প্রাণঘাতী দেশব্যাপী বিক্ষোভের এক মাস পর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খোলার দ্বিতীয় দিনেও তেহরানসহ সারা দেশে হাজার হাজার শিক্ষার্থী বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে। জানুয়ারির ৮ ও ৯ তারিখের রাতে রাষ্ট্র-আরোপিত যোগাযোগ ব্যবস্থা বা ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের সময় বিক্ষোভে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়। একই সঙ্গে দেশটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে আরেকটি যুদ্ধের হুমকির মুখে রয়েছে। রাজধানীর শীর্ষস্থানীয় উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান—যার মধ্যে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়, শরিফ ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজি, আমিরকবির বিশ্ববিদ্যালয় এবং শহীদ বেহেশতি বিশ্ববিদ্যালয় অন্যতম—সেখানে রবিবারের বিক্ষোভে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে।
সরকারবিরোধী শিক্ষার্থী এবং ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সমর্থক শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সমর্থকদের অনেকেই ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর আধাসামরিক শাখা বাসিজ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বাইরের রাস্তায় ভারী অস্ত্রে সজ্জিত নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে শিক্ষার্থীদের ওপর সহিংসভাবে চড়াও হওয়ার পর নিরাপত্তা বাহিনীকে "অসম্মানজনক" বলে ডাকার ভিডিও ফুটেজও দেখা গেছে।
উত্তর-পূর্ব ইরানের পবিত্র শিয়া শহর মাশহাদের ফেরদৌসি বিশ্ববিদ্যালয়েও শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেছে। শহরটি জানুয়ারিতে বিক্ষোভের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ছিল। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ফুটেজে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে নিরাপত্তা বাহিনী শিক্ষার্থীদের দিকে তেড়ে যাচ্ছে।
গত সপ্তাহে পশ্চিমাঞ্চলীয় ইলাম প্রদেশের আবদানান গ্রামে বিক্ষোভ হয়েছিল। সেখানে রবিবার বিপুল জনতা জড়ো হয়ে এক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষককে স্বাগত জানায়, যাকে একদিন আগে তার বাড়ি থেকে নিরাপত্তা বাহিনী সহিংসভাবে গ্রেপ্তার করেছিল।দেশব্যাপী বিক্ষোভ চলাকালে এবং এর পরবর্তীতে স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ হাজার হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ইরানি কর্তৃপক্ষ গ্রেপ্তারের বিস্তারিত পরিসংখ্যান দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
রবিবার তেহরানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আবারও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত ঘটনার বিবরণ এবং অনলাইনে শিক্ষার্থী ও তৃণমূল সংগঠনগুলোর প্রকাশ করা ভিডিও ফুটেজের মধ্যে বিশাল পার্থক্য দেখা গেছে। রাষ্ট্রীয় এবং আইআরজিসি-সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমে দেখা গেছে, বাসিজ শিক্ষার্থীরা রাষ্ট্রীয় অনুমতি নিয়ে এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সহায়তায় ক্যাম্পাসের প্রধান ফটক বা গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সমাবেশ করছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পতাকা পোড়াচ্ছে। তারা ৮৬ বছর বয়সী সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির সমর্থনে স্লোগান দেয়: "আমেরিকার মৃত্যু হোক", "শাহর মৃত্যু হোক", "আল্লাহু আকবার" এবং "হয় মৃত্যু, নয় খামেনি"।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম দাবি করে, সরকারপন্থী শিক্ষার্থীরা "সাম্প্রতিক বিদেশি মদদপুষ্ট দাঙ্গার শিকারদের সম্মান জানিয়েছে" এবং বাসিজ সদস্যরা "নকল শিক্ষার্থীদের" হামলার শিকার হয়েছে যারা "নিয়ম ভঙ্গকারী" স্লোগান দিচ্ছিল। সরকারবিরোধীদের দেওয়া স্লোগানগুলোর মধ্যে ছিল—"স্বৈরাচারের মৃত্যু হোক", "নারী, জীবন, স্বাধীনতা" এবং "যে রক্ত ঝরেছে তা ধুয়ে ফেলা যাবে না"। অনলাইনে প্রকাশিত অনেক ভিডিওতে শিক্ষার্থীদের বলতে শোনা যায় যে তারা বাসিজ সদস্যদের হামলার শিকার হয়েছে।
অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া কিছু ফুটেজে দেখা যায়, কয়েকজন শিক্ষার্থী ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের আগের ইরানের পতাকা (যাতে সিংহ ও সূর্যের প্রতীক রয়েছে) উড়াচ্ছে। এর মাধ্যমে তারা ইরানের ক্ষমতাচ্যুত ও মার্কিন সমর্থিত শাহর ছেলে রেজা পাহলভির প্রতি সমর্থন প্রকাশ করছে। আইআরজিসি-সংশ্লিষ্ট ফার্স নিউজ এজেন্সি বিষয়টি নিশ্চিত করে দাবি করেছে, দেশের বাইরে "ইরানবিরোধী গণমাধ্যমে ফুটেজ পাঠানোর" উদ্দেশ্যেই এটি করা হয়েছে।
শনিবার ও রবিবার বিক্ষোভকারী সরকারপন্থী শিক্ষার্থীরাও অভিযোগ করে যে, জানুয়ারির অস্থিরতার জন্য সরকারবিরোধী আন্দোলনকারীরাই দায়ী এবং তারা হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুতে উল্লাস করছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে বাসিজ শিক্ষার্থীদের স্লোগান দিতে দেখা যায়: "তারা জানুয়ারিকে রক্তাক্ত করেছে এবং এখন তা নিয়ে নাচছে।"
এই মন্তব্যটি মূলত সেই অসংখ্য ইরানি পরিবার এবং তাদের সমর্থকদের উদ্দেশ করে করা হয়েছে, যারা সাম্প্রতিক দিনগুলোতে প্রিয়জন হারানোর ৪০ দিন পূর্তি বা 'চল্লিশা' পালন করছে। শোকের এই অনুষ্ঠানে তারা হাততালি দিয়েছে, মসজিদের সামনে গান বাজিয়েছে এবং "বিজয়" চিহ্ন দেখিয়েছে, যা রাষ্ট্র-আরোপিত শোকের রীতিনীতির পরিপন্থী।
সারা দেশের বিভিন্ন জাতিগত পটভূমির ইরানিরা বলছেন, তারা আনন্দের জন্য নয়, বরং শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে নিহত পরিবারের সদস্য ও দেশপ্রেমিকদের প্রতি গর্ব প্রকাশের জন্য এই নজিরবিহীন প্রথা বেছে নিয়েছেন। ইরান সরকার দাবি করছে, বিক্ষোভে ৩,১১৭ জন নিহত হয়েছেন এবং তাদের সবাইকে হত্যা করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অস্ত্রসজ্জিত, প্রশিক্ষিত ও অর্থায়নপুষ্ট "সন্ত্রাসী" এবং "দাঙ্গাবাজরা"। জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অভিযোগ—যেখানে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীকে হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী করা হয়েছে—তা ইরান প্রত্যাখ্যান করেছে।
ইরানি কর্তৃপক্ষ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে "প্রমাণ" দাবি অব্যাহত রেখেছে, কিন্তু স্বাধীন জাতিসংঘের তথ্যানুসন্ধান মিশনকে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং টানা সপ্তম সপ্তাহের মতো কঠোর ইন্টারনেট বিধিনিষেধ বজায় রেখেছে। সরকার বলছে তারা একটি স্থানীয় তথ্যানুসন্ধান মিশন গঠন করেছে, কিন্তু কবে নাগাদ ফলাফল পাওয়া যেতে পারে সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ধারণা দেয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) জানিয়েছে, তারা দেশব্যাপী বিক্ষোভে ৭,০০০-এর বেশি মৃত্যুর ঘটনা যাচাই করেছে—যা সরকারি সংখ্যার দ্বিগুণেরও বেশি—এবং আরও প্রায় ১২,০০০ ঘটনা তদন্ত করছে। ইরানে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক বিশেষ র্যাপোর্টিয়ার মাই এসাতো বলেছেন, ২০,০০০-এর বেশি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়ে থাকতে পারেন। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শনিবার নিহতের সংখ্যা ৩২,০০০ বলে উল্লেখ করেছেন।
সূত্র : আল জাজিরা
আরটিএনএন/এআই
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!