গত মাসে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে (WEF) যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা এবং ধনকুবের রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী জ্যারেড কুশনার ‘নতুন গাজা’ নিয়ে তার স্বপ্নের কথা তুলে ধরেন। তার কল্পনায় ছিল চকচকে আকাশচুম্বী অট্টালিকা, সমুদ্রতীরবর্তী পর্যটন কেন্দ্র এবং একটি লজিস্টিক্যাল করিডর—যা নিরস্ত্রীকৃত গাজাকে বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত করবে।
কিন্তু সেখান থেকে ৩,০০০ কিলোমিটার (১,৮৬৪ মাইল) দূরে গাজা উপত্যকার চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। বোমাবিধ্বস্ত ধুসর সেই জনপদে একটি ইটও গাঁথা হয়নি। ফিলিস্তিনি এই ভূখণ্ডের বর্তমান বাস্তবতা নতুন কোনো ভবন দিয়ে মাপা হচ্ছে না, বরং মাপা হচ্ছে ধ্বংসস্তূপের ওজনে—যা প্রায় ৬ কোটি ১০ লাখ টন। অক্টোবরে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে একটি ভঙ্গুর ‘যুদ্ধবিরতি’ হওয়ার পর ইসরায়েলি বিমান হামলা হয়তো কমেছে, কিন্তু হত্যাকাণ্ড থামেনি। এটি একটি নতুন ও নীরব যুদ্ধের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এদিকে, গাজার পুনর্গঠনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণ সামগ্রী, যেমন সিমেন্ট ও ইস্পাতের রড প্রবেশের কোনো নিশ্চয়তা নেই। ইসরায়েল এগুলো আটকে রেখেছে। জাতিসংঘের তথ্যমতে, ইসরায়েলের দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলা গণহত্যামূলক যুদ্ধে গাজার ৯২ শতাংশ ধ্বংস হয়ে গেছে এবং এর পুনর্গঠনে আনুমানিক ৭,০০০ কোটি (৭০ বিলিয়ন) ডলার প্রয়োজন হবে।
তবে বিশ্লেষক ও নগর পরিকল্পনাবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, গাজার এই পুনর্গঠনের নকশা ফিলিস্তিনিদের জীবন পুনরুদ্ধারের জন্য করা হচ্ছে না, বরং তাদের জীবনকে ‘রি-ইঞ্জিনিয়ারিং’ বা নতুন করে সাজানোর জন্য করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে বাসস্থানের মতো মৌলিক মানবাধিকারকে রাজনৈতিক চাঁদাবাজি এবং জনসংখ্যাগত কাঠামো পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ইসরায়েলি বিষয়ক গবেষক ইহাব জাবারিন আল জাজিরাকে বলেন, “পুনর্গঠন যুদ্ধের ‘পরবর্তী দিন’ নয়; বরং এটি আমলাতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক উপায়ে যুদ্ধেরই ধারাবাহিকতা।”
‘সিমেন্টের কল’ বা সরবরাহের নিয়ন্ত্রণ
জাবারিন যুক্তি দেখান যে, ইসরায়েলি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের কাছে পুনর্গঠন হলো চূড়ান্ত দর কষাকষির হাতিয়ার। এর মাধ্যমে ইসরায়েল সরাসরি সামরিক দখলের কৌশল থেকে সরে এসে ‘সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সার্বভৌমত্ব’ (sovereignty by flow) প্রতিষ্ঠার দিকে এগোচ্ছে।
তিনি বলেন, “যার হাতে গাজার অক্সিজেন—অর্থাৎ সিমেন্টের কল—থাকবে, গাজার রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামো তার হাতেই থাকবে।” তিনি আরও যোগ করেন, ইসরায়েল ‘দায়িত্বহীন নিয়ন্ত্রণ’-এর এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করতে চাইছে, যেখানে দখলদার হিসেবে কোনো আইনি দায়বদ্ধতা ছাড়াই তারা গাজার দৈনন্দিন জীবনের ওপর ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে।
জাবারিনের মতে, এই ব্যবস্থায় নির্মাণ সামগ্রী ও ত্রাণ প্রবেশের বিষয়টি তিনটি স্তরের চাঁদাবাজির (extortion) মাধ্যমে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে পরিণত করা হচ্ছে:
১. নিরাপত্তা চাঁদাবাজি: নির্মাণ সামগ্রীর সরবরাহকে ‘দীর্ঘমেয়াদী নজরদারি’র সঙ্গে যুক্ত করা। এর ফলে এমন এক গাজা তৈরি হবে যা সবসময় ইসরায়েলের ওপর নির্ভরশীল থাকবে এবং চাইলেই যেকোনো মুহূর্তে সব বন্ধ করে দেওয়া যাবে।
২. রাজনৈতিক চাঁদাবাজি: পুনর্গঠনকে ব্যবহার করে শাসক নির্ধারণ করা। জাবারিন বলেন, “যে সিমেন্ট বিতরণ করবে, সেই বৈধতা বিতরণ করবে।” অর্থাৎ, ইসরায়েল কেবল এমন একটি ‘টেকনোক্র্যাটিক’ বা পুতুল প্রশাসনকে পুনর্গঠনের অনুমতি দেবে যারা তাদের নিরাপত্তার স্বার্থ রক্ষা করবে।
৩. শান্তকরণের (Pacification) চাঁদাবাজি: মাথার ওপর ছাদ বা মৌলিকভাবে বেঁচে থাকাকে অধিকার হিসেবে নয়, বরং নীরব থাকার ‘পুরস্কার’ হিসেবে উপস্থাপন করা।
‘ফিনিক্স প্ল্যান’
এই রাজনৈতিক লড়াই শুরু হওয়ার আগেই গাজা আক্ষরিক অর্থেই দুই বছরের ইসরায়েলি বোমাবর্ষণের ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে। নভেম্বরে প্রকাশিত জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (UNDP) একটি প্রতিবেদনে ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে: যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট ধ্বংসাবশেষ পরিষ্কার করাই একটি ‘নজিরবিহীন বাধা’। ‘আদর্শ পরিস্থিতিতেও’ এই আবর্জনা সরাতে সাত বছর সময় লাগতে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “গাজা পৃথিবীর অন্যতম ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থানে পরিণত হয়েছে।”
এই বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে ফিলিস্তিনি বিশেষজ্ঞরা দাভোসে প্রস্তাবিত উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া (top-down) পুনর্গঠন মডেল প্রত্যাখ্যান করেছেন। অধিকৃত পশ্চিম তীরের বিরজেইত বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের অধ্যাপক আবদেল রহমান কিতানা গাজা উপত্যকার পৌরসভাগুলোর ইউনিয়ন কর্তৃক তৈরি ‘ফিনিক্স প্ল্যান’-এর কথা উল্লেখ করেন, যা একটি কার্যকর স্থানীয় বিকল্প হতে পারে।
আল জাজিরা অ্যারাবিককে কিতানা বলেন, “পুনর্গঠন মানে শুধু যা ধ্বংস হয়েছে তা ফিরিয়ে আনা নয়। এটি জীবনকে নতুন রূপ দেওয়া।” তিনি গাজার জন্য বিচ্ছিন্ন কোনো সমাধানের বিরুদ্ধে সতর্ক করে ‘সমন্বিত পদ্ধতির’ পক্ষে কথা বলেন। ফিনিক্স প্ল্যান অনুযায়ী, ধ্বংসস্তূপকে বর্জ্য হিসেবে না দেখে সম্পদ হিসেবে দেখা হবে, যা ভূমি পুনরুদ্ধারে পুনর্ব্যবহারযোগ্য হতে পারে।
কিতানা জোর দিয়ে বলেন, গাজার পুনর্গঠনের যেকোনো পরিকল্পনা সফল হতে হলে তা অবশ্যই নিচ থেকে ওপরের দিকে (bottom-up) হতে হবে। তিনি বলেন, “জনগণকে ছাড়া আমরা সফল হতে পারব না... তারা তাদের প্রয়োজন ও স্বপ্ন সম্পর্কে ভালো জানে।” স্থানীয় সংস্থাকে উপেক্ষা করলে তা একটি ‘ভঙ্গুর ও বিচ্ছিন্ন পরিবেশ’ তৈরি করবে বলে তিনি সতর্ক করেন।
ইসরায়েলের ‘দ্বৈত ব্যবহার’ (Dual Use) নীতি
তবে জাতিসংঘের সাত বছরের সময়সীমা এবং ‘ফিনিক্স প্ল্যান’—উভয়ই একটি বড় বাধার সম্মুখীন: ইসরায়েলের ‘দ্বৈত ব্যবহার’ তালিকা। ঐতিহাসিকভাবে, ইসরায়েল সার ও স্টিলের পাইপের মতো পণ্য নিষিদ্ধ করে এসেছে এই অজুহাতে যে, এগুলো সামরিক কাজে ব্যবহার হতে পারে। বর্তমানে এই তালিকায় অক্সিজেন সিলিন্ডার, ক্যানসারের ওষুধ এবং ওয়াটার ফিল্টারের মতো অত্যন্ত প্রয়োজনীয় সামগ্রীও যুক্ত হয়েছে।
জাবারিন বলেন, এই অবরোধ এখন আর নিরাপত্তার অজুহাত নয়, বরং এটি একটি ‘শাসন দর্শন’। তিনি বলেন, “ইসরায়েল ‘দ্বৈত ব্যবহার’-এর অজুহাতকে অনির্দিষ্টকালের বিলম্বের হাতিয়ারে পরিণত করেছে।” প্রতিটি সিমেন্টের বস্তার জন্য আলাদা প্রকল্পের অনুমোদনের শর্ত দিয়ে ইসরায়েল নিশ্চিত করে যে, পুনর্গঠন যেন একটি অনন্তকালের ‘প্রকল্প’ হয়ে থাকে। জাবারিনের মতে, এর ফলে দাতা দেশ ও সংস্থাগুলো ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং ফিলিস্তিনি প্রশাসন সবসময় ‘ভিক্ষুকের অবস্থায়’ থাকে।
‘নীরব জনমিতিক প্রকৌশল’ (Silent Demographic Engineering)
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইসরায়েল যখন স্থলপথে জরুরি পণ্য আটকে রাখছে, তখন ট্রাম্প প্রশাসন বিদেশে একটি ‘রাজনৈতিক ফ্যান্টাসি’ বা অলীক কল্পনা তৈরি করছে। ট্রাম্পের প্ররোচনায় গাজার ‘বোর্ড অফ পিস’ ১০ বিলিয়ন ডলার জিডিপি বৃদ্ধি এবং ১ লাখ আবাসন ইউনিটসহ একটি ‘নতুন রাফাহ’ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে।
জাবারিন এই পরিকল্পনাগুলোকে—যার মধ্যে ‘সমুদ্রতীরবর্তী সম্পত্তি’ এবং ‘শিল্পাঞ্চল’ রয়েছে—এক ধরণের ‘নীরব জনমিতিক প্রকৌশল’ হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, “তারা ফিলিস্তিনি ইস্যুকে জাতীয় অধিকারের সমস্যা থেকে সরিয়ে একটি রিয়েল এস্টেট বা আবাসন সমস্যায় রূপান্তর করতে চাইছে।” তার মতে, এর লক্ষ্য হলো এমন একটি গাজা তৈরি করা যা অর্থনৈতিকভাবে এই অঞ্চলের জন্য লাভজনক, কিন্তু জাতীয়তাবোধের দিক থেকে শূন্য।
ধ্বংসস্তূপ ও গণকবর উপেক্ষা করে ‘বিনিয়োগ’ ও ‘পর্যটন’-এর ওপর আলোকপাত করার মাধ্যমে এই পরিকল্পনা একটি ‘রাজনৈতিক অলীক কল্পনাকে বৈধতা’ দিতে চায়। জাবারিন বলেন, “যদি আপনি শক্তি প্রয়োগ করে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করতে না পারেন, তবে তাদের জায়গাকে নতুন করে সাজিয়ে তাদের ‘বাড়ির ধারণা’টাকেই মুছে ফেলুন।”
তাহলে শেষ পর্যন্ত এই ‘নতুন গাজা’ কে গড়বে? জাবারিন সতর্ক করে বলেন, ইসরায়েলি কোম্পানিগুলো সরাসরি গাজায় প্রবেশ না করলেও এটি ‘দখলদারিত্বের বেসরকারিকরণ’ (privatisation of occupation) হতে পারে। তিনি উল্লেখ করেন, “পুনর্গঠন হলো পরোক্ষ লাভের একটি শৃঙ্খল।” পরিদর্শন লজিস্টিকস, ক্রসিং পরিচালনাকারী নিরাপত্তা সংস্থা এবং ঝুঁকির বিমা করা কোম্পানিগুলো—সবাই ইসরায়েলি বা তাদের মিত্র প্রতিষ্ঠানের জন্য রাজস্ব তৈরি করবে।
পুনর্গঠনের চুক্তিগুলোও একটি রাজনৈতিক ছাঁকনি হয়ে দাঁড়াবে। জাবারিন বলেন, “এটি একটি আন্তর্জাতিক ‘আনুগত্যের বাজার’ তৈরি করবে। যে দাতা আপত্তি করবে তাকে বাদ দেওয়া হবে, আর যে ঠিকাদার সার্বভৌমত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলবে তাকে প্রতিস্থাপন করা হবে।”
‘নীরব স্থানান্তর বা উচ্ছেদ’ (Silent Transfer)
জাবারিন বলেন, এই নীতির সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো ‘সময়কে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা’।জাতিসংঘের মূল্যায়ন অনুযায়ী, শুধু ধ্বংসস্তূপ সরাতে ২০৩২ সাল এবং গাজার পূর্ণ পুনর্গঠন ২০৪০ সাল পর্যন্ত গড়াতে পারে। এই দীর্ঘ ‘অপেক্ষা’ তখন উচ্ছেদ নীতিতে পরিণত হয়। জাবারিন বলেন, “সময় সমাজকে পচিয়ে ফেলে বা ভেঙে দেয়।” তার মতে, ইসরায়েল ‘যৌক্তিক অভিবাসন’-এর (rational emigration) ওপর বাজি ধরছে। বছরের পর বছর তাঁবুতে বাস করার পর, ফিলিস্তিনিরা ট্যাংকের ভয়ে নয়, বরং ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কায় ক্লান্ত হয়ে গাজা ছেড়ে চলে যাবে।
জাবারিন বলেন, “আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই দীর্ঘ অপেক্ষার নিন্দা করে না। ইসরায়েল বুঝতে পেরেছে যে বোমা মারলে নিন্দা হয়, কিন্তু আমলাতান্ত্রিক বিলম্ব কেবল নীরবতা বয়ে আনে। যদি যুদ্ধবিমান তাদের উচ্ছেদ করতে ব্যর্থ হয়, তবে এই দীর্ঘ অপেক্ষা হয়তো সফল হবে।”
সূত্র : আল জাজিরা
আরটিএনএন/এআই
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!