ইরান, ট্রাম্প, খোমেনি, মাসুদ পেজেশকিয়ান
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান   ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে সীমিত হামলার কথা বিবেচনা করছেন বলে জানানোর পর, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান প্রতিজ্ঞা করেছেন যে তারা যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে ভেঙে পড়বেন না। শনিবার উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা বৃদ্ধির মধ্যেই পেজেশকিয়ানের এই মন্তব্য এল। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র দুটি বিমানবাহী রণতরী এবং ডজনখানেক যুদ্ধবিমান মোতায়েনের মাধ্যমে তাদের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো অব্যাহত রেখেছে।

ইরানি প্যারালিম্পিক দলের সদস্যদের সম্মাননা অনুষ্ঠানে পেজেশকিয়ান বলেন, "আমরা কোনো কঠিন পরিস্থিতির মুখেই নতি স্বীকার করব না।" তিনি বলেন, "বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলো কাপুরুষতার সঙ্গে আমাদের মাথা নত করতে বাধ্য করার চেষ্টা করছে। আপনারা যেমন প্রতিকূলতার মুখে মাথা নত করেননি, তেমনি আমরাও এসব সমস্যার মুখে মাথা নত করব না।"

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র চলতি মাসের শুরুতে ওমানে পরোক্ষভাবে তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শুরু করে এবং গত সপ্তাহে সুইজারল্যান্ডে দ্বিতীয় দফায় বৈঠকে বসে। যদিও ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয় পক্ষই আলোচনাকে সামগ্রিকভাবে ইতিবাচক বলেছে, তবে কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি শুক্রবার বলেছিলেন যে একটি কূটনৈতিক সমাধান "আমাদের হাতের নাগালে" রয়েছে এবং তার দেশ ওয়াশিংটনে পাঠানোর জন্য "আগামী দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে" একটি চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত করার পরিকল্পনা করছে।

তেহরান থেকে আল জাজিরার সাংবাদিক তৌহিদ আসাদি জানান, দুই দেশ আবারও "সন্ধিক্ষণে" দাঁড়িয়ে আছে এবং ইরানের রাজধানীর বাসিন্দারা কূটনৈতিক অগ্রগতির দিকে নিবিড় নজর রাখছেন। এক নারী আল জাজিরাকে বলেন, "যুদ্ধ নিয়ে কে চিন্তা করবে না? নিজেদের কথা না ভাবলেও আমরা আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত।"

একজন ব্যবসায়ী বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন সামরিক সংঘাত শেষ পর্যন্ত অনিবার্য। "কারণ আমেরিকানরা চায় আমরা আত্মসমর্পণ করি, আর ইরানি রাষ্ট্র তা মেনে নেবে না।" তিনি যোগ করেন, "যদি তা হয়, তবে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠবে—ব্যবসা-বাণিজ্য এখনই মন্দা যাচ্ছে।"

তবে আরেক ব্যক্তি বেশ আশাবাদী ছিলেন। তিনি বলেন, "যুক্তরাষ্ট্র জানে তারা ইরানকে পরাস্ত করতে পারবে না। যুক্তরাষ্ট্র আসলে কোনো দেশেই—হোক আফগানিস্তান, ইরাক বা ভিয়েতনাম—সত্যিকার অর্থে যুদ্ধ জিততে পারেনি। শেষ পর্যন্ত তাদের ইরানের কাছে নতি স্বীকার করতে হবে। মানুষের চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই।"

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র গত বছরও পরমাণু আলোচনায় বসেছিল, কিন্তু ইসরায়েলের হামলার পর সেই প্রচেষ্টা ভেস্তে যায় এবং ১২ দিনের যুদ্ধের সূত্রপাত হয়। সেই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যোগ দিয়ে ফোরদো, নাতাঞ্জ এবং ইসফাহানে ইরানের তিনটি পারমাণবিক কেন্দ্রে বোমা হামলা চালায়।

জানুয়ারিতে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের ওপর প্রাণঘাতী দমন-পীড়নের পর ট্রাম্প নতুন করে সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দেন। জবাবে তেহরান ওই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলার হুমকি দেয় এবং উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর তেল রপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেয়।

২০০৩ সালের পর সর্বোচ্চ বিমান শক্তি

মার্কিন গণমাধ্যমের মতে, ২০০৩ সালে ইরাক আগ্রাসনের পর এই প্রথম ওয়াশিংটন ওই অঞ্চলে এত বিপুল বিমান শক্তি জড়ো করছে। গত কয়েক দিনে মধ্যপ্রাচ্যে ১২০টিরও বেশি বিমান মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এছাড়া বিশ্বের বৃহত্তম বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড’ আরব সাগরে অবস্থানরত ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপের সঙ্গে যোগ দিতে রওনা হয়েছে।

শুক্রবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে পাঠানো এক চিঠিতে ইরান জোর দিয়ে বলেছে, এই সামরিক সমাবেশকে "কেবল কথার কথা হিসেবে নেওয়া উচিত হবে না।"

চিঠিতে বলা হয়েছে, যদিও ইরান "উত্তেজনা বা যুদ্ধ চায় না এবং কোনো যুদ্ধ শুরু করবে না", তবে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো আগ্রাসনের "চূড়ান্ত এবং আনুপাতিক" জবাব দেওয়া হবে।

বৃহস্পতিবার ট্রাম্প তার 'বোর্ড অফ পিস'-এর উদ্বোধনী বৈঠকে বলেছিলেন, "অর্থবহ চুক্তি" না হলে "খারাপ কিছু ঘটবে"। সেই মন্তব্যের পরই ইরানের এই চিঠি এল।

সেদিন পরে এয়ার ফোর্স ওয়ানে নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়ে ট্রাম্প বলেন, ইরানের হাতে "বড়জোর ১০ বা ১৫ দিন সময় আছে।"

শুক্রবার আলোচনার সময় যুক্তরাষ্ট্র সীমিত সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে কি না—সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, "আমার মনে হয় আমি বলতে পারি যে আমি সেটা বিবেচনা করছি।" কয়েক ঘণ্টা পর তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ইরানের উচিত "একটি ন্যায্য চুক্তিতে আসা।" আঞ্চলিক সংঘাতের আশঙ্কায় সুইডেন, সার্বিয়া, পোল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলো ইরানে থাকা তাদের নাগরিকদের অবিলম্বে দেশ ত্যাগের পরামর্শ দিয়েছে।

সূত্র : আল জাজিরা

আরটিএনএন/এআই