ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এবং শীর্ষ কর্মকর্তাদের হত্যার পর তেহরান অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে প্রতিশোধ নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেছে। ইরান জানিয়েছে, তাদের লক্ষ্যবস্তু হলো ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এবারের পরিস্থিতি ২০২৫ সালের জুনের ১২ দিনের যুদ্ধের চেয়ে ভিন্ন। খামেনির হত্যাকাণ্ড ইরানকে বাধ্য করেছে বিশ্বাস করতে যে, এটি এখন কেবল প্রতিশোধ নয়, বরং ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। সংযম দেখানো বা প্রতিশোধে দেরি করা দুর্বলতার দিক হিসেবে ধরা হতে পারে এবং আরও বড় হামলার পথ প্রশস্ত করতে পারে, এমনটাই মনে করছে ইরান।
দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (২,০০০–২,৫০০ কিমি)
ইরানের দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ২,০০০ থেকে ২,৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত যেতে পারে। এর মানে হলো, এগুলো দিয়ে ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের যেকোনো মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাত করা সম্ভব। তবে ট্রাম্পের দাবি সত্ত্বেও, এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর পক্ষে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র (১৫০–৮০০ কিমি)
নিকটবর্তী লক্ষ্যবস্তুর ওপর দ্রুত আঘাতের জন্য। ‘ফাত্তাহ’, ‘জুলফিকার’, ‘কিয়াম-১’ ও পুরনো ‘শাহাব-১/২’ অন্তর্ভুক্ত। ২০২০ সালে কাসেম সোলাইমানি হত্যার পর এই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ইরাকের আইন আল-আসাদ ঘাঁটিতে ব্যবহার করা হয়েছিল।
মধ্যপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র (১,৫০০–২,০০০ কিমি)
‘শাহাব-৩’, ‘ইমাদ’, ‘ঘদর-১’, ‘খোররামশাহর’, ‘সেজ্জিল’। এগুলো কাতার, বাহরাইন, কুয়েত, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাত করতে সক্ষম।
ক্রুজ মিসাইল ও ড্রোন
‘সুমার’, ‘ইয়া-আলি’, ‘পাভেহ’, ‘রাদ’। মাটির কাছ দিয়ে উড়ার কারণে শনাক্ত করা কঠিন। ড্রোন একসাথে শত শত উৎক্ষেপণ করে বন্দর ও বিমানবন্দর অচল করতে পারে।
হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র
‘ফাত্তাহ’ সিরিজ, দ্রুতগতির এবং অপরাজেয়। ইতোমধ্যে বিশ্বের বড় শিপিং গ্রুপ ‘মায়েরস্ক’ এই প্রণালীতে জাহাজ চলাচল স্থগিত করেছে, যা তেলের দামের ওপর প্রভাব ফেলেছে।
ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের বড় অংশ ভূগর্ভস্থ ‘মিসাইল সিটি’-তে রাখে। ফলে কোনো প্রথম হামলায় সব সক্ষমতা ধ্বংস করা কঠিন।
হরমুজ প্রণালী ও নৌ কৌশল
ইরান হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহকে প্রভাবিত করতে পারে। তারা অ্যান্টি-শিপ মিসাইল, নৌ-মাইন এবং দ্রুতগতির আক্রমণকারী নৌযান ব্যবহার করে বাণিজ্যিক চলাচল বাধাগ্রস্ত করতে সক্ষম।
প্রক্সি বাহিনী ও আঞ্চলিক মিত্র
ইরানের সামরিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো ‘প্রক্সি নেটওয়ার্ক’ বা আঞ্চলিক মিত্র বাহিনী। খামেনির মৃত্যুর পর এই বাহিনী কেবল ইরানের হয়ে নয়, বরং নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হিসেবে কাজ করছে।
হিজবুল্লাহ (লেবানন)
ইরানের জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে কাজ করে হিজবুল্লাহ। তারা কেবল একটি গোষ্ঠী নয়, এটি বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী অ-রাষ্ট্রীয় সামরিক বাহিনী। তাদের ভাণ্ডারে প্রায় ১.৫ লাখ থেকে ২ লাখ রকেট ও মিসাইল রয়েছে। যা ইসরায়েলের যেকোনো প্রান্তে আঘাত হানতে সক্ষম। খামেনির মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে তারা উত্তর ইসরায়েলে নিয়মিত হামলা চালাচ্ছে।
এর ফলে ইসরায়েলকে তাদের বিশাল একটি সৈন্যদল উত্তর সীমান্তে আটকে রাখতে হচ্ছে, যা ইরানের ওপর সরাসরি হামলা চালানোর ক্ষেত্রে ইসরায়েলি সক্ষমতাকে কিছুটা কমিয়ে দেয়। হিজবুল্লাহর যোদ্ধারা সিরিয়া যুদ্ধে সরাসরি অভিজ্ঞ। তারা ইরানের হয়ে আঞ্চলিক সমন্বয়কের কাজ করে।
হুথি বিদ্রোহী (ইয়েমেন)
লোহিত সাগরে হুথিরা ড্রোন ও অ্যান্টি-শিপ মিসাইল ব্যবহার করে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালাচ্ছে। হুথিরা ইরানের দূরপাল্লার ড্রোন এবং অ্যান্টি-শিপ মিসাইল প্রযুক্তির প্রধান ব্যবহারকারী। তারা লোহিত সাগর এবং এডেন উপসাগরে ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালাচ্ছে।
এর ফলে বিশ্ব বাণিজ্যের একটি বড় অংশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। হুথিরা সরাসরি ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দর শহর ‘এইলাত’ (Eilat) এবং এমনকি তেল আবিব লক্ষ্য করে ড্রোন ও মিসাইল ছুড়ছে। তারা মূলত পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করতে ইরানকে সাহায্য করছে।
ইরাক ও সিরিয়ার শিয়া মিলিশিয়া
মার্কিন ঘাঁটিতে ড্রোন ও রকেট হামলা চালাচ্ছে। ইরাকের ‘কাতায়িব হিজবুল্লাহ’ এবং ‘হরকত আল-নুজাবা’-র মতো গোষ্ঠীগুলো ইরানের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। ইরাক ও সিরিয়ায় অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে (যেমন- আইন আল-আসাদ, আল-তানফ) তারা নিয়মিত ড্রোন ও রকেট হামলা চালাচ্ছে।
সোমবার কুয়েতে যে মার্কিন দূতাবাসের কাছে ধোঁয়া দেখা গেছে বা জর্ডানে মার্কিন বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার খবর এসেছে, তাতে এই গোষ্ঠীগুলোর হাত থাকার সম্ভাবনা প্রবল। তারা যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তাড়ানোর জন্য এই সুযোগকে ব্যবহার করছে।
ফিলিস্তিনের হামাস ও ইসলামি জিহাদ
গাজার ভিতর থেকে ইসরায়েলি সৈন্যদের ব্যস্ত রাখছে। গাজা যুদ্ধে হামাস অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তবুও তারা গাজার ভেতর থেকে ইসরায়েলি সৈন্যদের ব্যস্ত রাখছে। এটি ইসরায়েলকে দ্বি-মুখী বা ত্রি-মুখী যুদ্ধের চাপে ফেলে দিচ্ছে।
দীর্ঘমেয়াদী কৌশল
ইরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তাদের প্রতিক্রিয়া কোনো ‘সীমিত অপারেশন’ নয়। খামেনির মৃত্যুর পর তাদের অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে। ইরান কেবল একবারের প্রতিশোধ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী প্রচারণা ও আঞ্চলিক চাপের পরিকল্পনা করছে। এতে পুরো মধ্যপ্রাচ্য অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির মুখে পড়তে পারে।
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!