রাষ্ট্রায়ত্ত,
বিগত সরকারের সময়ে কয়েকটি প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠী এসব ব্যাংক থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ নেয়।   ছবি: সংগৃহীত

রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় ব্যাংক এখন কার্যত মন্দ ঋণের ভারে নুয়ে পড়েছে। সোনালী, অগ্রণী, জনতা, রূপালী, বেসিক ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে (বিডিবিএল) আদায় অযোগ্য বা মন্দ ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা। যা এসব ব্যাংকের মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় অর্ধেক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সেপ্টেম্বর ২০২৫ প্রান্তিকের তথ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রায়ত্ত এই ছয় ব্যাংকের মোট ঋণের স্থিতি ৩ লাখ ১৯ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ ১ লাখ ৫৮ হাজার ৭৯১ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৪৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ। খেলাপি ঋণের বড় অংশই পরিণত হয়েছে মন্দ ঋণে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বিগত সরকারের সময়ে কয়েকটি প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠী এসব ব্যাংক থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ নেয়, যার বড় অংশ ফেরত আসেনি। এস আলম, বেক্সিমকো, নাসাসহ কয়েকটি গ্রুপ ঋণ নেওয়ার পর তা পরিশোধে কার্যত কোনো উদ্যোগ নেয়নি। পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এসব প্রতিষ্ঠানের অনেক কর্ণধার কারাগারে কিংবা দেশছাড়া। ব্যবসা কার্যক্রমও প্রায় বন্ধ। ফলে ঋণের বিপরীতে থাকা জামানত ও কাগজপত্র জটিলতায় পড়ে গেছে, যা আদায় প্রক্রিয়াকে আরও দুরূহ করে তুলেছে।

ছয় ব্যাংকের মধ্যে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় রয়েছে জনতা ব্যাংক। ব্যাংকটির মোট ঋণের স্থিতি ৯৬ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকা, যার মধ্যে মন্দ ঋণ ৬৯ হাজার ৫৮৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যাংকটির মোট ঋণের ৭২ শতাংশের বেশি এখন আদায় অযোগ্য। 

অগ্রণী ব্যাংকের মোট ঋণ ৭২ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকা; এর মধ্যে মন্দ ঋণ ২৯ হাজার ৩২১ কোটি টাকা বা ৪০ দশমিক ৩১ শতাংশ।

সোনালী ব্যাংকের মোট ঋণ ৮৯ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা, যার মধ্যে মন্দ ঋণ ১৮ হাজার ২১৯ কোটি টাকা। 

রূপালী ব্যাংকের মোট ঋণ ৪৬ হাজার ৩২১ কোটি টাকা; এর মধ্যে ২১ হাজার ৪৫৬ কোটি টাকা আদায় অযোগ্য।

বেসিক ব্যাংকের মোট ঋণ ১২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা, যার ৮ হাজার ৭৫২ কোটি টাকা মন্দ ঋণে পরিণত হয়েছে।

বিডিবিএলের মোট ঋণ ২ হাজার ৯০ কোটি টাকা; এর মধ্যে মন্দ ঋণ ৯৫৩ কোটি টাকা।

ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে মন্দ ঋণ আদায়ের নজির খুবই কম। আইনি প্রক্রিয়া দীর্ঘ, ব্যয়বহুল এবং জটিল হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব ঋণ ব্যাংকের হিসাব থেকেই কার্যত হারিয়ে যায়। ফলে দিন যত যাচ্ছে, আদায় না হওয়ার ঝুঁকি তত বাড়ছে।

বিশাল অঙ্কের মন্দ ঋণের বিষয়ে জানতে জনতা ব্যাংকের এমডি মো. মজিবর রহমানকে ফোন করা হলেও ফোন বন্ধ থাকায় বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, খেলাপি ঋণ কমাতে আদায় কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। এরই মধ্যে নির্ধারিত লক্ষ্যের একটি অংশ আদায় হয়েছে। তবে খেলাপিরা নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনায় ঋণ পুনঃতফশিল ও আদালতের মাধ্যমে আদায়ের গতি কিছুটা বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান আরটিএনএনকে বলেন, ইচ্ছাকৃত খেলাপিসহ সব ঋণ আদায়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কঠোর অবস্থানে রয়েছে। সরকারি ব্যাংকগুলোর জন্য নির্দিষ্ট আদায় লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে এবং আদালতে ঝুলে থাকা মামলার দ্রুত নিষ্পত্তিতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।