ঢাকা–দিল্লি সম্পর্ক
বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যসহ আমদানিতে ভারত নির্ভরতা কমেনি।   ছবি: সংগৃহীত

ছাত্র-জনতার গণ-আন্দোলনের পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেন। এরপর ঢাকা–দিল্লি সম্পর্কের আস্থা কমতে থাকে, সীমান্তে উত্তেজনা ও কূটনৈতিক কঠোরতা দেখা দেয়। এ অবস্থায় বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যসহ আমদানিতে ভারত নির্ভরতা কমবে বলে ধারনা করা হয়েছিল। কিন্তু তথ্য বলছে—এই টানাপড়েনের মধ্যেও ভারত থেকে আমদানি থেমে যায়নি; বরং ২০২৪–২৫ অর্থবছরে আমদানি প্রবৃদ্ধি বেড়েছে ৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৫ অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে মোট পণ্য আমদানিতে ব্যয়ের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২ দশমিক ৪৪ শতাংশ। শুধু ভারত থেকে আমদানি ব্যয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ।

২০২৩–২৪ অর্থবছরে ভারত থেকে আমদানি হয়েছিল ৮৯৮ কোটি ৯০ লাখ ডলার। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ৯৬৯ কোটি ৩০ লাখ ডলার। চীন থেকে আমদানির পরিমাণ ছিল সর্বাধিক—২ হাজার ৫২ কোটি ২০ লাখ ডলার। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি কমেছে ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ।

৫ আগস্ট-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দুই দেশের সম্পর্কের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া, ‘পুশ-ইন’ অভিযোগ, ভিসা ও কনস্যুলার সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে সম্পর্ক জটিল হয়।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ কাঁচা পাট রপ্তানিতে কঠোর নিষেধাজ্ঞা দেয়। ২০২৫ সালের এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে ভারত তৃতীয় দেশে পণ্য পাঠানোর ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বাতিল করে। ১৫ এপ্রিল বাংলাদেশ ঘোষণা দেয়, ভারত থেকে সুইং সুতা ও কিছু কাঁচামাল স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি বন্ধ থাকবে। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ভারত কিছু বাংলাদেশি পণ্যের স্থলবন্দর আমদানিতে সীমাবদ্ধতা আরোপ করে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাজারের চাহিদা ও খরচ অনুযায়ী আমদানি চলে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, যেখানে কম খরচে পণ্য পাওয়া যায়, আমদানিকারক সেখান থেকেই আনে। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারত ও চীনের লিড টাইম ও পরিবহন খরচ তুলনামূলক কম। শুল্ক বা বাধা থাকলেও যদি ব্যয় সুবিধা থাকে, আমদানি থেমে যায় না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে চট্টগ্রাম অঞ্চলের একজন ব্যবসায়ী বলেন, বিভিন্ন কারণে ভারত থেকে আমদানি নির্ভরতা কমছে না। এর বড় কারণ পরিবহন ব্যয়। ভারত থেকে পণ্য আমদানিতে পরিবহন খরচ কম হয়। স্থানীয় বাজারেও তুলনামূলক কম মূল্যে সেই পণ্য বিক্রি করা যায়।

তার দাবি, বাংলাদেশ–ভারতের সম্পর্ক বহুস্তরীয়—রাজনৈতিক, কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও মানুষে মানুষে। রাজনৈতিক টানাপড়েন থাকলেও অর্থনৈতিক যোগাযোগ পুরোপুরি থামবে না। তবে দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক সম্পর্ক খারাপ হলে অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ভারত থেকে বাংলাদেশ মূলত তুলা, খাদ্যশস্য (চাল, গম), সুতা, খনিজ জ্বালানি ও তেল, যন্ত্রপাতি, লোহা-ইস্পাত, কেমিক্যাল, প্লাস্টিক পণ্য, এবং বিভিন্ন যানবাহন ও এর যন্ত্রাংশ আমদানি করে। এছাড়া পেঁয়াজ, চিনি, ডাল, এবং বিদ্যুৎও ভারত থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে আমদানি করা হয়।