সড়ক দুর্ঘটনা, ফেরিঘাট, রাজবাড়ী
ফেরির অপেক্ষায় থাকা বাসটি পন্টুন থেকে নদীতে পড়ে যাওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ২৫ মার্চ বিকেলে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে এ ঘটনা ঘটে।   ছবি: আরটিএনএন

ছরের দুইবার দেশে ঈদ উদযাপিত হয়। পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ গ্রামের দিকে যাত্রা শুরু করে। দীর্ঘ ছুটি, ভ্রমণ, কেনাকাটা—সব মিলিয়ে সড়কে যাত্রী চাপ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। কিন্তু দেশের সড়ক ও পরিবহন ব্যবস্থার সক্ষমতা এই অতিরিক্ত চাপ সামলাতে পারছে না। ফলে ঈদের সময় সড়ক ব্যবস্থাপনা হয়ে ওঠে প্রাণঘাতী।

সম্প্রতি রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে বাসডুবির ঘটনা এমনই এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ছিল। এতে পদ্মায় ডুবে অন্তত ২৬ জন মানুষের নির্মম মৃত্যু হয়েছে। এখনও নিখোঁজ রয়েছেন অন্তত ৬ জন। এ ছাড়াও গতকাল ২৬ মার্চ কুমিল্লার বুড়িচংয়ে বাস ও প্রাইভেটকার সংঘর্ষে একই পরিবারের ৪ জনসহ ৫ জন নিহত হয়েছেন। এছাড়াও কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে ট্রেন-বাস সংঘর্ষে ১২ জন প্রাণ হারিয়েছেন। সরকারি হিসাবে মাত্র সাতদিনে ৯২ দুর্ঘটনায় ১০০ জন নিহত ও ২১৭ জন আহত; বেসরকারি হিসাবে এই সংখ্যা আরও বেশি।

নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) জানিয়েছে, দুর্ঘটনার পেছনে মূলত রয়েছে অতিরিক্ত গতি, আইন অমান্য ও চালকের অসতর্কতা। বছরের অন্য সময়ও ট্রাফিক আইন অমান্য হয়, ঈদের সময় তা অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অদক্ষ চালক, অতিরিক্ত যাত্রী—সবকিছু ‘স্বাভাবিক’ পরিস্থিতি হিসেবে দেখা হয়। সড়ক, রেল ও নৌপথে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব, লেভেলক্রসিং ও ফেরিঘাটের অব্যবস্থা—সবই দুর্ঘটনার সম্ভাবনা বাড়ায়।

ঈদকালীন সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যানও ভয়াবহ। ২০২৪ সালে ৬ হাজার ৯৭৪টি দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ২৩৭ জন নিহত ও ১৩ হাজার ১৯০ জন আহত; ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৩৬৯টি দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ৭৫৪ জন নিহত ও ১৫ হাজার ৯৬ জন আহত। দুর্ঘটনার প্রায় ৩০ শতাংশই মোটরসাইকেল এবং ইজিবাইকের। ছোট যানবাহনকে উৎসাহিত করার ফলেই বিপুল প্রাণহানি ঘটছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

নৌপথও নিরাপদ নয়। দৌলতদিয়ার বাসডুবি এবং দেশের হাজার হাজার অরক্ষিত লেভেলক্রসিং চরম অব্যবস্থার প্রমাণ। ঈদকালীন ট্রেন-বাস সংঘর্ষে শুধু নিম্নস্তরের কর্মীদের সাময়িক বরখাস্ত করা হলেও উচ্চপদস্থদের জবাবদিহিতা নেই বললেই চলে। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিবহন খাতের নৈরাজ্যের পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সড়ক দুর্ঘটনার কারণে বাংলাদেশ প্রতি বছর জিডিপির ২–৫ শতাংশ হারাচ্ছে। আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি পরিবারগুলোর একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির মৃত্যু দারিদ্র্যের ফাঁদে ফেলে। ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা অত্যন্ত আমলাতান্ত্রিক; ৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন মাত্র ৯ দশমিক ৮৬ শতাংশ নিহতের পরিবার।

উন্নত দেশগুলোর তুলনায় আমাদের সড়ক ব্যবস্থাপনা এখনো সেকেলে। জাপানে গণপরিবহন মনিটরিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে সময়ানুবর্তিতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। ইউরোপে চালকের গাড়ি চালানোর সময়সীমা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। ভারতে হাইওয়ে প্যাট্রোলিং ও ইলেকট্রনিক নজরদারি দুর্ঘটনা কমাতে ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশে এমন নজরদারি প্রায় নেই।

যদিও প্রশাসনের সূত্রে জানা গেছে, আগামী ঈদযাত্রা ও দৈনন্দিন যাত্রাকে আরও নিরাপদ করতে পরিবহন ব্যবস্থায় নতুন নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। প্রত্যেকটি যানবাহনে জিপিএস ট্র্যাকিং বাধ্যতামূলক করা হবে, যাতে রিয়েল-টাইম মনিটরিং সম্ভব হয়। চালকদের জন্য যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ প্রদান এবং নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

ধীরগতির যানবাহনের জন্য পৃথক লেন এবং উন্নত লেভেলক্রসিং নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু করা হবে। এছাড়াও ফেরিঘাট ও টার্মিনালগুলোতে সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা বজায় রাখার নির্দেশনা জারি হয়েছে।

পরিবহন মাফিয়া চক্র ভেঙে দেওয়া এবং প্রশাসনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে সরকার। সমন্বিত পরিকল্পনা ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ঈদযাত্রা এবং দৈনন্দিন যাত্রা আরও নিরাপদ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বর্তমান সরকার। এখন দেখার বিষয় এ নির্দেশনাগুলো কাগজে-কলমেই থাকে নাকি বাস্তবতার মুখ দেখে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, যতক্ষণ না সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নাগরিকদের জীবন নিরাপদ রাখার বাস্তব দায়ভার নেবে, সড়কে এই অকালমৃত্যুর মিছিল থামানো সম্ভব নয়। সড়ক যেন নিরাপদ হয়, মানুষের স্বাভাবিক মৃত্যু নিশ্চিত হয়—এটাই সাধারণ জনতার দাবি।