এখনও খোলেনি পাবনার দাদী-নাতনী হত্যার রহস্যের জট
এখনও খোলেনি পাবনার দাদী-নাতনী হত্যার রহস্যের জট   ছবি: সংগৃহীত

নরসিংদীতে বাবা-মেয়ে হত্যার ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই এবার পাবনার ঈশ্বরদীতে দাদী ও নাতনীকে হত্যার ঘটনায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের প্রায় ১৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও এখনো রহস্যের জট খুলতে পারেনি পুলিশ। কারা এবং কী কারণে এই নৃশংস ঘটনা ঘটিয়েছে, তা নিয়ে এলাকায় তীব্র উদ্বেগ ও শোকের আবহ বিরাজ করছে।

শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) দিবাগত গভীর রাতে ঈশ্বরদী উপজেলার দাশুড়িয়া ইউনিয়নের ভবানীপুর উত্তরপাড়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সকালে বাড়ির সামনে ও পাশের সরিষাক্ষেতে দুইজনের মরদেহ পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশে খবর দেয়। ঈশ্বরদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মমিনুজ্জামান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

নিহতরা হলেন, সুফিয়া বেগম (৭০) ও তার নাতনী জামিলা আক্তার (১৫)। সুফিয়া বেগম একই গ্রামের মৃত নজিমুদ্দিনের স্ত্রী। জামিলা স্থানীয় কালিকাপুর দাখিল মাদরাসার দশম শ্রেণির ছাত্রী ছিল। এলাকাবাসীর ভাষ্য, সে মেধাবী ও ধর্মীয় শিক্ষায় পারদর্শী ছিল এবং গ্রামের নারীদের নিয়ে তারাবি নামাজ আদায় করাতো।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, প্রায় সাত বছর আগে সুফিয়া বেগমের স্বামী মারা যান। এরপর তিনি বাড়িতে একাই থাকতেন। নাতনী জামিলা ছোটবেলা থেকেই দাদীর কাছেই বড় হয়েছে। জামিলার বাবা জয়নাল আবেদীন আগে পেশায় গাড়িচালক ছিলেন, বর্তমানে নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন এবং সম্প্রতি বাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন। জামিলার মা শিরিনা খাতুন ছয় বছর আগে আলাদা হয়ে অন্যত্র বিয়ে করেন। তিন বোনের মধ্যে জামিলা ছিল সবার ছোট; বড় দুই বোনের বিয়ে হয়ে গেছে।

স্থানীয়দের বর্ণনা অনুযায়ী, শুক্রবার রাতে খাওয়া-দাওয়া শেষে দাদী ও নাতনী ঘুমিয়ে পড়েন। মধ্যরাতের পর বাড়ি থেকে কান্নার শব্দ শুনে কয়েকজন প্রতিবেশী বাইরে বের হলেও অন্ধকার ও ভয়ের কারণে কেউ ভেতরে প্রবেশের সাহস পাননি। কিছুক্ষণ পর শব্দ থেমে গেলে তারা নিজ নিজ ঘরে ফিরে যান। শনিবার সকালে বাড়ির প্রবেশমুখে সুফিয়া বেগমের রক্তাক্ত মরদেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়। পরে খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে বাড়ির পেছনের সরিষাক্ষেতে জামিলার মরদেহ পাওয়া যায়।

পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাবনা জেনারেল হাসপাতালে পাঠায়। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন পাবনার পুলিশ সুপার আনোয়ার জাহিদ। এছাড়া সিআইডির একটি দলও তদন্তে যুক্ত হয়েছে।

ঈশ্বরদী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার প্রণব কুমার জানান, সুরতহাল প্রতিবেদনে প্রাথমিকভাবে যৌন সহিংসতার আলামত পাওয়া গেছে। প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, দুর্বৃত্তরা জামিলাকে লক্ষ্য করে বাড়িতে প্রবেশ করে থাকতে পারে। বাধা দেওয়ায় প্রথমে দাদীকে হত্যা করা হয়, পরে নাতনীকেও হত্যা করে মরদেহ বাড়ির পেছনে ফেলে রেখে যায়। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।

প্রতিবেশী নাসিমা খাতুন বলেন, নিহত সুফিয়া বেগমের সঙ্গে কারো কোনো বিরোধ ছিল না। জামিলাও ছিল শান্ত ও ভদ্র স্বভাবের মেয়ে। এমন ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত হতে পারে, তা ভেবে পাচ্ছেন না তারা। নিহতের স্বজনরাও একই কথা বলেছেন তাদের কোনো শত্রু ছিল না এবং আগে কোনো হুমকির কথাও জানা ছিল না।

নিহত সুফিয়া বেগমের বোন কুরসী খাতুন ও জামিলার বড় বোন মিনু খাতুন কান্নাজড়িত কণ্ঠে ঘটনার বিচার দাবি করেন। তাদের অভিযোগ, এটি পরিকল্পিত ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড। তারা জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান।

পাবনার পুলিশ সুপার আনোয়ার জাহিদ বলেন, এটি অত্যন্ত জঘন্য ঘটনা। সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করছে। হত্যার কারণ ও জড়িতদের বিষয়ে এখনো নিশ্চিতভাবে কিছু বলা না গেলেও দ্রুত রহস্য উদঘাটন করে দায়ীদের আইনের আওতায় আনা হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।