২০২৬–২৭ অর্থবছর, সম্ভাব্য বাজেট, ৯ লাখ কোটি টাকা
২০২৬–২৭ অর্থবছরে সম্ভাব্য বাজেটে থাকছে স্থানীয় ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার লক্ষ্যমাত্রা।   ছবি: আরটিএনএন

আসন্ন ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটকে সামনে রেখে বড় ধরনের পরিকল্পনা করছে সরকার। স্থানীয় ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার মানসে আসছে বাজেটের আকার হতে পারে প্রায় ৯ লাখ কোটি টাকা। যেখানে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা সহজ করা, কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার দিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ধরা হচ্ছে ৮ লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকা। যা চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তুলনায় ৯৩ হাজার কোটি টাকা বেশি। তবে এ সংখ্যা এখনো চূড়ান্ত নয়। শেষ মুহূর্তে পরিবর্তন আসতে পারে।

অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যেই ত্রিপক্ষীয় আলোচনা চলছে। তবে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে বাজেটের কাঠামোতেও পরিবর্তন হতে পারে।

এদিকে দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়তে থাকায় তা অর্থনীতির জন্য চাপ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, শিক্ষাকে আরও কর্মমুখী করা গেলে দক্ষ জনশক্তি তৈরি হবে এবং এই সমস্যা অনেকটাই কমে আসবে। এতে যুবসমাজ যেমন সঠিক পথে থাকবে, তেমনি দেশে ও বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে। তাই আগামী বাজেটে এ খাতকে গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে।

দারিদ্র্য কমানো, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি, নারী ও শিশু উন্নয়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সহায়ক খাতগুলোতেও বরাদ্দ বাড়ানোর চিন্তা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে এমন প্রকল্প নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, যা সরাসরি সরকারের কৌশলগত লক্ষ্য পূরণে সহায়তা করবে।

সূত্র জানায়, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে থোক বরাদ্দ না রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে। বাজেটকে শুধু ব্যয় বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব উন্নয়নে কাজে লাগানোর দিকেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে বাজেটের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে ধরা হচ্ছে, যাতে মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ সহনীয় থাকে।

প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ব্যয় ধরা হতে পারে ৮ লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হতে পারে ৬ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৯ দশমিক ৪ শতাংশ। এর মধ্যে রাজস্ব খাত থেকে ৫ লাখ ৭১ হাজার কোটি টাকা এবং নন-ট্যাক্স রেভিনিউ খাত থেকে ৬৫ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য থাকতে পারে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হতে পারে ৫ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা। কর বহির্ভূত রাজস্ব হতে পারে ২১ হাজার কোটি টাকা।

বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) নির্ধারণ করা হতে পারে ২ লাখ ৫৩ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় ২৩ হাজার কোটি টাকা বেশি।

আগামী বাজেটে মোট ঘাটতি ধরা হতে পারে ২ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা বা জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। এই ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ২ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা হতে পারে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা। পাশাপাশি বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হতে পারে।

আগামী অর্থবছরের জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হতে পারে ৬ শতাংশ। মোট জিডিপির আকার দাঁড়াতে পারে ৬৮ লাখ ৭০৭ কোটি টাকা, যা মার্কিন ডলারে প্রায় ৫৪৪ বিলিয়ন।

স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি, অপচয় ও প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হচ্ছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দক্ষিণ এশিয়ার তুলনায় এ খাতে বরাদ্দও কম। তাই ব্যক্তিগত ব্যয় কমাতে বরাদ্দ বাড়ানো এবং কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হতে পারে।

শিক্ষা খাতে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী জিডিপির ৪ দশমিক ৬ শতাংশ বরাদ্দ প্রয়োজন হলেও বর্তমানে সেটা ২ থেকে ২ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এটিকে দক্ষ মানবসম্পদ গঠনের বড় বাধা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফলে এ খাতে বরাদ্দ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সব দিক বিবেচনায়, আসন্ন বাজেটকে অর্থনীতির পুনরুদ্ধারমুখী একটি উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে বাস্তবায়ন সক্ষমতা বাড়ানো, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করাই সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের দুর্বলতা বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। বাজেটে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় অনেক সময় সম্ভব হয় না, ফলে উন্নয়ন ব্যয় ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় চাপ তৈরি হয়।

তিনি আরও বলেন, দেশের পূর্ববর্তী ঋণ এবং বর্তমান জ্বালানি সমস্যার কারণে নতুন করে ঋণ নিয়ে অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়া চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। মূল্যস্ফীতি বর্তমানে যে পর্যায়ে রয়েছে, আগামীতে তার থেকেও বাড়তে পারে।

তবে বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব ঘাটতি মোকাবিলা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন সিপিডি নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট নবনির্বাচিত সরকারের প্রথম বাজেট হতে যাচ্ছে। এমন এক সময়ে এই বাজেট প্রণয়ন করা হচ্ছে, যখন দেশের অর্থনীতি অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। অর্থনীতি উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আহরণের ধীরগতি, বাজেট বাস্তবায়নে দুর্বলতা, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ, নিম্ন বিনিয়োগ এবং সীমিত কর্মসংস্থানের মতো নানা সমস্যার সম্মুখীন। পাশাপাশি আর্থিক খাতের অস্থিরতা এবং রপ্তানি প্রবৃদ্ধির শ্লথগতিও অর্থনীতির জন্য অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে। একই সঙ্গে আগামী সময়ে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা (এলডিসি) থেকে উত্তরণের বিষয়টিও একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে রয়েছে। ফলে এই পরিস্থিতিতে নীতিনির্ধারকদের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।

ড. ফাহমিদা খাতুনের মতে, নতুন সরকারের জন্য এই বাজেট একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। এর মাধ্যমে তারা নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের সূচনা করতে পারে এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে কার্যকর নেতৃত্ব প্রদর্শন করতে পারে। তবে এসব লক্ষ্য অর্জনে একটি বিশ্বাসযোগ্য ও সুসংগঠিত রাজস্ব কাঠামো গড়ে তোলা অপরিহার্য।