হরমুজ প্রণালি, ইরান, আমেরিকা, যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, ইউরোপ, জাহাজ, তেল, খাদ্য সংকট, খাদ্য, সার, ইউরিয়া, সালফিউরিক, এ্যালুমিনিয়াম, এ্যালুমিনম, আন্তর্জাতিক,
হরমুজ প্রণালির ম্যাপ।   ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার নতুন মাত্রা তৈরি হয়েছে হরমুজ প্রণালী ঘিরে। ইরানের ঘোষণায় এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ কার্যত সীমিত হয়ে পড়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে। তবে আলোচনার কেন্দ্রে থাকা জ্বালানি সংকটের আড়ালে আরও বড় এক বিপদের আভাস দেখা যাচ্ছে—তা হলো বৈশ্বিক খাদ্য সংকট।

সাধারণভাবে মনে করা হয় হরমুজ প্রণালী মূলত তেল পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তবে এটি সার, অ্যালুমিনিয়াম ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহেরও একটি প্রধান পথ। বিশেষ করে ইউরিয়া সারের ক্ষেত্রে এই রুটের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সার সরবরাহ এই পথ দিয়ে হয়।

এই সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছে কৃষিনির্ভর দেশগুলো। ভারত, ব্রাজিল, চীন, অস্ট্রেলিয়া—সবাই বড় অংশে আমদানিনির্ভর। উদাহরণস্বরূপ, ভারতের প্রায় ৪০–৫০ শতাংশ ইউরিয়া আসে এই পথ দিয়ে, আর ব্রাজিলের নির্ভরতা প্রায় ৯০ শতাংশ।

সারের ঘাটতি মানেই সরাসরি খাদ্য উৎপাদনে ধাক্কা। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানসহ এশিয়া ও আফ্রিকার বহু দেশে কৃষি উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ায় স্থানীয় সার কারখানাগুলোর উৎপাদনও কমে যাচ্ছে বা বন্ধ হওয়ার পথে।

ফলে সংকটটি দ্বিমুখী—একদিকে আমদানি কমছে, অন্যদিকে স্থানীয় উৎপাদনও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেরা কৃষিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। তারা খাদ্যের ৮০–৯০ শতাংশ আমদানি করে। এই পরিস্থিতিতে সরবরাহ ব্যাহত হলে এসব দেশে সরাসরি খাদ্যসংকট এমনকি দুর্ভিক্ষের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে, এই দেশগুলোর ওপর নির্ভরশীল অন্যান্য রাষ্ট্রও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যা সংকটকে আরও বিস্তৃত করবে।

তেলের দাম ইতোমধ্যে প্রতি ব্যারেল ৭০–৭৩ ডলার থেকে বেড়ে ১২০ ডলার ছাড়িয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে উৎপাদন, সংরক্ষণ ও পরিবহন ব্যয়ে। একই সঙ্গে ইউরিয়ার দাম এক সপ্তাহে ৩২ শতাংশ বেড়ে প্রতি মেট্রিক টন ৬৮৩ ডলারে পৌঁছেছে।

এই বাড়তি ব্যয় শেষ পর্যন্ত গিয়ে চাপ ফেলছে খাদ্যমূল্যে। ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা দ্রুত কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পর থেকেই বৈশ্বিক খাদ্য ও জ্বালানি বাজার অস্থিতিশীল। তার ওপর হরমুজ প্রণালীর এই পরিস্থিতি সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিকল্প উৎস থেকে দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করাও সহজ নয়।

বর্তমানে এর প্রভাব পুরোপুরি দৃশ্যমান না হলেও, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে তা ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। খাদ্যের দাম বেড়ে গেলে উন্নয়নশীল দেশগুলো প্রথম ধাক্কা খাবে, আর নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো—যদি এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে যুদ্ধক্ষেত্রে যত মানুষ প্রাণ হারাবে, তার চেয়েও বেশি মানুষ মারা যেতে পারে খাদ্য সংকট ও দুর্ভিক্ষে।

হরমুজ প্রণালী ঘিরে বর্তমান পরিস্থিতি শুধু একটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক ইস্যু নয়; এটি ধীরে ধীরে বৈশ্বিক মানবিক সংকটে রূপ নিতে পারে। তাই এখনই বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা, খাদ্য মজুদ বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সমন্বয় জোরদার করা না গেলে সামনে আরও কঠিন সময় অপেক্ষা করছে।