দেশের গণমাধ্যমের ঝকঝকে পর্দার আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা আবারও সামনে এসেছে। পেশাগত দায়িত্ব পালনের জায়গা—যেখানে নিরাপত্তা, সম্মান আর স্বাধীনতা থাকার কথা—সেই কর্মক্ষেত্রই অনেক সাংবাদিকের জন্য হয়ে উঠছে ভয়ের, অপমানের এবং কখনও চরম নির্যাতনের জায়গা।
রাজধানীর একটি হোটেলে ‘গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য যৌন হয়রানি প্রতিরোধ প্রটোকল’ প্রকাশ অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত এক জরিপ যেন সেই অন্ধকার বাস্তবতাকে সংখ্যায় রূপ দিয়েছে। ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক সংস্থা WAN-IFRA, বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশনের সহযোগিতায় এই জরিপটি পরিচালনা করে। এতে অংশ নেন দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে কর্মরত ৩৩৯ জন সাংবাদিক—যাদের মধ্যে ১০০ জন নারী এবং ১৯০ জন পুরুষ।
জরিপের ফলাফল শুধু উদ্বেগজনক নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে শঙ্কাজনক। অংশগ্রহণকারীদের প্রায় ১৫ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা কর্মক্ষেত্রে কোনো না কোনো ধরনের যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। সংখ্যাটা কাগজে যতটা ছোট মনে হয়, বাস্তবে তা বহন করে অসংখ্য অপ্রকাশিত অভিজ্ঞতা, ভয় এবং নীরবতার গল্প।
এই চিত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছেন নারী সাংবাদিকরা। জরিপে দেখা যায়, প্রতি ১০ জন নারী সাংবাদিকের মধ্যে ৬ জনই মৌখিক হয়রানির শিকার হয়েছেন। অন্যদিকে পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ৯ শতাংশ। অনলাইন হয়রানিতেও একই চিত্র—নারীদের ৪৮ শতাংশ যেখানে এমন অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন, সেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে তা ১৫ শতাংশ।
শুধু কথার আঘাত বা ভার্চুয়াল স্পেসেই নয়, শারীরিক হয়রানির ঘটনাও কম নয়। জরিপে অংশ নেওয়া নারী সাংবাদিকদের ২৪ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা শারীরিকভাবে হয়রানির শিকার হয়েছেন। পুরুষদের মধ্যে এই হার ৭ শতাংশ।
কিন্তু সবচেয়ে আতঙ্কজনক তথ্যটি আসে জরিপের একেবারে গভীর থেকে। সেখানে উঠে এসেছে—কর্মক্ষেত্রেই সাতজন নারী এবং দুইজন পুরুষ সাংবাদিক ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছেন। এই সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়, বরং প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একেকটি ভেঙে পড়া নিরাপত্তাবোধ, একেকটি দমিয়ে রাখা কণ্ঠস্বর।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলছেন, এই চিত্র হয়তো পুরো বাস্তবতাকেও তুলে ধরে না। কারণ সামাজিক চাপ, পেশাগত অনিশ্চয়তা এবং প্রতিশোধের ভয়—এই তিনটি কারণে অনেক ভুক্তভোগীই সামনে আসতে চান না।
তাই এখন সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে প্রতিরোধের কাঠামো গড়ে তোলা। বক্তাদের মতে, প্রতিটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকতে হবে, থাকতে হবে কার্যকর ও নিরপেক্ষ অভিযোগ ব্যবস্থাও। শুধু কাগজে-কলমে নয়, বাস্তব প্রয়োগেই নিশ্চিত করতে হবে কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা।
গণমাধ্যম সমাজের আয়না—এই কথাটি বহুবার বলা হয়। কিন্তু সেই আয়নাতেই যদি ভেতরের অন্ধকার প্রতিফলিত হয়, তবে প্রশ্ন ওঠে—সত্য তুলে ধরার এই পেশাটিই কতটা নিরাপদ তার নিজের মানুষের জন্য?
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!