বাসভাড়া, ঈদুল ফিতর
বাসভাড়া প্রায় দ্বিগুণের কাছাকাছি বেড়েছে বলে যাত্রীদের অভিযোগ রয়েছে।   ছবি: আরটিএনএন

প্রতিবছরের মতো আসন্ন ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে আবারও দেশের সড়ক পরিবহন খাতে ভাড়া নৈরাজ্যের অভিযোগ সামনে এসেছে। ঈদ মানেই ঘরমুখো মানুষের ঢল, আর এই সুযোগকে পুঁজি করে পরিবহন কোম্পানিগুলোর একটি অংশ যাত্রীদের জিম্মি করে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ নতুন নয়। তবে এবারের পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে একই রুট, একই বাস এবং একই ধরনের সেবায় মাত্র সাত দিনের ব্যবধানে ভাড়া দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ার ঘটনা।

অনলাইনে টিকিট বিক্রির তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিভিন্ন রুটে বাসভাড়ার এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ছিল চোখে পড়ার মতো। যেমন ঢাকা–বুড়িমারি রুটে ‘বরকত ট্রাভেলস’-এর প্রিমিয়াম স্লিপার এসি বাসে গত ১০ মার্চ প্রতিটি আসনের ভাড়া ছিল ১৫০০ টাকা, যা ১৮ মার্চের ট্রিপে বেড়ে হয়েছে ৩০০০ টাকা। একইভাবে ঢাকা–কাউনিয়া–তিস্তা রুটে ‘শাহ আলী পরিবহন’-এর বিজনেস ক্লাস এসি বাসের ভাড়া ১১০০ টাকা থেকে বেড়ে ২৫০০ টাকা হয়েছে। আবার ঢাকা–লালমনিরহাট ও ঢাকা–পঞ্চগড় রুটে ইকোনমি ক্লাস এসি বাসের ভাড়া ১০০০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১৬০০ টাকা।

এমনকি কিছু ক্ষেত্রে ভাড়া প্রায় দ্বিগুণের কাছাকাছি বেড়েছে। উদাহরণ হিসেবে ঢাকা–চাঁপাইনবাবগঞ্জ রুটে ‘এভারগ্রিন ট্রান্সপোর্ট’-এর এসি বাসের ভাড়া ৯০০ ও ১১০০ টাকা থেকে সরাসরি ২০০০ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। ফলে অল্প সময়ের ব্যবধানে ভাড়ার এই বড় ধরনের পরিবর্তন সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি করেছে।

পরিবহন মালিকদের পক্ষ থেকে বাড়তি ভাড়ার প্রধান যুক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয় ফিরতি পথে যাত্রী সংকট এবং ঈদের সময় দীর্ঘ যানজটের বিষয়টি। তাদের মতে, একমুখী যাত্রী চাপের কারণে অপারেশনাল ব্যয় সমন্বয় করতেই এই ভাড়া বৃদ্ধি করা হয়। কিন্তু যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই যুক্তি পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ সারা বছর পরিবহন খাত লাভজনক থাকে এবং বিশেষ মৌসুমে হঠাৎ ভাড়া দ্বিগুণ বা তিনগুণ করে দেওয়া বাজার নীতিরও সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

অন্যদিকে, মালিক সমিতির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে নন-এসি বাসে ভাড়া বাড়ানোর কোনো আইনি সুযোগ নেই এবং জ্বালানি সংকটের সঙ্গেও এই বাড়তি ভাড়ার সম্পর্ক নেই। সংগঠনের নেতারা বলেছেন, কেউ বাড়তি ভাড়া নিলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে বাস্তবতা হলো—যাত্রীরা অভিযোগ করলেও অনেক ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিকার পাওয়া যায় না।

সরকারের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা বলা হয়েছে। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী জানিয়েছেন, সরকার নির্ধারিত কাঠামোর বাইরে কোনো অবস্থাতেই ভাড়া বাড়ানো যাবে না এবং প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—ঘটনা ঘটার আগেই কেন কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায় না।

সমস্যার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এসি বাসের ভাড়া নির্ধারণ পদ্ধতি। নন-এসি বাসের ভাড়া সাধারণত নিয়ন্ত্রিত হলেও এসি বাসের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ক্যাটাগরির কারণে মালিকপক্ষ অনেক সময় নিজস্বভাবে ভাড়া নির্ধারণ করে থাকে। এই সুযোগটিই অনেক সময় অপব্যবহারের ক্ষেত্র তৈরি করে। ফলে একই রুটে একই সেবার ক্ষেত্রে ভাড়ার বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএকে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। ঈদের মতো বিশেষ সময়ে বাসের অপারেশনাল ব্যয় বিবেচনায় একটি নির্দিষ্ট বা সীমাবদ্ধ ভাড়া কাঠামো নির্ধারণ করা যেতে পারে। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে কঠোর মনিটরিং নিশ্চিত না হলে প্রতি বছরই একই ধরনের ভাড়া নৈরাজ্য চলতে থাকবে।

সব মিলিয়ে ঈদে ঘরমুখো মানুষের যাত্রা সহজ ও স্বস্তিদায়ক করার বদলে যদি তা ভোগান্তি ও বাড়তি অর্থনৈতিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তবে সেটি শুধু একটি পরিবহন সংকট নয়; বরং নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নের দুর্বলতারও প্রতিফলন। তাই সাময়িক আশ্বাসের বদলে দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এখন সময়ের দাবি।