বিমান বাহিনী প্রধান, প্রতিরক্ষা চুক্তি
এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খানের সাথে পাকিস্তান জেনারেল সৈয়দ আসিম মনির   ছবি: সংগৃহীত

০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ও আন্দোলনের পর, ঢাকা ও ইসলামাবাদের সম্পর্কের দীর্ঘদিনের বরফ গলতে শুরু করেছে। সরাসরি বাণিজ্য ও ফ্লাইট চালুর উদ্যোগের পর এবার পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তির গুঞ্জনও শোনা যাচ্ছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসলামাবাদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে ‘বাস্তববাদী’ পদক্ষেপ নিলেও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ মাথায় রেখে অত্যন্ত সতর্ক ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।

পাকিস্তানের সঙ্গে একটি সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে আলোচনা এবং দুই দেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ার পথে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পা ফেলছে বাংলাদেশ। শুক্রবার প্রতিরক্ষা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা এই মত প্রকাশ করেছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে কয়েক দশকের তিক্ততা কাটিয়ে ঢাকা ও ইসলামাবাদের সম্পর্ক ক্রমশ উষ্ণ হচ্ছে।

প্রতিরক্ষা চুক্তির আলোচনা জেএফ-১৭ বিমান :
গত সপ্তাহে বাংলাদেশের বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খানের রাওয়ালপিন্ডি সফরের পর পাকিস্তানের কাছ থেকে ‘জেএফ-১৭ থান্ডার’ যুদ্ধবিমান কেনার সম্ভাব্য আলোচনার বিষয়টি সামনে আসে। সফরে তিনি পাকিস্তানের বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল জহির আহমেদ বাবর সিধু এবং দেশটির সেনাপ্রধান জেনারেল সৈয়দ আসিম মনিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

তবে বাংলাদেশের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে, বিমান বাহিনীর জন্য যুদ্ধবিমান সংগ্রহের বিষয়টি এখনো “একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে” এবং “মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার” অধীনে রয়েছে।

আইএসপিআর-এর পরিচালক লে. কর্নেল সামি উদ দৌলা চৌধুরী আরব নিউজকে বলেন, “মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে কোন দেশের প্রস্তাব আমাদের জন্য উপযুক্ত। বিমান বাহিনী প্রধানের পাকিস্তান সফর এই প্রক্রিয়ারই একটি অংশ। এর আগে তিনি চীন ও ইতালিও সফর করেছেন। বিভিন্ন দেশের সঙ্গেই আলোচনা চলছে। এখনো চূড়ান্ত কিছু ঠিক হয়নি,“ তিনি যোগ করেন।

কূটনৈতিক সম্পর্ক ভারসাম্য :
দুই দেশের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের এই বৈঠকের পাশাপাশি, ১৯৭১ সালের যুদ্ধের পর এই প্রথম সরাসরি বাণিজ্য পুনরায় চালু হয়েছে এবং এক দশকেরও বেশি সময় পর চলতি মাসের শেষে ঢাকা-করাচি সরাসরি ফ্লাইট চালুর কথা রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন বলেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে “এক ধরনের বাস্তববাদিতা” দেখাচ্ছে।

আরব নিউজের রবাতে আরও জানানো হয়, “পাকিস্তানের আগ্রহের তুলনায় বাংলাদেশ খুব সতর্কভাবে এগোচ্ছে। বাংলাদেশ একটি ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল বজায় রাখার চেষ্টা করছে। বর্তমান সরকার স্পষ্ট করেছে যে, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশ কোনো নির্দিষ্ট শিবিরের দিকে ঝুঁকছে। বরং বাংলাদেশ সকল পরাশক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন, ঢাকার জন্য সহযোগিতা হিসেবে বাণিজ্য ও অর্থনীতিই স্বাভাবিকভাবে বেশি প্রাধান্য পাবে। সামরিক সহযোগিতা কত দূর এগোবে, তা বুঝতে আরও সময়ের প্রয়োজন।

ভূ-রাজনীতি ভারতের প্রসঙ্গ :
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক এবং বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ইশফাক এলাহি চৌধুরী বলেন, গত দুই দশকে নতুন যুদ্ধবিমান সংগ্রহ না করায় বাংলাদেশের “উন্নত যুদ্ধবিমানের অত্যন্ত প্রয়োজন”।

তিনি বলেন, “আমাদের কিছু চীনা এফ-৭ যুদ্ধবিমান ছিল, কিন্তু চীন এখন সেগুলো আর উৎপাদন করে না। এক্ষেত্রে পাকিস্তান আমাদের যুদ্ধবিমানের উৎস হতে পারে, কিন্তু এর সঙ্গে ভূ-রাজনীতি জড়িত।” বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের চিরশত্রুতার প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্ত স্পর্শকাতর হতে পারে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।

উল্লেখ্য, চীন ও পাকিস্তানের যৌথভাবে তৈরি জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান গত মে মাসে পাকিস্তান ও ভারতের আকাশযুদ্ধের সময় আন্তর্জাতিক মহলের নজর কাড়ে। ওই সংঘাতে পাকিস্তান ভারতের একাধিক যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি করেছিল, যা পরে ভারত স্বীকার করে নেয়।

ইশফাক এলাহি চৌধুরী সতর্ক করে বলেন, “পাকিস্তানের সঙ্গে বন্ধুত্ব ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বের বিনিময়ে হওয়া উচিত নয়। পাকিস্তানের সঙ্গে এই সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা চুক্তির ক্ষেত্রে আমাদের অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে, যাতে এটি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয়।”

সূত্র : আরব নিউজ

আরটিএনএন/এআই