল্যান্ডের নাম সবসময় ওপরের দিকেই থাকে। গ্লেন ফিলিপস বিশ্বের অন্যতম সেরা একজন ফিল্ডার এবং তার অসাধারণ দক্ষতা হয়তো কিউইদের এই টুর্নামেন্টের সেরা ফিল্ডিং দল হিসেবে প্রমাণ করে। মাঠে সবকিছুই সহজ মনে হলেও, তাদের চোখ ধাঁধানো এবং অনেক সময় শূন্যে ভেসে থাকা (অ্যাক্রোব্যাটিক) ক্যাচ ও ফিল্ডিং দেখার জন্যই যেন দর্শকরা টিকিট কাটেন।

লোয়ার অর্ডারের ব্যর্থতা
নিউজিল্যান্ড যত ওপরের দিকেই উঠুক না কেন, দলে একজন সত্যিকারের সুপারস্টারের অভাব মাঝেমধ্যেই তাদের ভুগিয়েছে। দুটি হার নিয়ে সুপার এইট থেকে সেমিফাইনালে ওঠা একমাত্র দল তারা, যা যেমন প্রশংসনীয়, তেমনি একটি বড় সতর্কবার্তাও বটে। টপ অর্ডারের আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের কারণে হয়তো মিডল অর্ডারে কিছুটা ভারসাম্যহীনতা দেখা যেতে পারে। এই জায়গায় দলের এমন খেলোয়াড়দের জ্বলে ওঠা প্রয়োজন, যারা শেষ দিকে ম্যাচ বের করে আনতে পারেন (ফিনিশার)। আর ফাইনালেই এই অভাব পূরণের সেরা সময়।

২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের যাত্রা কেমন ছিল?
ভারতের এবারের বিশ্বকাপ যাত্রা এখন পর্যন্ত মিশ্র অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে, বিশেষ করে তাদের টপ-অর্ডার ব্যাটাররা নামের প্রতি সুবিচার করতে ব্যর্থ হয়েছেন।

গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে তাদের জয়টি খুব একটা সাবলীল না হলেও, চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের বিপক্ষে দুর্দান্ত জয়ে সুপার এইট নিশ্চিত করার পর তা সবাই ভুলে যায়। এরপর নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে গ্রুপ পর্বে টানা তিন জয়ে শীর্ষস্থান নিশ্চিত করে ভারত।

সুপার এইটের প্রথম ম্যাচেই ২০২৪ সালের ফাইনালে পরাজিত করা দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে হারে ভারত, যার ফলে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে পরের ম্যাচটি তাদের জন্য 'ডু অর ডাই' বা বাঁচামরার লড়াই হয়ে দাঁড়ায়। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৭২ রানের বড় জয়ে অভিষেক শর্মা ফিফটি করে ফর্মে ফেরেন; তবে অলরাউন্ড নৈপুণ্যে (হাফ সেঞ্চুরি ও বোলিং) ম্যাচসেরা হন হার্দিক পান্ডিয়া।

তবে গ্রুপ থেকে সেমিফাইনালে ওঠার আসল লড়াইটি ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। কলকাতায় ওই ম্যাচে রান তাড়ার চরম চাপের মুখে সঞ্জু স্যামসন এক দারুণ ও স্থির ইনিংস খেলে ভারতকে ৫ উইকেটের জয় এনে দেন এবং সেমিফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করেন।

আগের তিনটি ম্যাচে একাদশের বাইরে থাকা স্যামসন ওই ম্যাচে ফিরে অপরাজিত ৯৭ রানের এক অসাধারণ ইনিংস খেলেন এবং ইডেন গার্ডেন্সে উপস্থিত হাজারো দর্শকের সামনে ভারতকে একটি স্মরণীয় জয় উপহার দেন।

ডানহাতি এই ব্যাটার ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালেও ঠিক একই রকম ঝলমলে এক ইনিংস খেলেন এবং ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে ৮৯ রানের দুর্দান্ত এক স্কোর করেন। ইংল্যান্ডের হয়ে জ্যাকব বেথেল সেঞ্চুরি হাঁকালেও, শেষ পর্যন্ত ভারতীয়রা স্নায়ুচাপ ধরে রেখে ৭ রানের এক রোমাঞ্চকর জয় ছিনিয়ে নেয়।

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ডের যাত্রা কেমন ছিল?
আফগানিস্তানের বিপক্ষে ৫ উইকেটের সহজ জয় দিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু করে নিউজিল্যান্ড, যেখানে আফগান বোলাররা কিউইদের ব্যাটিং দাপটের সামনে দাঁড়াতেই পারেনি। দ্বিতীয় ম্যাচে ফিন অ্যালেন এবং টিম সাইফার্টের ব্যাটিং-ঝড়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে ১০ উইকেটে উড়িয়ে দেয় তারা, যেখানে ১৭৫ রানের লক্ষ্য অনায়াসেই পেরিয়ে যায় দলটি।

তবে স্যান্টনারের দল প্রথম হারের স্বাদ পায় দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে, যেখানে ১৭৬ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে প্রোটিয়া বোলারদের সামনে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়ে কিউইরা ৭ উইকেটে হারে। এরপর গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে কানাডাকে ৮ উইকেটে সহজেই হারিয়ে সুপার এইটে পা রাখে তারা।

সুপার এইটে পাকিস্তানের বিপক্ষে তাদের প্রথম ম্যাচটি বৃষ্টির কারণে পরিত্যক্ত হয়। দ্বিতীয় ম্যাচে সহ-আয়োজক শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দুই মূল্যবান পয়েন্ট এবং স্বাস্থ্যকর নেট রান-রেট (NRR) নিয়ে সেমিফাইনালের দৌড়ে ভালোভাবে টিকে থাকে নিউজিল্যান্ড। সুপার এইটের শেষ ম্যাচে ইংল্যান্ড দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে দেয়। তবে পাকিস্তান শ্রীলঙ্কাকে বড় ব্যবধানে হারাতে ব্যর্থ হওয়ায় ব্ল্যাকক্যাপসদের সেমিফাইনালের টিকিট নিশ্চিত হয়ে যায়।

সেমিফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকার অপরাজিত যাত্রার কারণে নিউজিল্যান্ডকে অনেকেই 'আন্ডারডগ' হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। তবে সব সমীকরণ উল্টে দিয়ে প্রোটিয়াদের ৯ উইকেটে বিশাল ব্যবধানে হারিয়ে ফাইনালে পা রাখে কিউইরা।

দলের খবর: ভারত
ফাইনালে ওঠার কারিগরদের ওপরই আস্থা রাখতে পারে ভারত। অর্থাৎ, সেমিফাইনালের একাদশ নিয়েই তাদের মাঠে নামার সম্ভাবনা বেশি।

ভারতের সম্ভাব্য একাদশ:
অভিষেক শর্মা, সঞ্জু স্যামসন (উইকেটরক্ষক), ইশান কিষাণ, সূর্যকুমার যাদব (অধিনায়ক), তিলক ভার্মা, হার্দিক পান্ডিয়া, শিবম দুবে, অক্ষর প্যাটেল, জসপ্রিত বুমরাহ, আর্শদীপ সিং, বরুণ চক্রবর্তী।

দলের খবর: নিউজিল্যান্ড
দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারানো বিজয়ী একাদশটিই ফাইনালে অপরিবর্তিত রাখতে পারে ব্ল্যাকক্যাপসরা।

নিউজিল্যান্ডের সম্ভাব্য একাদশ:
টিম সাইফার্ট (উইকেটরক্ষক), ফিন অ্যালেন, রাচিন রবীন্দ্র, গ্লেন ফিলিপস, ড্যারিল মিচেল, মার্ক চ্যাপম্যান, মিচেল স্যান্টনার (অধিনায়ক), ম্যাট হেনরি, ইশ সোধি, লকি ফার্গুসন, জ্যাকব ডাফি।