যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তার হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ হিসেবে ইরান পাল্টা হামলা চালাচ্ছে। এর জেরে উপসাগরীয় দেশগুলোতে আরও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। রোববার সকালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই, বাহরাইনের রাজধানী মানামা এবং কাতারের রাজধানী দোহায় টানা দ্বিতীয় দিনের মতো বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। অশান্ত মধ্যপ্রাচ্যের বুকে এই অঞ্চলটিকে দীর্ঘদিন ধরে শান্তি ও নিরাপত্তার স্বর্গ হিসেবে দেখা হতো, কিন্তু এখন সেখানেও বড় ধরনের সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দোহার দক্ষিণ অংশে পরিষ্কার সকালের আকাশে বেশ কয়েকটি বিকট শব্দ শোনা যায় এবং ঘন কালো ধোঁয়া উড়তে দেখা যায়। এর কিছুক্ষণ পরেই মধ্যপ্রাচ্যের বাণিজ্যিক কেন্দ্র দুবাইয়ে আবারও একদফা বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। শহরের আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার ফলে সৃষ্ট সাদা ধোঁয়ার কুণ্ডলী এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম ব্যস্ত বন্দর জেবেল আলীর ওপর কালো ধোঁয়া উড়তে দেখা গেছে।
মানামাতেও বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে, যেখানে প্রত্যক্ষদর্শীরা অন্তত চারটি বিকট শব্দের কথা জানিয়েছেন। রবিবারের এসব বিস্ফোরণে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। ওমান ছাড়া উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্য দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং অন্যান্য স্থাপনায় ইরানের হামলার পরদিন এই বিস্ফোরণগুলো ঘটল। উল্লেখ্য, ওমান যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার পরমাণু আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে।
ইরানের ঠিক ওপারেই উপসাগরীয় তেল ও গ্যাসসমৃদ্ধ আরব দেশগুলো সম্মিলিতভাবে হাজার হাজার মার্কিন সেনাকে জায়গা দিয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শনিবার ইরান দেশটির ওপর ১৩৭টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ২০৯টি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। এতে দুবাইয়ের বিখ্যাত পাম জুমেইরাহ এবং বুর্জ আল-আরবের কাছে আগুন ও ধোঁয়া দেখা গেছে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আবুধাবি বিমানবন্দরে একটি ‘ঘটনায়’ অন্তত একজন নিহত এবং সাতজন আহত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক চলাচলের জন্য বিশ্বের ব্যস্ততম দুবাই বিমানবন্দর এবং কুয়েত বিমানবন্দরেও হামলা চালানো হয়েছে। এদিকে, কাতারের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শনিবার ইরান তাদের দিকে ৬৫টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ১২টি ড্রোন ছুড়েছিল। এর বেশিরভাগই প্রতিহত করা হয়েছে, তবে হামলায় ১৬ জন আহত হয়েছেন।
আল জাজিরা আরবি বিভাগের তথ্যমতে, জর্ডানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রাজধানী আম্মান এবং উত্তরাঞ্চলীয় আকাশসীমায় প্রবেশ করা বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করেছে। কুয়েতেও সাইরেন বা সতর্ক সংকেত শোনা গেছে বলে জানা গেছে। ইরাকের উত্তরাঞ্চলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ইরবিল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে একটি ড্রোন বিধ্বস্ত হয়েছে এবং সেখান থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী উড়তে দেখা গেছে। আইএসআইএল (আইএসআইএস)-এর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক জোটের অংশ হিসেবে ইরাকের স্বায়ত্তশাসিত কুর্দি অঞ্চলে এখনো মার্কিন সেনা অবস্থান করছে।
‘একটি বিশাল অপরাধ’
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান খামেনির হত্যাকাণ্ডকে ‘একটি বিশাল অপরাধ’ হিসেবে নিন্দা করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অফ স্টাফ আব্দুল রহিম মুসাভিও নিহত হয়েছেন। রবিবার টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে ইরানের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ বলেছেন, “আপনারা (যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল) আমাদের ‘রেড লাইন’ অতিক্রম করেছেন এবং এর মূল্য আপনাদের দিতেই হবে। আমরা এমন ধ্বংসাত্মক পাল্টা আঘাত হানব যে, আপনারা নিজেরাই প্রাণভিক্ষা চাইতে বাধ্য হবেন।”
অন্যদিকে ট্রাম্প হুমকি দিয়ে বলেছেন, খামেনি হত্যার জবাবে ইরান যদি পাল্টা আঘাত করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র এমন শক্তি প্রয়োগ করবে ‘যা আগে কখনো দেখা যায়নি’। ট্রাম্প ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ এক পোস্টে লিখেছেন, “ইরান মাত্রই জানিয়েছে যে তারা আজ খুব শক্ত আঘাত হানবে, যা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভয়াবহ হবে। তবে তাদের সেটা না করাই ভালো, কারণ তারা যদি তা করে, তবে আমরা তাদের ওপর এমন শক্তি দিয়ে আঘাত করব যা আগে কখনো দেখা যায়নি!”
ইরানে ২০০-এর বেশি নিহত
রবিবার সকালে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা পশ্চিম ও মধ্য ইরানে ৩০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। তারা ঘোষণা করেছে যে, ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, সামরিক সদর দপ্তর এবং অন্যান্য ‘শাসকগোষ্ঠীর লক্ষ্যবস্তুতে’ হামলা অব্যাহত থাকবে।
শনিবার থেকে ইরানে অন্তত ২০১ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর মিনাবের একটি বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলায় অন্তত ১৪৮ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ইরানের ইসলামিক রিভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তারা প্রতিশোধমূলক হামলার অংশ হিসেবে ২৭টি মার্কিন ঘাঁটি, ইসরায়েলের তেল নোফ বিমানঘাঁটি, তেল আবিবের হাকিরিয়ায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সদর দপ্তর এবং শহরটির একটি বড় প্রতিরক্ষা শিল্প কমপ্লেক্সে হামলা চালাচ্ছে।
স্থানীয় সময় সকাল ৬টার (জিএমটি ০৩:০০) কিছু পরে, তেল আবিবসহ ইসরায়েলজুড়ে একের পর এক বিস্ফোরণের শব্দের সাথে সাথে বিমান হামলার সাইরেন বাজতে শোনা যায়। ইরান সরকার সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর পর অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে দেশ পরিচালনার জন্য তিন সদস্যের একটি কাউন্সিল গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে খামেনির সমর্থকরা শোক প্রকাশে রাস্তায় নেমে এসেছেন। প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান সরকারের ঘোষিত ৪০ দিনের শোকের পাশাপাশি অতিরিক্ত ৭ দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছেন।
সূত্র : আল জাজিরা
আরটিএনএন/এআই
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!