যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরুর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বিশ্ব রাজনীতিতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে তার পররাষ্ট্রনীতির নতুন ও আক্রমণাত্মক রূপরেখা। ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে এক নাটকীয় ও ঝটিকা অভিযানে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে অপহরণ করে যুক্তরাষ্ট্রে বিচারের মুখোমুখি করার ঘটনা শুধু লাতিন আমেরিকাই নয়, গোটা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
এই অভিযানের ব্যাখ্যায় ট্রাম্প সরাসরি টেনে এনেছেন ১৮২৩ সালের ঐতিহাসিক মনরো ডকট্রিন, যার মাধ্যমে একসময় পশ্চিম গোলার্ধকে ইউরোপীয় শক্তির হস্তক্ষেপ থেকে দূরে রাখার ঘোষণা দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। তবে এবার ট্রাম্প সেই নীতিকেই নিজের নামে নতুনভাবে উপস্থাপন করে একে অভিহিত করেছেন ‘ডনরো ডকট্রিন’ হিসেবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল নাম পরিবর্তন নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা শক্তি প্রয়োগ ও আধিপত্যবাদী কৌশলের প্রকাশ্য ঘোষণা।
ভেনেজুয়েলা: হুমকি থেকে বাস্তবতায়
কারাকাসের নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেঙে মার্কিন বিশেষ বাহিনীর এই অভিযান ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন পররাষ্ট্রনীতির স্পষ্ট বার্তা বহন করে। দীর্ঘদিন ধরে মাদুরো সরকারের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন, মাদক চোরাচালান ও গণতন্ত্র ধ্বংসের অভিযোগ তুলে আসছিল ওয়াশিংটন। এবার সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই সরাসরি পদক্ষেপ নেয়া হলো।
এই ঘটনার মধ্য দিয়ে ট্রাম্প দেখিয়ে দিলেন তার হুমকি আর কূটনৈতিক ভাষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
গ্রিনল্যান্ড: আর্কটিক দখলের উচ্চাকাঙ্ক্ষা
ভেনেজুয়েলার পর ট্রাম্প প্রশাসনের নজর এখন আর্কটিক অঞ্চলের দিকে। ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডকে নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য ইউরোপে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
ট্রাম্পের ভাষায়, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে আমাদের গ্রিনল্যান্ড দরকার।
বিরল খনিজে সমৃদ্ধ এই দ্বীপ ভবিষ্যতের প্রযুক্তি ও সামরিক শিল্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি বরফ গলে নতুন নৌপথ খুলে যাওয়ার সম্ভাবনাও গ্রিনল্যান্ডকে কৌশলগতভাবে আরও মূল্যবান করে তুলেছে।
ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের নেতারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংযুক্তির প্রস্তাব স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করলেও ট্রাম্পের বক্তব্যে উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে। ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডরিকসেন সতর্ক করে বলেছেন, কোনো ন্যাটো দেশের বিরুদ্ধে সামরিক আগ্রাসন হলে তার পরিণতি হবে ‘ভয়াবহ ও অচলাবস্থার সূচনা’।
কলম্বিয়া: মাদকবিরোধী যুদ্ধের নতুন মোড়
ভেনেজুয়েলার অভিযানের পরপরই ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি গিয়ে পড়ে কলম্বিয়ার দিকে। দেশটির প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোকে প্রকাশ্যে সতর্ক করে ট্রাম্প বলেন, তিনি যেন ‘নিজের দিকে খেয়াল রাখেন’।
কলম্বিয়া দীর্ঘদিন ধরেই কোকেন উৎপাদন ও পাচারের সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ট্রাম্প প্রশাসন অভিযোগ করছে, পেত্রো সরকার মাদক চোরাকারবার দমনে ব্যর্থ হচ্ছে। এমনকি সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের প্রশ্নে ট্রাম্পের মন্তব্য- ‘আমার কাছে ভালোই শোনাচ্ছে’ ওয়াশিংটন-বোগোতা সম্পর্ককে নতুন করে টানাপোড়েনে ফেলেছে।
ইরান: ডনরো ডকট্রিনের বাইরেও চাপ
যদিও ইরান ভৌগোলিকভাবে ‘ডনরো ডকট্রিন’-এর আওতায় পড়ে না, তবুও ট্রাম্প প্রশাসনের অন্যতম প্রধান টার্গেট তেহরান। সরকারবিরোধী বিক্ষোভ, মানবাধিকার পরিস্থিতি ও পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি আরও জোরালো হয়েছে।
ট্রাম্প স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘যদি তেহরান মানুষ হত্যা শুরু করে, যুক্তরাষ্ট্র কঠোরভাবে আঘাত করবে’।
ইসরায়েলের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাত এবং ভবিষ্যৎ হামলার ইঙ্গিত ইরান সংকটকে আরও গভীর করে তুলছে।
মেক্সিকো: সীমান্তের ছায়াযুদ্ধ
মাদক ও অবৈধ অভিবাসন ইস্যুতে মেক্সিকোর ওপর ট্রাম্পের চাপ নতুন কিছু নয়। তবে দ্বিতীয় মেয়াদে এসে তার বক্তব্য আরও কড়া হয়েছে। সীমান্ত দেয়াল, চোরাচালান দমন, এমনকি সামরিক হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত সবই ফিরে এসেছে নতুন করে।
মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাম স্পষ্ট ভাষায় যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো সামরিক পদক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করলেও উত্তেজনা প্রশমিত হয়নি।
কিউবা: পতনের অপেক্ষায়?
ভেনেজুয়েলার ঘনিষ্ঠ মিত্র কিউবাকে নিয়ে ট্রাম্প তুলনামূলকভাবে নীরব হলেও উদ্বেগ কাটেনি। ট্রাম্পের মতে, দেশটি এমনিতেই অর্থনৈতিকভাবে ভেঙে পড়ছে, তাই সরাসরি হস্তক্ষেপের দরকার নেই।
তবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও’র বক্তব্য ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে। তার ভাষায়, ‘প্রেসিডেন্ট যখন কথা বলেন, সেটাকে হালকাভাবে নেয়ার সুযোগ নেই’।
নতুন বাস্তবতা
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভেনেজুয়েলার ঘটনা প্রমাণ করেছে ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতিতে হঠাৎ সিদ্ধান্ত, শক্তি প্রয়োগ ও একতরফা পদক্ষেপ এখন ব্যতিক্রম নয়, বরং নতুন বাস্তবতা।
‘ডনরো ডকট্রিন’ কেবল একটি নীতি নয়; এটি ট্রাম্পের বিশ্বদর্শনের প্রতিফলন যেখানে কূটনীতি নয়, শক্তিই শেষ কথা। বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে ভেনেজুয়েলার পর পরবর্তী লক্ষ্য কোথায়।
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!