গৌতম গম্ভীরের অধীনে ভারতীয় দলে সহ-অধিনায়ককে বাদ দেওয়া নজিরবিহীন কিছু নয়। কিছুদিন আগেই শুবমান গিলের মতো বড় তারকাকেও একাদশ থেকে বাদ পড়ার লজ্জার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। তাই দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সুপার এইট ম্যাচে অক্ষর প্যাটেলকে একাদশের বাইরে রাখা খুব একটা বিস্ময়কর ছিল না।
ভারতীয় দলে পদমর্যাদার জন্য যে বিশেষ কোনো বিবেচনা নেই, তা স্পষ্ট। বিষয়টি ঠিক না ভুল—তা বিচারের ভার জুরির ওপর, তবে এই নির্বাচনের সিদ্ধান্ত ভারতের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াল। ডেভিড মিলারের বিধ্বংসী ব্যাটিংয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে হেরে মাটিতে নামতে হলো ভারতকে।
অক্ষরের বদলে ওয়াশিংটন সুন্দরকে নেওয়া কতটা যৌক্তিক ছিল, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ওয়াশিংটন এমন একজন অফ-স্পিনার, যিনি তার আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজির (যাদের হোম গ্রাউন্ড আহমেদাবাদ) নিয়মিত সদস্যও নন। গত মৌসুমে গুজরাট টাইটান্সের ১৫ ম্যাচের মধ্যে তিনি খেলেছেন মাত্র ৬টিতে। আর মোতেরার নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামে ২০২৫ আইপিএলে টাইটান্সের সাতটি ম্যাচের মধ্যে মাত্র তিনটিতে তিনি সুযোগ পেয়েছিলেন।
তবে ভারতের সহকারী কোচ রায়ান টেন ডেসকাট আইপিএল পারফরম্যান্সকে মূল্যায়নের মাপকাঠি মানতে নারাজ। তিনি বলেন, "আমি মনে করি না এটা প্রাসঙ্গিক। আপনাকে তার আইপিএল দলের গঠনের দিকে তাকাতে হবে। আমরা জানি ভারতীয় দলের হয়ে ওয়াশি কী করেছে এবং আমরা তাকে সেভাবেই বিচার করি।" তিনি পরিষ্কার করে দেন, আইপিএলে খেলা বা না খেলা ভারতীয় দলে নির্বাচনের মানদণ্ড নয়।
প্রতিপক্ষের সেরা পাঁচে তিনজন বাঁহাতি ব্যাটার থাকার কারণে এবং 'ম্যাচ-আপ' বিবেচনায় অক্ষরের চেয়ে ওয়াশিংটনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাঁহাতিদের বিপক্ষে বাঁহাতি স্পিনারের চেয়ে অফ-স্পিনার খেলানোর এই তাত্ত্বিক ও কিছুটা প্রচলিত কৌশল মাঠে কাজে আসেনি। গম্ভীরের অধীনস্থ এই ভারতীয় দল এমনিতেই প্রথাগত কৌশলের চেয়ে সাহসিকতাকে বেশি প্রাধান্য দেয়।
ডেসকাট জোর দিয়ে বলেন, দক্ষিণ আফ্রিকা দলের বাঁহাতিদের কথা ভেবেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। "আমরা ভেবেছিলাম মূল হুমকি বাঁহাতিদের কাছ থেকেই আসবে। আমরা বাড়তি ব্যাটার (রিঙ্কু সিং) খেলাতে চেয়েছিলাম, তাই আমাদের হাতে ওয়াশিংটন ও অক্ষরের মধ্যে একজনকে বেছে নেওয়ার সুযোগ ছিল। আজ আমরা ওয়াশির ওপর ভরসা রেখেছিলাম।"
কিন্তু বল হাতে ওয়াশিংটন কোনো প্রভাব ফেলতে পারেননি; দুই ওভারে উইকেট না পেয়ে ১৭ রান দেন। তবে ভারতকে সবচেয়ে বেশি ভুগিয়েছে পঞ্চম বোলিং অপশন। ওয়াশিংটন-দুবে জুটি চার ওভারে ৪৯ রান দিয়ে মাত্র একটি উইকেট নিতে পারে। যেদিন প্রধান স্পিনার বরুণ চক্রবর্তী ছন্দে ছিলেন না, সেদিন অন্য প্রান্ত থেকে সমর্থন খুব জরুরি ছিল, যা ওয়াশিংটন দিতে ব্যর্থ হন—অথচ এই কাজের জন্য অক্ষর পরিচিত। ওয়াশিংটন সেদিন নিজের সেরা ফর্মে ছিলেন না। ১৮৮ রান তাড়ায় ব্যাট হাতেও তিনি দলের প্রয়োজনে গতি আনতে পারেননি; ১১ বলে ১১ রান দলের উপকারে আসেনি। ফিল্ডিংয়েও তিনি দুটি ক্যাচ মিস করেন—যার একটি ছক্কা হয়ে যায় এবং অন্যটি গড়িয়ে বাউন্ডারি পার হয়।
অন্যদিকে, অক্ষর একজন প্রমাণিত ম্যাচ-উইনার। গত দুই বছরে, বিশেষ করে ২০২৪ বিশ্বকাপ বা কলম্বোয় পাকিস্তানের বিপক্ষে তার অবদান অনস্বীকার্য। তিনি আইপিএল দলের অধিনায়ক—এটা হয়তো ভারতীয় দলে বিবেচ্য নয়, কিন্তু তার সাম্প্রতিক ফর্ম এবং আহমেদাবাদে (যা তার হোম গ্রাউন্ড) খেলার অভিজ্ঞতা সুপার এইটের এই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তার অন্তর্ভুক্তি দাবি করছিল।
অভিজ্ঞতার বিচারেও ওয়াশিংটন তার সতীর্থ স্পিনারদের চেয়ে পিছিয়ে। অক্ষর ১৬২ আইপিএল ম্যাচে ৫৫০.৩ ওভার বল করেছেন, কুলদীপ যাদব ৯৮ ম্যাচে ৩৪২ ওভার। সেখানে ওয়াশিংটন ৬৬ ম্যাচে করেছেন ১৮৬.৩ ওভার। গুজরাট টাইটান্সের একাদশে নিয়মিত না থাকার একটি কারণ হিসেবে বলা হয়, তার ঝুলিতে 'দুসরা' নেই।
যদিও ডেসকাট বলছেন আইপিএল কোনো ফ্যাক্টর নয়, তবুও অভিজ্ঞতার মূল্য থাকা উচিত। তাছাড়া অক্ষর ও কুলদীপ দুজনই গত বিশ্বকাপে খেলেছেন। ওয়াশিংটনকে তাদের চেয়ে এগিয়ে রাখার কারণ হতে পারে টিম ম্যানেজমেন্ট তার ব্যাটিংকে গুরুত্ব দেয়। টেস্টে তিনি ৩ নম্বরে ব্যাট করেন, এখানে তাকে ৫ নম্বরে পাঠানো হয়েছিল। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার কিছু ভালো মুহূর্ত থাকলেও রবিবার রাতে তিনি প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হন।
ডেসকাট বলেন, "আমরা ভেবেছিলাম কুইন্টন ডি কক, রায়ান রিকেলটন এবং ডেভিড মিলারের কাছ থেকে বড় হুমকি আসবে। যখন দুজনকে বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকে, তখন আমরা এমন কাউকে চেয়েছিলাম যে পাওয়ারপ্লেতে বল করতে পারে।"
অথচ ওয়াশিংটনকে পাওয়ারপ্লেতে বলই দেওয়া হয়নি। দক্ষিণ আফ্রিকা পাওয়ারপ্লেতে ৩ উইকেটে ৪১ রান তোলে, যার মধ্যে তিনজন বাঁহাতির দুজনই তখন সাজঘরে। কিন্তু তৃতীয় জন—ডেভিড মিলার—ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। ওয়াশিংটন বা অন্য কোনো বোলার তাকে আটকাতে পারেননি। মাঝের ওভারে পাল্টা আক্রমণে তিনি ম্যাচটি ভারতের হাত থেকে ছিনিয়ে নেন।
অক্ষরের বদলে ওয়াশিংটন—এটি ছিল ভারতের বিপর্যয়ের রাতের একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। ফিল্ডিং ছিল হতাশাজনক, দুটি নো-বল করে ১৪ রান দেওয়া ছিল অমার্জনীয়। শেষ ওভারে ২০ রান দেওয়া এবং শেষ দুই বলে ছক্কা খাওয়া দক্ষিণ আফ্রিকাকে মোমেন্টাম এনে দেয়। সর্বোপরি, ১৮৮ রান তাড়ায় ব্যাটিং ইউনিটের ধস এবং অভিষেক শর্মার ফর্মহীনতা বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে ৭৬ রানের হার গত চার বছরে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের প্রথম হার, যা তাদের টানা ১২ ম্যাচ জয়ের ধারায় ছেদ টানল। আর এটি এল সম্ভবত সবচেয়ে খারাপ সময়ে। সুপার এইটের বাকি দুই ম্যাচের একটিতে হারলেই বিদায়ঘণ্টা বেজে যেতে পারে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে দায়িত্ব নেওয়ার পর সূর্যকুমার যাদবের দল কখনো এতটা খাদের কিনারে ছিল না। এই ম্যাচের আগে তার জয়-পরাজয়ের রেকর্ড ছিল ৩৮-৭, কিন্তু রান রেটে বড় ধাক্কা দেওয়া এই হার চূড়ান্ত হিসাবে কল্পনার চেয়েও বেশি ক্ষতি করতে পারে।
সূত্র : ক্রিকবাজ
আরটিএনএন/এআই
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!