বসন্ত, ভালোবাসার মূহুর্ত, প্রেম, ফাগুন, আবেগ, বাসন্তি শাড়ি, দুঃখ-বেদনা, যন্ত্রণা,
বসন্তের রঙে রঙিন ভালোবাসার মূহুর্ত   ছবি: আরটিএনএন

ফাগুনের মাতাল হাওয়ায় ভেসে আসা ফুলের গন্ধ প্রকৃতি জানান দেয় ‘বসন্ত’ এসে গেছে। ছয় ঋতুর মধ্যে বসন্ত প্রেম ও ভালোবাসার জন্য একটু বেশিই রোমান্টিক। কারণ ফাল্গুনের প্রথম দিন বিশ্ব ভালোবাসা দিবস হওয়ায় বসন্ত উৎসব মিশে যায় ভালোবাসার রঙে। দিনটিতে রঙিন শাড়ি, কাচের চুড়ি, কপালে টিপ, ঠোঁটে লিপস্টিক ও মাথায় ফুল গুঁজা তরুণী এবং গোলাপ হাতে রঙিন পাঞ্জাবি পরাসহ রঙিন সাজে তরুণ-বৃদ্ধ সবাই পদাচারণায় মুখর থাকে শহর গ্রামের পথ।

বাতাসে বসন্তের আগমনী বার্তা। প্রকৃতি খুলেছে তার দখিনা দুয়ার। প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে বিদায় নিয়েছে শীত। ঋতুরাজ বসন্ত তার নিজস্ব উষ্ণতায় প্রাণসঞ্চার করছে, ফাল্গুনের হাওয়া দোল খাচ্ছে প্রকৃতিতে। মৌমাছিদের গুঞ্জরন, কোকিলের কুহুতান, গাছে গাছে পলাশ আর শিমুলের রঙের মেলা। সব মিলিয়ে প্রকৃতি জানান দিচ্ছে, বসন্ত এসে গেছে।

বসন্তের রঙে রঙিন ভালোবাসার মূহুর্ত

ফাল্গুনের হাত ধরেই ঋতুরাজ বসন্তের আগমন

আজ পহেলা ফাল্গুন। ঋতুরাজ বসন্তের প্রথম দিন। ফাল্গুনের হাত ধরেই ঋতুরাজ বসন্তের আগমন। ঋতুরাজকে স্বাগত জানাতে প্রকৃতি আজ বর্ণিল সাজে সেজেছে। সেই সঙ্গে ভালোবাসার গানে, ভালোবাসার অনুভূতির কাছে নিজেকে সঁপে দিতে একইদিনে এসেছে ভালোবাসা দিবস। ঋতুরাজের হাত ধরে এসেছে ভালোবাসার দিনটি। বসন্ত আর ভালোবাসার বহুমাত্রিক রূপ-সৌরভে ভরপুর চারদিক। যার মাধ্যমে জীর্ণতাকে সরিয়ে ফুলে ফুলে ভরে উঠবে জীবন। গত বছরও ভালোবাসা দিবসেই পালিত হয়েছিল পহেলা ফাল্গুন। বাংলা বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী, এর আগে বসন্তের প্রথম দিন অর্থাৎ পহেলা ফাল্গুন ছিল ১৩ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু বাংলা বর্ষপঞ্জি সংশোধনের পর একই দিনে এবারও পড়েছে বসন্ত উৎসব আর ভালোবাসা দিবস।

ফুলে ফুলে ভ্রমরের খেলা। গাছে গাছে পলাশ আর শিমুলের মেলা। সব মিলিয়ে প্রকৃতি জানান দিচ্ছে, আজ পহেলা ফাল্গুন। সেই সঙ্গে তরুণ-তরুণীদের মাঝে বসন্ত বরণের উচ্ছ্বাস। ফাগুনের আগুনে, মন রাঙিয়ে বাঙালি তার দীপ্ত চেতনায় উজ্জীবিত হচ্ছে আজ। বাসন্তী রঙের শাড়ি, কপালে টিপ, হাতে চুড়ি, পায়ে নূপুর, খোঁপায় ফুল অথবা রিং জড়িয়ে আজ বেরিয়ে পড়বে তরুণীর দল। প্রকৃতির সাথে নতুন সাজে সাজবে তারাও। তাদের উচ্ছ্বাস মনে করিয়ে দেয় কবির কবিতার লাইন ‘ফুল ফুটুক আর নাই ফুটুক, আজ বসন্ত’।

বসন্তের রঙে রঙিন ভালোবাসার মূহুর্ত

যে কারণে একই দিনে পহেলা ফাল্গুন ও ভালোবাসা দিবস

প্রতিবার ১৩ ফেব্রুয়ারি বসন্ত উৎসব পালিত হত। কিন্তু গত বছর বাংলা একাডেমির সংশোধিত বাংলা বর্ষপঞ্জি প্রকাশ করে। ওই পঞ্জি অনুযায়ী, বসন্ত উৎসব গতবার থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পালিত হচ্ছে। এবারও একইভাবে ১৪ ফেব্রুয়ারি পালিত হচ্ছে পহেলা ফাল্গুন ও ভালোবাসা দিবস। ইংরেজি বর্ষপঞ্জির ১৪ ফেব্রুয়ারি দিনটিকে ভালোবাসা দিবস হিসেবে পালন করা হয় সারা বিশ্বে। তাই বাংলা বর্ষপঞ্জি সংশোধনের পর একই দিনে পড়েছে দিবস দুটি।

বাংলা একাডেমির তথ্য অনুসারে, সংশোধিত বর্ষপঞ্জিতে বৈশাখ থেকে আশ্বিন পর্যন্ত প্রথম ছয় মাস ৩১ দিন, কার্তিক থেকে মাঘ মাস ৩০ দিন এবং ফাল্গুন মাস ২৯ দিন ধরে গণনা করা হবে। তবে গ্রেগরীয় পঞ্জিকার অধিবর্ষে (লিপ ইয়ার) ফাল্গুন মাস ২৯ দিনের পরিবর্তে ৩০ দিন গণনা করা হবে বলে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তাই সেভাবেই সাজানো হয়েছে নতুন বাংলা বর্ষপঞ্জি। যে কারণে বাংলা বর্ষপঞ্জি সংশোধনের পর একই দিনে পড়েছে বসন্ত উৎসব আর ভালোবাসা দিবস।

যেভাবে উদযাপন শুরু হলো ‘বসন্ত উৎসব’

প্রাচীন আমল থেকেই বাঙালি বসন্ত উৎসব পালন করে আসছে। হিন্দুদের পৌরাণিক উপাখ্যান ও লোককথাগুলোতে এই উৎসবের উল্লেখ পাওয়া যায়। হিন্দু বৈষ্ণবরা এটি বেশ আয়োজনের সঙ্গে পালন করেছেন। জানা গেছে, সম্রাট আকবর বাংলা বর্ষপঞ্জি হিসেবে আকবরি সন প্রবর্তন করেন। সে সময় তিনি প্রতি বছর ১৪টি উৎসব পালনের রীতিও প্রবর্তন করেন। এর মধ্যে অন্যতম ছিল বসন্ত উৎসব।

১৯০৭ সালে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোট ছেলে শমীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরে শান্তিনিকেতনে যাত্রা শুরু করে বসন্ত উৎসব, যা ‘ঋতুরঙ্গ উৎসব’ নামে পরিচিত। ১৪০১ বঙ্গাব্দে জাতীয় বসন্ত উৎসব উদযাপন পরিষদের আয়োজনে আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকায় শুরু হয় বসন্ত উৎসব। 

Model Ameer Parvez ZAkia Eme (6) - Copy

ঋতুরাজের হাত ধরে এলো ভালোবাসার দিন

এবার ঋতুরাজের হাত ধরে এসেছে ভালোবাসা দিবস। আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। ভালোবাসা ক্ষণিকের নয়। ভালোবাসা চিরন্তন। ভালোবাসা শুধু প্রেমিক-প্রেমিকার নয়- শুধু স্বামী-স্ত্রীর নয়, এই ভালোবাসা বয়সের ফ্রেমে বাঁধা নয়, এটা প্রসারিত হয় বন্ধু-বান্ধব, পরিচিতজনসহ সবার মাঝেই। তবে ভালোবাসা দিবস যুগলদের মনের উচ্ছ্বাসকে বাড়িয়ে দেয় কয়েকগুণ। ভালোবাসার গানে, ভালোবাসার মহানুভূতির কাছে নিজেকে নিশ্চিন্তে সঁপে দিতেই ভালোবাসার বিশেষ দিবস, ভালোবাসা দিবস। পৃথিবীব্যাপী আজকের এই দিনটি সব যুগলের জন্যই বিশেষ। 

বাংলা একাডেমির সংস্কার করা বর্ষপঞ্জির হিসাবে ফাল্গুনের পহেলা দিনটি মিশেছে ভালোবাসার দিনে। ঋতুরাজ বসন্ত আর ভালোবাসা দিবস বাঙালির মনের ভালোবাসা আর উচ্ছ্বাসের কোনো কমতি রাখেনি। এই দিনে প্রায় সবার হাতে হাতেই সৌন্দর্য আর ভালোবাসার প্রতীক ফুল শোভা পায়। পৃথিবীতে এমন কোনো মানুষ নেই, যে ফুল ভালোবাসে না। ফুলের যেমন রয়েছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, তেমনি রয়েছে স্বর্গীয় সুখানুভূতি। 

ফুলের প্রতি ভালোবাসা সবার চিরন্তন। ফুল শব্দটা মনকে আলোড়িত করে। ‘ফুল’ কথাটার মাঝেই লুকিয়ে আছে ভালো লাগার পরশ। ১৪ ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবসে ফুল আর সুরের মূর্ছনায় দুলে উঠেছে প্রতিটি প্রেমিক-প্রেমিকার মন। আনমনে তাইতো তারা বারবার গেয়ে উঠছে ‘ভালোবাসি ভালোবাসি’, এ সুরের কাছে দূরে জলে স্থলে বাজায় বাঁশি’। প্রিয়জনকে ভালোবাসার কথা জানাতে সুনীল তন্ন তন্ন করে খুঁজে এনেছিলেন ১০৮টা নীলপদ্ম, কিন্তু এসময়ে এসে ভালোবাসার কথা জানাতে বা  ভালোবাসা দিবসে নীলপদ্ম পাওয়া না গেলেও পাড়া-মহল্লা, অলি-গলির সব জায়গাতেই পাওয়া যাচ্ছে নানা রঙের বাহারি দৃষ্টিনন্দন সব ফুল। যে কারণে ভালোবাসা দিবসকে আরও সমৃদ্ধ করতে ফুল নিয়ে মাতামাতি আজ সবখানেই।

ভালোবাসা শুধু নির্ভরতাতেই সীমাবদ্ধ নয় বরং মানবতার জন্য আত্মত্যাগেও প্রকাশ পায়। প্রকৃতির প্রতিও ভালোবাসা থাকা উচিত, যেখানে গাছপালা, পশুপাখি ও পরিবেশের যত্ন নেওয়া ভালোবাসারই আরেকটি রূপ। বাঙালির সাহিত্য-সংস্কৃতিতে ভালোবাসা গভীরভাবে প্রোথিত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্‌দীন—তাঁদের কবিতা ও গানে ভালোবাসার অনন্য প্রকাশ দেখা যায়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন,

‘ভালোবাসায় জিত আছে, হার নেই,
যত দেবে ততই তুমি পাবে, তার বেশি কিছু নেই।’

এই কথাগুলো প্রমাণ করে ভালোবাসা বিনিময়ের বিষয় নয়, এটি একটি অনুভূতি, যা নিঃস্বার্থভাবে দিলেই সত্যিকার অর্থে পাওয়া যায়।

বসন্তের রঙে রঙিন ভালোবাসার মূহুর্ত

কারো কারো মতে, আমাদের এই বসন্ত উৎসবই পশ্চিমাদের ভালোবাসা দিবস। আজ এত উচ্ছ্বাস-আনন্দ, এত ভালোবাসা থাকার পরও কাল আবার আরেকটি ভালোবাসার দিন কেন- এ প্রশ্নও উঁকি দেয় অনেকের মনে।

তারপরও ভালোবাসা দিবসকে বরণ করার জন্য অনেকে আজ থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছেন। বসন্ত আবাহনে সবাই হলুদ ফুল খুঁজলেও ভালোবাসা দিবসে অনেকেরই পছন্দ লাল টুকটুকে গোলাপ। অনেকেই ধরে নিয়েছেন এই দিনই হচ্ছে ভালোবাসাবাসির উপযুক্ত দিন। তাই বলে যখন ভালোবাসা দিবস ছিল না তখন কি কারও মনে প্রেম আসেনি? নাকি সবাই এ ধরনের একটি দিনের জন্য অপেক্ষা করে ছিল? আসলে এভাবে প্রেম আসেও না, চলেও যায় না।

প্রেম নিয়ে একটি চমৎকার গান রয়েছে-

‘প্রেম একবারই এসেছিল নীরবে-আমারি এ দুয়ারও প্রান্তে’ সে তো হায় মৃদু পায় এসেছিল পারি নি তো জানতে....’

এই গানটি আমাদের অনেকেরই জানা এবং শোনা। গানটি যেসময় লেখা হয়েছিলো তখনকার সময়ে প্রেম যেন একটু নীরবেই আসত। তবে আজকাল প্রেম নীরবে নয় সরবে আসে এবং ক্ষেত্রবিশেষে আবার সরবেই চলে যায়। কারণ সময় বদলেছে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভালোবাসার ধরনও পাল্টেছে। এদিন চারিদিকে তাকালেই শহরের রাস্তায়, পার্কে, কফি শপে, রেস্তোরাঁয় জোড়ায় জোড়ায় তরুণ-তরুণীকে দেখা যায়। কেউ হাসছে, কেউ কাঁদছে, কেউ রাগে ফুঁসছে। কেউবা আবার হাতে হাত রেখে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছে।

‘ফাগুনের আগুন লাগে তোমার হৃদয়ে, বলি হে সখা সেজেছো কেমন নতুনের আগমনে।’ ঋতুরাজ বসন্তে প্রকৃতি কন্যা সাজে নতুন রূপে। গাছে গাছে নতুন পাতার আগমন ঘটে। শিমুল, পলাশ আর কৃষ্ণচূড়ার আবাসে চারিদিক লাল হয়ে যায়। নারীরা বাসন্তি শাড়িতে নিজেকে নতুন রূপে সাজিয়ে তোলে। পুরুষ সাদা পাঞ্জাবি আর শিশুরা রং-বেরঙের পোশাকে সজ্জিত হয়।

বসন্ত ঋতুর সঙ্গে ফাগুনের সঙ্গে একুশে নিবিড়ভাবে জড়ানো। বসন্তের এই মাসটি বাঙালি হৃদয়ে অন্তরঙ্গ আবেগের সুরতরঙ্গ ছড়িয়ে দেয়। জীবনের দুঃখ-বেদনা, যন্ত্রণা এই প্রবল আবেগের কাছে পরাভূত।

শীতের হিমেল হাওয়ার পরশ শেষে আসে বসন্ত। সঙ্গে সঙ্গে বছর ঘুরে আসে ভালোবাসার সংস্পর্শ। ভালোবাসা শুধুই লোক দেখানো নয়, ভালবাসা আত্মার এক নিবিড় সম্পর্ক। ভালোবাসে না এমন লোক খুব কমই আছে পৃথিবীতে। ভালোবাসা মনের সব অন্ধকারকে দূর করে আলোর সন্ধান দেয়।

বাংলার জাগরণ বা ভালোবাসা যেই রঙেই সাজুক বসন্ত জুড়ে থাকবে বাংলার প্রতিটি মানুষের মনে। পোশাকে, সাজে, শুভেচ্ছা বিনিময়ে দিনভর মুখর থাকবে প্রতিটি অফিস, ক্যাম্পাস ও পথ-ঘাট। বসন্তের এই জোয়ার বাংলা একাডেমি আয়োজিত অমর একুশে বই মেলার ময়দানে গিয়ে মিশবে। আর সন্ধ্যা নেমে নতুন সূর্যদয়ে আসবে ভালোবাসা দিবস।

ভালোবাসার জন্য কোনো বিশেষ দিবস লাগে না! তবুও আমরা ভ্যালেন্টাইনের প্রেমকাহিনিকে অবলম্বন করে ভালোবাসার দিনক্ষণ পেতে রেখেছি। ভালোবাসা শুধু প্রেমিক-প্রেমিকার মাঝে সীমাবদ্ধ নয়। এটি জগৎজুড়ে এক মায়ার বন্ধন। বাবা-মা,আত্মীয়-স্বজন সবাই ভালোবাসার অংশ। কেউ ভালোবেসে হাসে, কেউ ভালোবেসে হাসায়। ভালোবাসা দিবসে কেউ ছোটে আপনজনের কাছে, কেউ ছুটে যায় ছিন্নমূল শিশুদের কাছে। কেউ ভালোবাসে, কেউ বাসায়।

ভালোবাসার পবিত্রতা রক্ষা করে পূর্ণ হোক সব আশা। হীনম্মন্যতা দূর করে সত্যিকারের ভালোবাসায় নিমজ্জিত হোক তরুণরা। ভালোবাসায় ভরে উঠুক জীবন।