রাজধানীতে মশার উপদ্রব আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, জানুয়ারির তুলনায় ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় মশার সংখ্যা ৪০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এক ঘণ্টায় একজন মানুষের শরীরে গড়ে ৮৫০টি মশা কামড়াতে আসছে—যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে অত্যন্ত বিপজ্জনক বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
আদাবরের বাসিন্দা তরিকুল ইসলাম লিংকন জানান, ঘরে কয়েল বা অ্যারোসল ব্যবহার করেও স্বস্তি মিলছে না। এমনকি মশারির ভেতরেও মশা ঢুকে পড়ছে। তাঁর আট বছরের ছেলের হাত-পায়ে কামড়ের দাগ ও ঘা দেখা দিয়েছে। একই অভিজ্ঞতার কথা বলছেন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারাও।
সম্প্রতি এক গবেষণা পরিচালনা করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়-এর প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার। এতে দেখা যায়, রাজধানীতে পাওয়া মশার প্রায় ৯০ শতাংশই কিউলেক্স প্রজাতির। মার্চে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
যেভাবে জরিপ করা হয়
গবেষকেরা লার্ভা ও পূর্ণবয়স্ক—দুই পর্যায়ের মশা গণনা করেন। বিভিন্ন জলাশয় থেকে ২৫০ মিলিলিটার পানি সংগ্রহ করে লার্ভার ঘনত্ব পরীক্ষা করা হয়। জানুয়ারিতে গড়ে ৮৫০টি লার্ভা পাওয়া গেলেও ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ২৫০-এ।
অন্যদিকে, একজন মানুষের উন্মুক্ত হাত-পায়ে এক ঘণ্টায় কত মশা বসে তা হিসাব করা হয়। জানুয়ারিতে যেখানে সংখ্যা ছিল ৪০০–৬০০, ফেব্রুয়ারিতে তা গড়ে ৮৫০-এ পৌঁছেছে। অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, এক ঘণ্টায় পাঁচটি মশা কামড়ালেই তা বেশি হিসেবে ধরা হয়—সেখানে ৮৫০টি নিঃসন্দেহে বিপৎসংকেত।
কামরাঙ্গীরচর, লালবাগ, শনির আখড়া, শ্যামপুর, রায়েরবাজার, উত্তরা ও সাভার এলাকায় মশার ঘনত্ব বেশি পাওয়া গেছে। তুলনামূলকভাবে শাহবাগ ও পরীবাগ এলাকায় কম।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ পর্যবেক্ষণে জানুয়ারির মাঝামাঝি পাঁচ এলাকায় ১৭ হাজারের বেশি মশা ধরা পড়ে। ফেব্রুয়ারির শুরুতে একই এলাকায় সেই সংখ্যা বেড়ে ২২ হাজার ছাড়ায়।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সঙ্গে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) পাঁচ এলাকায় মশা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে। এখানে মশা বেড়ে যাওয়ার চিত্র উঠে এসেছে। কোনো এলাকায় ২৪ ঘণ্টা টানা মশার ফাঁদ রেখে এ গবেষণা করা হয়। গত ১৬ থেকে ২০ জানুয়ারি রাজধানীর পাঁচটি এলাকায় ১৭ হাজার ১৫৯টি মশা পাওয়া যায়। আর ৩০ জানুয়ারি থেকে ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পাওয়া যায় ২২ হাজার ৩৬২টি। ওই পাঁচ এলাকা হলো উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরের পার্ক, মিরপুর ২–এ ডিএনসিসির ভান্ডার শাখা অফিস, গুলশান ১–এর পুরাতন ভান্ডার শাখা অফিস, মিরপুর ১–এর ১০ নম্বর ওয়ার্ড কমিউনিটি সেন্টার ও মোহাম্মদপুরের ডিএনসিসির আঞ্চলিক অফিস।
কেন বাড়ছে কিউলেক্স
বাংলাদেশে সাধারণত কিউলেক্স, এডিস ও অ্যানোফিলিস—এই তিন প্রজাতির মশা বেশি দেখা যায়। এর মধ্যে কিউলেক্সের আধিক্য সবচেয়ে বেশি। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক জি এম সাইফুর রহমান জানান, এ বছর শীতের তীব্রতা কম ছিল এবং গরম দ্রুত শুরু হয়েছে। এতে মশার জীবনচক্র দ্রুত সম্পন্ন হচ্ছে ও স্ত্রী মশার রক্তপানের প্রবণতা বাড়ছে, ফলে ডিম উৎপাদনও বাড়ছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারিতে স্বাভাবিকের তুলনায় তাপমাত্রা কিছুটা বেশি ছিল, যা কিউলেক্স বৃদ্ধির অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। পাশাপাশি দূষিত নর্দমা, বদ্ধ জলাশয় ও আবর্জনা মশার প্রধান প্রজননক্ষেত্র হিসেবে কাজ করছে।
ব্যবস্থাপনায় চ্যালেঞ্জ
ডিএনসিসি এলাকায় প্রায় আট হাজার বিঘা জলাশয় রয়েছে, যেগুলোর অনেকগুলোই মশার উৎপত্তিস্থল। ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী বলেন, পরিষ্কারের পরও দ্রুত আবর্জনা জমে যায়। খোলা নর্দমা ও স্থায়ী জলাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে জটিল করছে।
এ ছাড়া সিটি করপোরেশনে জনপ্রতিনিধির অভাবে সচেতনতা ও সমন্বয় কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলেও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে রাজধানীতে মশার উপদ্রব আরও ভয়াবহ আকার নিতে পারে।
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!