মাত্র আট মাস আগেও জাপানের ক্ষমতাসীন দল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) রাজনৈতিক বিপর্যয়ের খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে ছিল। ১৫ মাসের ব্যবধানে দ্বিতীয়বার সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানো, দীর্ঘদিনের তহবিল তছরুপের কেলেঙ্কারি এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইশিবার বিরুদ্ধে দলের অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ছিল নাজুক।
কিন্তু আগামী রোববার জাপানে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া নিম্নকক্ষের নির্বাচনে কনকনে শীত উপেক্ষা করে ভোটাররা যখন ভোট দিতে প্রস্তুত, তখন চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ধারণা করা হচ্ছে, এলডিপি নির্বাচনে এক বিশাল ও ঐতিহাসিক জয় পেতে যাচ্ছে। গত বছরের হতাশা কাটিয়ে দলের এই অভাবনীয় ঘুরে দাঁড়ানোর কৃতিত্ব মূলত একজন নারীর—তিনি সানায়ে তাকাইচি।
গত বছরের অক্টোবরে যখন এলডিপির রক্ষণশীল অংশ ইশিবাকে সরিয়ে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের আয়োজন করে, তখন অনেকেই ভেবেছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর তরুণ ও সুদর্শন পুত্র শিনজিরো কোইজুমিই জয়ী হবেন। কিন্তু গত সাত দশক ধরে জাপানের ক্ষমতায় থাকা দলটি এক বড় বাজি ধরে। তারা কোইজুমিকে বাদ দিয়ে বেছে নেয় কট্টর রক্ষণশীল সানায়ে তাকাইচিকে, এবং তাকে জাপানের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অধিষ্ঠিত করে। জনমত জরিপ যদি সঠিক হয়, তবে সেই বাজি এমনভাবে কাজে লেগেছে যা তার চরম সমর্থরাও হয়তো কল্পনা করেননি।
গত চার মাসে তাকাইচির সময়টা ছিল বেশ ঘটনাবহুল। তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন, যিনি তাকে সমর্থন দেওয়ার পাশাপাশি মার্চে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণের প্রস্তাব দিয়েছেন। এছাড়া তিনি শি জিনপিং এবং দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জা-মিউংয়ের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন।
অবশ্য বিতর্কও পিছু ছাড়েনি। তাইওয়ানের ভবিষ্যৎ নিয়ে বেইজিংয়ের সঙ্গে অমীমাংসিত বিবাদে জড়িয়েছেন, ব্যাপক কর হ্রাসের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বন্ড মার্কেটে অস্থিরতা তৈরি করেছেন এবং বিতর্কিত ইউনিফিকেশন চার্চের সঙ্গে তার সম্পর্কের কারণে নতুন করে সমালোচনার মুখে পড়েছেন। উত্থান-পতন সত্ত্বেও তাকাইচি এখন এলডিপির সবচেয়ে কার্যকরী রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হয়েছেন। তার পোশাক নির্বাচন থেকে শুরু করে ট্রেন ভ্রমণের নাস্তা, এমনকি সংসদে নোট নেওয়ার জন্য ব্যবহৃত গোলাপি কলম—সবকিছু নিয়েই জাপানে তৈরি হয়েছে এক ধরনের ব্যক্তিপূজা বা কাল্ট। যাকে বলা হচ্ছে ‘সানা-ম্যানিয়া’।
সাম্প্রতিক জনমত জরিপ বলছে, ৪৬৫ আসনের নিম্নকক্ষে এলডিপি এবং তাদের জোটসঙ্গী ‘জাপান ইনোভেশন পার্টি’ ৩০০টিরও বেশি আসনে জয়লাভ করতে যাচ্ছে। এর ফলে তারা দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে। অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল বড় ধরনের ভরাডুবির আশঙ্কায় রয়েছে। মার্গারেট থ্যাচারের ভক্ত ৬৪ বছর বয়সী তাকাইচি জাপানি নারীবাদ বা জেন-জি প্রজন্মের স্বাভাবিক মিত্র নন। তিনি রাজপরিবারের নারীদের সিংহাসনে বসার বিরোধী এবং দম্পতিদের একই উপাধি (সাধারণত স্বামীর) ব্যবহারের পক্ষে। সুমো রেসলিংয়ের মতো শতবছরের ঐতিহ্যে হাত দিতেও তিনি নারাজ।
তবুও সোশ্যাল মিডিয়ায় এক চতুর প্রচারণার মাধ্যমে তিনি তরুণ ভোটারদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন। তিনি নিজেকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যা জাপানের প্রথাগত রাজনীতিতে বিরল—তিনি কোনো বংশানুক্রমিক পুরুষ রাজনীতিবিদ নন, যিনি মনে করেন শাসন করা তার জন্মগত অধিকার।
টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ইউইকো ফুজিতা বলেন, "এতদিন জাপানের রাজনীতি বয়োজ্যেষ্ঠ পুরুষদের দখলে ছিল। একজন নারীকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখা এবং যার পটভূমি অন্যদের চেয়ে আলাদা—এটি মানুষের মনে পরিবর্তনের অনুভূতি তৈরি করছে।"
একজন পুলিশ মা এবং গাড়ি কোম্পানির কর্মচারী বাবার সন্তান তাকাইচি নিজেকে সাধারণ পরিবারের প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরেন। টোকিওতে এক প্রচারণায় তিনি অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে পার্লারে চুল কাটার খরচ নিয়ে কথা বলেন, যা সাধারণ মানুষকে স্পর্শ করেছে। তিনি গভীর রাত পর্যন্ত মদ্যপান বা দামি রেস্তোরাঁ এড়িয়ে চলেন, যা তার পূর্বসূরি পুরুষ নেতাদের চেয়ে তাকে আলাদা করেছে। তাকাইচির জনপ্রিয়তার আঁচ পাওয়া যায় সোশ্যাল মিডিয়ায়। তার ব্যবহৃত ৯০০ ডলারের কালো চামড়ার হ্যান্ডব্যাগটি মার্কেট থেকে সোল্ড আউট হয়ে গেছে। জাপানে মোতায়েন মার্কিন সেনাদের উদ্দেশ্যে হাত নাড়ানো, কে-পপ গানের তালে ড্রাম বাজানো কিংবা জর্জিয়া মেলোনির জন্মদিনে ইতালীয় ভাষায় গান গাওয়ার ভিডিওগুলো তাকে তরুণদের কাছে জনপ্রিয় করে তুলেছে।
এক্স-এ (সাবেক টুইটার) তার অনুসারীর সংখ্যা ২৬ লাখের বেশি, যেখানে বিরোধী নেতার অনুসারী মাত্র ৬৪ হাজার। মানা সুজুকি নামের এক তরুণ ভোটার বলেন, "আমি রাজনীতি নিয়ে খুব একটা ভাবি না, কিন্তু ইউটিউবে সব সময় তাকাইচির ভিডিও আসে। আর কমেন্ট বক্সে তার কোনো সমালোচনাই থাকে না।" ব্যক্তিগত ইমেজের ওপর ভর করে তৈরি হওয়া এই ‘সানা-ম্যানিয়া’ তাকে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, দুর্বল ইয়েন এবং চীন ও উত্তর কোরিয়ার মতো নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলার রাজনৈতিক শক্তি জোগাবে। তবে ঝুঁকিও আছে। খাদ্যের ওপর থেকে ৮ শতাংশ কর সাময়িক প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি সাধারণ পরিবারগুলোকে কতটা স্বস্তি দেবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
তবুও গত মাসে আগাম নির্বাচন ডাকার সময় তাকাইচি বলেছিলেন, তিনি দেশ চালানোর যোগ্য কি না, তা জনগণকে ঠিক করতে দেওয়া উচিত। আগামী রোববারের নির্বাচনে জাপানের ভোটাররা সম্ভবত এক বিশাল ‘হ্যাঁ’ ধ্বনিতেই তার জবাব দিতে চলেছেন।
সূত্র : দা গার্ডিয়ান
আরটিএনএন/এআই
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!