আমানত রক্ষার গুরুত্ব, খেয়ানতের শাস্তি
ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র- সবক্ষেত্রে আমানত রক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে ইসলাম।   ছবি: আরটিএনএন

সলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান হিসেবে পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাস বজায় রাখার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেছে। অন্যের গচ্ছিত সম্পদ, তথ্য বা দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করাই হলো আমানত। আর এতে সামান্যতম বিচ্যুতি ঘটানোই হলো খেয়ানত; যা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

শুধু অর্থ-সম্পদই আমানতের অন্তর্ভুক্ত না। ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র- সবক্ষেত্রে আমানতের অন্তর্ভূক্তি রয়েছে। কেউ টাকা-পয়সা গচ্ছিত রাখলে যেমন সেটা সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা আমানত তেমনি কারো গোপন কথাও আমানত। আবার একজন চাকুরীজীবীর জন্য আমানত হলো তার কর্মঘণ্টা, অর্পিত দায়িত্ব, অফিসের গোপনীয়তা রক্ষা ও প্রতিষ্ঠানের সম্পদের সঠিক ব্যবহার। যা মালিকপক্ষের কাছ থেকে তার কাছে অর্পণ করা হয়। কাজের সময়ে ফাঁকি দেওয়া, ব্যক্তিগত কাজ করা বা প্রতিষ্ঠানের সম্পদ অপচয় করা হলো আমানতের খেয়ানত। সততা ও নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালনই হলো প্রকৃত আমানতদারিতা।

আবার রাষ্ট্রের সম্পদ, নাগরিকের অধিকার, গোপনীয়তা এবং সরকারি দায়িত্ব বা পদমর্যাদা হলো রাষ্ট্রীয় আমানত। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা নাগরিকের কাছে এটি গচ্ছিত বা অর্পিত থাকে। এসব রক্ষা করা প্রতিটি নাগরিকের ঈমানী দায়িত্ব। সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারীরা জনগণের সেবার যে দায়িত্ব পেয়েছেন, তা সততার সাথে পালন করা, রাষ্ট্রের অবকাঠামো, টাকা-পয়সা, যানবাহন, জমি ও অফিস সরঞ্জাম যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করা, দেশের নিরাপত্তা ও কৌশলগত তথ্য গোপন রাখা বা রক্ষা করা রাষ্ট্রীয় আমানতের অন্তর্ভুক্ত।

সবচেয়ে বড় আমানত হল জনগণের আমানত। এটা রক্ষার জন্য যোগ্যতা, সততা ও আল্লাহভীরুতা ছাড়াও দরকার ভার বহনের সৎসাহস। প্রখ্যাত সাহাবী আবু যার গিফারী (রা.) একদিন রাসূল (সা.)-কে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি আমাকে কোন এলাকার শাসক নিযুক্ত করবেন না? তখন তিনি আমার কাঁধে আঘাত করে বললেন,يَا أَبَا ذَرٍّ إِنَّكَ ضَعِيفٌ وَإِنَّهَا أَمَانَةٌ وَإِنَّهَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ خِزْيٌ وَنَدَامَةٌ إِلاَّ مَنْ أَخَذَهَا بِحَقِّهَا وَأَدَّى الَّذِي عَلَيْهِ فِيهَا. وَفِي رِوَايَةٍ : قَالَ لَهُ : يَا أَبَا ذَرٍّ إِنِّي أَرَاكَ ضَعِيفًا وَإِنِّي أُحِبُّ لَكَ مَا أُحِبُّ لِنَفْسِي لاَ تَأَمَّرَنَّ عَلَى اثْنَيْنِ وَلاَ تَوَلَّيَنَّ مَالَ يَتِيمٍ، رَوَاهُ مُسْلِمٌ-

‘হে আবু যার! তুমি দুর্বল। আর শাসনকার্য হল একটি আমানত। নিশ্চয় তা হবে কিয়ামতের দিন অপমান ও লাঞ্ছনার কারণ। তবে সে ব্যক্তি নয়, যে তা যথার্থভাবে গ্রহণ করে এবং নিষ্ঠার সাথে তার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে’।(মুসলিম হা/১৮২৫; মিশকাত হা/৩৬৮২ ‘নেতৃত্ব ও পদমর্যাদা’ অধ্যায়)।

আমানত রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়া হয়েছে ইসলামে। সরাসরি ঈমানের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে আমানতদারিতাকে। হযরত আনাস (রা.) বলেন,قَلَّمَا خَطَبَنَا رَسُولُ اللهِ -صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ- إِلاَّ قَالَ : لاَ إِيمَانَ لِمَنْ لاَ أَمَانَةَ لَهُ، وَلاَ دِينَ لِمَنْ لاَ عَهْدَ لَهُ- ‘রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদের নিকট খুব কমই ভাষণ দিতেন যেখানে তিনি বলতেন না যে, ঐ ব্যক্তির ঈমান নেই, যার আমানতদারিতা নেই। আর ঐ ব্যক্তির দ্বীন নেই, যার অঙ্গীকার (ওয়াদা) ঠিক নেই’।(বায়হাক্বী শো‘আবুল ঈমান, হা/৪০৪৫; মিশকাত হা/৩৫; ছহীহুত তারগীব হা/৩০০৪।)

পবিত্র কুরআনের নির্দেশনা:

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে আমানত প্রাপকের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এরশাদ করেছেন- إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَىٰ أَهْلِهَا

"নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তোমরা যেন আমানতসমূহ তার মালিকদের কাছে ফিরেয়ে দাও।" (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৫৮)।

অন্যত্র আল্লাহ তাআলা মুমিনদের সতর্ক করে বলেছেন- يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَخُونُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ وَتَخُونُوا أَمَانَاتِكُمْ وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ

"হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে খেয়ানত করো না এবং তোমাদের পারস্পরিক আমানতসমূহেও খেয়ানত করো না, অথচ তোমরা জানো।" (সূরা আল-আনফাল, আয়াত: ২৭)।

হাদীসের আলোকে আমানত ও খেয়ানত:

রাসূলুল্লাহ (সা.) আমানত খেয়ানতকারীকে 'মুনাফিক' হিসেবে অভিহিত করেছেন। প্রসিদ্ধ হাদীসটি হলো- عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: آيَةُ الْمُنَافِقِ ثَلَاثٌ: إِذَا حَدَّثَ كَذَبَ، وَإِذَا وَعَدَ أَخْلَفَ، وَإِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ

হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (সা.) এরশাদ করেছেন— "মুনাফিকের নিদর্শন তিনটি: যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, যখন ওয়াদা করে তা ভঙ্গ করে এবং যখন তার কাছে আমানত রাখা হয়, সে তাতে খেয়ানত করে।" হাদীসটি ইমাম বুখারী তাঁর সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৩৩) এবং ইমাম মুসলিম তাঁর সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ৫৯)-এ বর্ণনা করেছেন। এটি একটি 'মুত্তাফাকুন আলাইহি' (সর্বসম্মত) সহীহ হাদীস।

আমানত রক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে রাসূল (সা.) আরও বলেছেন- أَدِّ الأَمَانَةَ إِلَى مَنِ ائْتَمَنَكَ وَلاَ تَخُنْ مَنْ خَانَكَ

"যে তোমার কাছে আমানত রেখেছে তার আমানত আদায় করো এবং যে তোমার সাথে খেয়ানত করেছে তার সাথেও তুমি খেয়ানত করো না।" সুনানে আবু দাউদ (হাদীস নং ৩৫৩৫), তিরমিযী (হাদীস নং ১২৬৪)। ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে 'হাসান' বলেছেন।

আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন,لِكُلِّ غَادِرٍ لِوَاءٌ عِنْدَ اسْتِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَفِي رِوَايَةٍ : لِكُلِّ غَادِرٍ لِوَاءٌ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرْفَعُ لَهُ بِقَدْرِ غَدْرِهِ أَلاَ وَلاَ غَادِرَ أَعْظَمُ غَدْرًا مِنْ أَمِيرِ عَامَّةٍ- ‘প্রত্যেক খেয়ানতকারীর জন্য ক্বিয়ামতের দিন একটি ঝান্ডা থাকবে, যা তার পিঠের পিছনে পুঁতে দেওয়া হবে। অন্য বর্ণনায় এসেছে, তার খেয়ানতের পরিমাণ অনুযায়ী সেটি উঁচু হবে। সাবধান! জনগণের নেতার খেয়ানতের চাইতে বড় খেয়ানত আর হবেনা। সহীহ মুসলিম হাদীস নং-১৭৩৮, মিশকাত (হাদীস নং-৩৭২৭)।

তাই পরকালীন মুক্তি ও সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় আমানত রক্ষার কোনো বিকল্প নেই।