পুঁজিবাজার
সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল)।   ছবি: সংগৃহীত

দীর্ঘদিনের অনাস্থা আর স্থবিরতার পর দেশের পুঁজিবাজারে আস্থার হাওয়া বইতে শুরু করেছে। এক সময় যেখানে বিনিয়োগকারীদের অনাগ্রহ আর হতাশাই ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু, সেখানে এখন দৃশ্যপট বদলাচ্ছে দ্রুত। বাজারে ফিরছে প্রাণচাঞ্চল্য, বাড়ছে লেনদেনের গতি, আর নতুন করে আগ্রহ দেখাচ্ছেন ক্ষুদ্র ও প্রাতিষ্ঠানিক—দুই ধরনের বিনিয়োগকারীরাই।

চলতি বছরের প্রথম দেড় মাসেই এর স্পষ্ট প্রতিফলন মিলেছে। এ সময়ে সার্বিকভাবে ৮ হাজার ৩৩৪টি নতুন বেনিফিসিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাব যুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি কার্যদিবসে গড়ে প্রায় ২৬০টি করে নতুন হিসাব খোলা হয়েছে—যা বাজারে ক্রমবর্ধমান আস্থারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ মন্দার পর বাজারে ইতিবাচক প্রবণতা তৈরি হওয়ায় নতুন বিনিয়োগকারীরা সুযোগ কাজে লাগাতে এগিয়ে আসছেন। ধারাবাহিকভাবে নতুন বিও হিসাব খোলার এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা ও গতি—দুটিই আরও জোরালো হতে পারে।

বিও হিসাব হলো পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের জন্য ব্রোকারেজ হাউস বা মার্চেন্ট ব্যাংকের মাধ্যমে খোলা বিনিয়োগ হিসাব। এই হিসাব ছাড়া শেয়ার কেনাবেচা করা যায় না। বিও হিসাবের তথ্য সংরক্ষণ ও তদারকির দায়িত্বে রয়েছে সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল)।

সিডিবিএলের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে মোট বিও হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ৪৮ হাজার ৭০৯টি। ২০২৫ সালের শেষে এই সংখ্যা ছিল ১৬ লাখ ৪০ হাজার ৩৭৫টি। অর্থাৎ মাত্র ৩২ কার্যদিবসেই বাজারে নতুন বিনিয়োগকারীর উল্লেখযোগ্য সংযোজন হয়েছে।

বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ কিছুটা কমলেও স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের সক্রিয়তা বাজারকে এগিয়ে নিচ্ছে। বর্তমানে দেশি বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব রয়েছে ১৫ লাখ ৮৭ হাজার ৬৫৯টি, যা ২০২৫ সালের শেষে ছিল ১৫ লাখ ৭৯ হাজার ২৩টি। অর্থাৎ চলতি বছরে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব বেড়েছে ৮ হাজার ৬৩৬টি। গড়ে প্রতি কার্যদিবসে প্রায় ২৬০টি নতুন দেশি বিও হিসাব যুক্ত হয়েছে। এই প্রবৃদ্ধি প্রমাণ করে, অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগকারীরাই এখন পুঁজিবাজারের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠছেন।

বাজারে পুরুষ ও নারী—উভয় শ্রেণির বিনিয়োগকারীর উপস্থিতিই বাড়ছে। বর্তমানে পুরুষ বিনিয়োগকারীদের নামে বিও হিসাব রয়েছে ১২ লাখ ৪০ হাজার ৫৩০টি, যা ২০২৫ সালের শেষে ছিল ১২ লাখ ৩৩ হাজার ৭৪৩টি। অর্থাৎ বেড়েছে ৬ হাজার ৭৮৭টি।

নারী বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৯০ হাজার ২৩৫টি। ২০২৫ সালের শেষে এই সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৮৮ হাজার ৮২৯টি। অর্থাৎ চলতি বছরে নারী বিনিয়োগকারীদের বিও বেড়েছে ১ হাজার ৪০৬টি। নারীদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ বাজারের অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির দিকটি আরও জোরালো করছে।

কোম্পানির নামেও নতুন বিও হিসাব খোলা হচ্ছে। বর্তমানে কোম্পানি বিও হিসাব রয়েছে ১৭ হাজার ৯৪৪টি, যা ২০২৫ সালের শেষে ছিল ১৭ হাজার ৮০৩টি। অর্থাৎ বেড়েছে ১৪১টি।

একক নামে বিও হিসাব এখন ১১ লাখ ৯০ হাজার ৩৪৩টি—গত বছরের শেষে যা ছিল ১১ লাখ ৮২ হাজার ৭১৫টি। অর্থাৎ একক হিসাব বেড়েছে ৭ হাজার ৬২৮টি।
এছাড়া যৌথ নামে বিও হিসাব দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৪০ হাজার ৪২২টি, যা ২০২৫ সালের শেষে ছিল ৪ লাখ ৪৩৯ হাজার ৮৫৭টি নয়, বরং ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৮৫৭টি। অর্থাৎ যৌথ বিও হিসাব বেড়েছে ৫৬৫টি।

২০২৪ সালের শুরুতে মোট বিও হিসাব ছিল ১৭ লাখ ৭৩ হাজার ৫৫১টি। পরবর্তীতে ওঠানামা থাকলেও চলতি বছরের শুরুতে নতুন করে বিও হিসাব বাড়ার ধারা বাজারে আস্থা ফিরে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সব মিলিয়ে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ, নারী বিনিয়োগকারীর বৃদ্ধি এবং নতুন একক ও কোম্পানি হিসাব খোলার প্রবণতা দেশের পুঁজিবাজারে ইতিবাচক গতি তৈরি করছে। অভ্যন্তরীণ শক্তির ওপর ভর করে বাজার আরও স্থিতিশীল ও টেকসই পথে এগোবে—এমন প্রত্যাশাই করছেন সংশ্লিষ্টরা।

চলতি বছরে বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব কমেছে ৪৩ হাজার ৫৪৯টি থেকে ৪৩ হাজার ১০৬টিতে। অর্থাৎ কমেছে ৪৪৩টি। গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১৪ জন বিদেশি বা প্রবাসী বিনিয়োগকারী বাজার ছেড়েছেন।