ঋণখেলাপী
ঋণখেলাপীর অভিযোগ নিয়েও নির্বাচন করতে পারছেন অনেকে।   ছবি: সংগৃহীত

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী ঋণখেলাপি ব্যক্তির নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ নেই। তবু আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঋণখেলাপি হওয়া সত্ত্বেও বিএনপির ১২ জন এবং জামায়াতে ইসলামীর ২ প্রার্থী ভোট যুদ্ধে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।

রোববার, (১৮ জানুয়ারি) নির্বাচন কমিশনে প্রার্থীদের আপিল শুনানি শেষ হয়। এরপর বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে দেখা যায়, আদালতের আদেশ বিবেচনায় নিয়ে গত ৪ জানুয়ারি রিটার্নিং কর্মকর্তারা ৩১ জন ঋণখেলাপি প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেছিলেন। এর মধ্যে ১৪ জনই ছিলেন বিএনপির প্রার্থী।

ওই ১৪ জনের মধ্যে মাত্র ৪ জনের বিরুদ্ধে আপিল হয়। তাদের চূড়ান্ত শুনানিতে নির্বাচন কমিশন দুজনের মনোনয়নপত্র বাতিল এবং দুজনের মনোনয়নপত্র বহাল রাখে। বাকি ১০ জনের বিরুদ্ধে কোনো আপিল না আসায় তাদের মনোনয়ন বহাল থাকে। ফলে মোট ১২ জন বিএনপি প্রার্থী ঋণখেলাপী হয়েও নির্বাচনে অংশ নিতে পারছেন।

আপিলে বাতিল হওয়া দুই প্রার্থী হলেন, কুমিল্লা-৪ আসনের মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী ও চট্টগ্রাম-২ আসনের সরোয়ার আলমগীর। আপিলের পরও মনোনয়ন বহাল থাকা দু’প্রার্থী হলেন, বগুড়া-১ আসনের কাজী রফিকুল ইসলাম ও চট্টগ্রাম-৪ আসনের মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরী।

কাজী রফিকুল ইসলামের বিষয়ে তার আইনজীবী ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল জানান, একই আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী আহসানুল তৈয়ব জাকির তার প্রার্থিতা বাতিল চেয়ে আপিল করেছিলেন। পাশাপাশি একটি ব্যাংকও আপিল দায়ের করে। পরে দলের ঐক্যের স্বার্থে আহসানুল তৈয়ব জাকির আপিল প্রত্যাহার করেন। ব্যাংকও শুনানিতে জানায়, দেনা-পাওনা বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে। ফলে ব্যাংকও আপিল প্রত্যাহার করে নেয়।

রিটার্নিং কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল না হওয়ায় যে ১০ বিএনপি প্রার্থী নির্বাচনে থাকছেন তারা হলেন, বগুড়া-৫ আসনের গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ, টাঙ্গাইল-৪ আসনের মো. লুৎফর রহমান, ময়মনসিংহ-৫ এর মোহাম্মদ জাকির হোসেন, গাজীপুর-৪ এর শাহ রিয়াজুল হান্নান, মৌলভীবাজার-৪ এর মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী, কুমিল্লা-৯ এর মো. আবুল কালাম, চট্টগ্রাম-৬ এর গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরী, চট্টগ্রাম-১৬ এর মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী, সিলেট-১ এর খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর এবং কুমিল্লা-৭ এর রেদোয়ান আহমেদ।

রেদোয়ান আহমেদ গত ১৮ জানুয়ারি বলেন, কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেলে তাকে ৪১ লাখ টাকা ঋণখেলাপি ও অন্য একটি ব্যাংকে জিম্মাদার হিসেবে দেখানো হয়েছে, যা বিভ্রান্তিকর।

তিনি দাবি করেন, ২০১৫ সালেই তিনি ওই ঋণ পরিশোধ করেছেন এবং যাঁর জিম্মাদার ছিলেন, তিনিও ঋণ শোধ করেছেন। তাই মনোনয়নপত্রের ৯ নম্বর কলামে কিছু লেখার প্রশ্নই আসে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবি রিপোর্টে তাকে ঋণখেলাপি দেখানো দুঃখজনক বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

প্রাথমিক বাছাইয়ে বাতিল ও পরে বৈধ হওয়া প্রার্থী

প্রাথমিক বাছাইয়ে ঋণখেলাপির কারণে ৮২ জন প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করেছিলেন রিটার্নিং কর্মকর্তারা। এর মধ্যে বিএনপির মনোনীত একজন ও স্বতন্ত্র ২ জন এবং জামায়াতের ২ জন ছিলেন। চূড়ান্ত শুনানি শেষে জামায়াতের ওই দুই প্রার্থী মনোনয়ন ফিরে পান। তবে বিএনপির তিন প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল বহালই থাকে।

মনোনয়ন বাতিল বহাল রাখা বিএনপির তিনজন হলেন- যশোর-৪ আসনের টিএস আইয়ুব, কুমিল্লা-১০ আসনের মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া এবং চট্টগ্রাম-১১ এর একেএম আবু তাহের।

এর মধ্যে টিএস আইয়ুব এর মালিকানাধীন সাইমেন্স লেদার প্রডাক্টস ঢাকা ব্যাংকের খেলাপি এবং মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার দুটি প্রতিষ্ঠান ব্যাংক এশিয়ার খেলাপি। তবে এই তিন আসনে বিএনপি বিকল্প দুই প্রার্থী বাছাইয়ে টিকে গেছে। যশোর-৪ আসনে মতিয়ার রহমান ফরাজী ও চট্টগ্রাম-১১ আসনে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর মনোনয়ন বৈধ হয়েছে। তবে দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে কুমিল্লা-১০ আসনের আরেক প্রার্থী মো. আবদুল গফুর ভূঁইয়ার মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে।

অন্যদিকে মনোনয়ন ফিরে পাওয়া জামায়াতের দুই প্রার্থী হলেন, যশোর-২ আসনের মোহাম্মদ মোসলেহ উদ্দিন ও ঢাকা-২ আসনের মো. আব্দুল হক।

মোসলেহ উদ্দিনের মনোনয়ন ২৫ বছর আগের বন্ধ একটি ক্রেডিট কার্ডের ৩০ হাজার টাকার বিল সংক্রান্ত জটিলতার কারণে প্রাথমিকভাবে বাতিল হয়েছিল। তিনি পরে ওই অর্থ পরিশোধ করেন। নির্ধারিত সময়ের পরে কাগজপত্র জমা দেওয়ায় রিটার্নিং কর্মকর্তা তা আমলে নেননি। আপিলের পর নির্বাচন কমিশন তার মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করে।

ঢাকা-২ আসনের প্রার্থী মো. আব্দুল হকের মনোনয়ন বাতিল হয়েছিল সিআইবি প্রতিবেদনে তাকে ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক দেখানোর কারণে। তিনি জানান, ২০১২ ও ২০১৩ সালে তিনি ওই প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ছিলেন, পরে পদত্যাগ করেন এবং বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। আপিলের পর গত ১৩ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশন তার মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করে।