চাঁদা, সমঝোতা, নৌপরিবহনমন্ত্রী
বৃহৎ বাস কোম্পানির ৯২ শতাংশ পরিচালনায় রাজনীতিবিদদের সম্পৃক্ততা রয়েছে।   ছবি: সংগৃহীত

নতুন সড়ক পরিবহন, রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম পরিবহন খাতে মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নামে আদায়কৃত অর্থকে ‘চাঁদা’ না বলে ‘সমঝোতার ভিত্তিতে তোলা টাকা’ হিসেবে দেখার যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা নীতিগত ও বাস্তব—দুই ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে। কারণ, ভাষাগত পুনর্ব্যাখ্যা কেবল শব্দের পরিবর্তন নয়; এটি রাষ্ট্রের অবস্থান ও প্রয়োগিক নীতির দিকনির্দেশও নির্ধারণ করে।

মন্ত্রী যুক্তি দিয়েছেন—যে অর্থ জোর করে আদায় করা হয় না, সেটিকে চাঁদা বলা যায় না; বরং তা সংগঠনের কল্যাণমূলক তহবিল। কিন্তু বাস্তব প্রশ্ন হলো: এই ‘সমঝোতা’ কতটা স্বেচ্ছায়, কতটা কাঠামোগত বাধ্যতায়? যখন কোনো খাতে প্রবেশ, রুটে চলাচল, টার্মিনাল ব্যবহার বা প্রশাসনিক সহায়তার জন্য সংগঠনভিত্তিক অর্থপ্রদানের অলিখিত বিধি কার্যকর থাকে, তখন সেই সমঝোতা কতটা মুক্ত—তা নিয়েই বিতর্ক।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর ২০২৪ সালের ৫ মার্চ প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, দেশে ব্যক্তিমালিকানাধীন বাস ও মিনিবাস থেকে বছরে প্রায় ১,০৫৯ কোটি টাকা আদায় হয়। এ অর্থের ভাগ যায় দলীয় পরিচয়ধারী গোষ্ঠী, ট্রাফিক ও হাইওয়ে পুলিশ, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)-এর কর্মকর্তা-কর্মচারী, মালিক-শ্রমিক সংগঠন ও স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিদের কাছে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো—বৃহৎ বাস কোম্পানির ৯২ শতাংশ পরিচালনায় রাজনীতিবিদদের সম্পৃক্ততা; যার ৮০ শতাংশ ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ, পরিবহন খাত কেবল অর্থনৈতিক ক্ষেত্র নয়; এটি রাজনৈতিক প্রভাবেরও একটি শক্তিশালী ক্ষেত্র। ফলে ‘সমঝোতা’ শব্দটি রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

মন্ত্রী দাবি করেছেন, মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলো কল্যাণমূলক কাজে এই অর্থ ব্যয় করে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই তহবিলের নিরীক্ষা কোথায়? কীভাবে ব্যয় হয়, তার স্বচ্ছতা কতটা?

পরিবহনবিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক সামছুল হক বলেন, পরিচালন ব্যয়ের বাইরে যেকোনো ‘ছায়া ব্যয়’ শেষ পর্যন্ত জনগণের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। পরিবহন খাতে অতিরিক্ত প্রতিটি টাকা ভাড়া বৃদ্ধির মাধ্যমে যাত্রীদের কাছ থেকেই আদায় হয়। অর্থাৎ, কল্যাণের নামে আদায়কৃত অর্থের প্রকৃত বোঝা বহন করে সাধারণ মানুষ।

করোনাকালে পরিবহনশ্রমিকদের পাশে সংগঠনগুলোর দৃশ্যমান ভূমিকা না থাকা ‘কল্যাণ’ যুক্তিকে আরও দুর্বল করে। আইন অনুযায়ী নিয়োগপত্র ও নিয়মিত বেতন নিশ্চিত করাই শ্রমিক কল্যাণের মূল শর্ত—চাঁদা তুলে তহবিল গঠন নয়।

পরিবহন খাতে চাঁদা ‘নীতিমালার’ মাধ্যমে বৈধ করার চেষ্টা নতুন নয়। ২০০২ সালে বিএনপি সরকারের সময় তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী নাজমুল হুদার নেতৃত্বে একটি নীতিমালার খসড়া তৈরি হয়েছিল, যা সমালোচনার মুখে বাস্তবায়িত হয়নি।

পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রয়াত সৈয়দ আবুল হোসেন ও শাজাহান খানের উদ্যোগে নতুন করে সুপারিশ তৈরি হয়—যেখানে মালিক সমিতি, শ্রমিক ইউনিয়ন ও ফেডারেশনের জন্য নির্দিষ্ট অঙ্কে চাঁদা তোলার প্রস্তাব ছিল। কিন্তু তীব্র সমালোচনার মুখে সেটিও অনুমোদন পায়নি।

তবুও বাস্তবে ‘৭০ টাকা চাঁদা’ এবং তার বাইরেও নানা নামে আদায় স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। অর্থাৎ, আইনি বৈধতা না থাকলেও সামাজিক-প্রাতিষ্ঠানিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে—যা এক ধরনের ‘ডি ফ্যাক্টো বৈধতা’।

মন্ত্রী বলেছেন, নতুন সরকার রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনাকে জনবান্ধব, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করবে; ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনায় সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো অগ্রাধিকার পাবে। কিন্তু পরিবহন খাতের বিশৃঙ্খলার মূল কারণ হিসেবে যদি চাঁদাবাজিকেই বিশেষজ্ঞরা চিহ্নিত করেন, তবে সেটিকে ‘চাঁদা নয়’ বলে আখ্যা দেওয়া সংস্কার প্রচেষ্টার সূচনালগ্নে একটি দ্ব্যর্থক বার্তা দেয়।

এখানে একটি নীতিগত দ্বন্দ্ব স্পষ্ট

সরকার কি অলিখিত প্রথাকে স্বীকৃতি দেবে, নাকি আইনের শাসনের ভিত্তিতে খাতটিকে পুনর্গঠন করবে?

‘সমঝোতা’ কি স্বচ্ছ চুক্তিভিত্তিক তহবিল, নাকি ক্ষমতাকাঠামোর প্রভাবে গড়ে ওঠা বাধ্যতামূলক অর্থপ্রদান?

পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। এটি কেবল অর্থনৈতিক নয়; রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, প্রশাসনিক সম্পৃক্ততা ও সংগঠনভিত্তিক আধিপত্যের সঙ্গে জড়িত।

মন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের বক্তব্য হয়তো বাস্তবতার স্বীকৃতি—যে প্রথা বহু বছর ধরে চলছে, তাকে তাৎক্ষণিকভাবে ‘অপরাধ’ আখ্যা দিলে সংঘাত তৈরি হতে পারে। কিন্তু ভাষাগত নরমীকরণ যদি কার্যত বৈধতার ইঙ্গিত দেয়, তবে তা সংস্কারের পথে অন্তরায় হতে পারে।

সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে হলে প্রথম শর্ত হলো—অবৈধ আরোপিত ব্যয়ের অবসান, তহবিল ব্যবস্থার স্বচ্ছ নিরীক্ষা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসনিক প্রয়োগ। অন্যথায় ‘সমঝোতা’ শব্দটি হয়তো চাঁদাবাজির নতুন অভিধান হয়ে উঠবে—আর ভোগান্তির বোঝা বইবে সাধারণ যাত্রীই।