জামায়াতে ইসলামী, নির্বাচন, শফিকুর রহমান
জামায়াতের বর্তমান অগ্রযাত্রা সত্যিই বিস্ময়কর, বিশেষত গত ১৮ মাসে!   ছবি: সংগৃহীত

হাসিনা সরকারের পতনের পর সম্ভবত সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং অপ্রত্যাশিত ঘটনা হল গত ১৮ মাসে জামায়াতে ইসলামীর জনসমর্থন বৃদ্ধি। ইসলামপন্থী এই দলটির উত্থান এতটাই নাটকীয় যে, অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট বিজয়ী হিসেবেও আবির্ভূত হতে পারে। যদিও সাম্প্রতিক জরিপগুলোতে দেখা যাচ্ছে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে পারে।

এই পরিবর্তনের মাত্রা কোনোভাবেই অবমূল্যায়ন করা উচিত নয়। আওয়ামী লীগের শাসনামলের শেষ বছরগুলোতে জামায়াত এতটাই কোণঠাসা ও দমন-পীড়নের শিকার ছিল যে, একটি রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে তাদের কার্যক্রম চালানোই কঠিন ছিল। তাদের অনেক শীর্ষ নেতা কারাগারে ছিলেন এবং দলটি কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যে কার্যত গোপনে পরিচালিত হতো। ঐতিহাসিকভাবে, জামায়াত কখনোই গণভিত্তিসম্পন্ন বিশাল নির্বাচনী শক্তি ছিল না। জেনারেল এরশাদের পতনের পরবর্তী নির্বাচনগুলোতে তাদের ভোটের হার কখনোই ১২ শতাংশ অতিক্রম করেনি, যা তারা ১৯৯১ সালে সর্বোচ্চ পর্যায়ে দেখেছিল। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল বাংলাদেশের জন্মের সময় থেকেই দলটির ওপর থাকা কলঙ্ক, যা মূলত ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সমর্থন এবং গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধের অভিযোগ থেকে উদ্ভূত।

এই প্রেক্ষাপটে, জামায়াতের বর্তমান অগ্রযাত্রা সত্যিই বিস্ময়কর! দলটিকে সমর্থন না করে—কিংবা তাদের বিরুদ্ধে থাকা যৌক্তিক সমালোচনাগুলোকে উপেক্ষা না করেও—তাদের এই অভাবনীয় উত্থানকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়? নিচে কোনো বিশেষ ক্রম অনুসরণ না করেই এর আটটি সম্ভাব্য কারণ তুলে ধরা হলো:

১৯৭১-এর কলঙ্ক বা নেতিবাচক প্রভাব দুর্বল হয়ে পড়া
জামায়াত তাদের অতীত থেকে পুরোপুরি মুক্তি পায়নি। এখনো ১৯৭১ সালের ভূমিকা নিয়ে তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে হয় এবং প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো ইস্যুটি সামনে নিয়ে আসে। তবে এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, ভোটারদের একটি বড় অংশের কাছে ১৯৭১ সালে জামায়াতের ভূমিকা এখন আর রাজনৈতিকভাবে অযোগ্যতার কারণ নয়।

এই পরিবর্তনের পেছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, ১৯৭১ সালের অপরাধে অভিযুক্ত জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের বিচার ও দণ্ড কার্যকর হয়েছে আওয়ামী লীগের শাসনামলে, ফলে বর্তমান নেতৃত্বের সাথে সেই ঘটনার সরাসরি কোনো যোগসূত্র নেই। দ্বিতীয়ত, আওয়ামী লীগের পতনের ফলে তাদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বয়ানগুলোর শক্তি কমে গেছে, যার অন্যতম ছিল বারবার জামায়াতের যুদ্ধাপরাধের প্রসঙ্গ টেনে আনা। তৃতীয়ত, একটি ক্রমবর্ধমান ও প্রভাবশালী তরুণ প্রজন্মের কাছে ১৯৭১ সালটি অনেক দূরের, বিমূর্ত এবং তাদের বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উদ্বেগের তুলনায় কম প্রাসঙ্গিক মনে হয়।

বিএনপির বিপরীতে জামায়াতের স্বচ্ছ ভাবমূর্তি
জামায়াতের জনপ্রিয়তা বাড়ার পেছনে সবচেয়ে বেশি যে কারণটি বলা হয়, তা হলো দুর্নীতির সঙ্গে তাদের দূরত্বের ধারণা। হাসিনা সরকারের পতনের পর অনেক বাংলাদেশী আশা করেছিলেন যে, তৃণমূল পর্যায়ে ক্ষমতাসীন দলের কর্মীদের নিয়মতান্ত্রিক চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের অবসান ঘটবে। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টের পর, আগে যেসব চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ক আওয়ামী লীগ নিয়ন্ত্রণ করত, তা দ্রুত বিএনপি-ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীগুলোর দখলে চলে যায়। প্রকৃত পরিবর্তনকামী ভোটারদের কাছে এই এই ধারণা পোক্ত করে যে, কার্যত বিএনপি তার পূর্বসূরিদের চেয়ে খুব একটা আলাদা নয়।

তাদের দৃষ্টিতে জামায়াত ছিল ব্যতিক্রম। তৃণমূল পর্যায়ে জামায়াত পরিচালিত কোনো চাঁদাবাজি বা সংগঠিত দুর্নীতির ব্যাপক অভিযোগ শোনা যায়নি। মানুষের মনে এই পার্থক্যটি একটি গভীর কাঠামোগত ভিন্নতার ইঙ্গিত দেয়। তৃণমূলের অনেক বিএনপি কর্মী সম্ভবত এই আশায় দল করেন যে, ক্ষমতায় গেলে আর্থিক সুবিধা পাওয়া যাবে। বিপরীতে, জামায়াত কর্মীরা দল থেকে টাকা নেওয়ার বদলে দলকে চাঁদা বা অর্থ সহায়তা দিয়ে থাকেন। রাজনীতিকে তারা ব্যক্তিগত সম্পদ গড়ার মাধ্যম হিসেবে দেখেন না—এই ধারণাটি অনেক হতাশ ভোটারের মনে শক্তিশালী প্রভাব ফেলেছে।

জনকল্যাণমুখী রাজনীতি
আওয়ামী লীগের পতনের পর শত-শত পরিবার তাদের স্বজনদের হারিয়ে শোকাতুর ছিল এবং হাজার হাজার মানুষ গুরুতর আহতদের সেবায় ব্যস্ত ছিল। জামায়াত নিয়মতান্ত্রিকভাবে এই পরিবারগুলোকে খুঁজে বের করে এবং যথাসম্ভব সরাসরি সহায়তা প্রদান করে। জানা যায়, তারা প্রতিটি নিহত পরিবারকে অন্তত ১ লাখ টাকা এবং অনেক আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে গিয়ে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে।

যদিও বিএনপির নেতারাও ব্যক্তিগতভাবে কিছু ক্ষেত্রে সহায়তা করেছেন, কিন্তু তাদের প্রচেষ্টা জামায়াতের মতো এত ব্যাপক বা সমন্বিত ছিল না। জামায়াতের এই পদক্ষেপ তাদের একটি সুশৃঙ্খল সংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে, যারা নিজেদের সম্পদকে বাস্তব সহায়তায় রূপান্তর করতে পারে। এই ধরনের জনকল্যাণমুখী রাজনীতি—যা দানশীল, দৃশ্যমান এবং সংগঠিত—দীর্ঘদিন ধরেই জামায়াতের কৌশলের একটি ভিত্তি এবং এটি তাদের জন্য উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক সুনাম বয়ে আনছে।

সাংগঠনিক শৃঙ্খলা
জামায়াত তাদের সাংগঠনিক শক্তির সুফল পেয়েছে। আওয়ামী লীগের পতনের পরপরই তারা নির্বাচনের জন্য জোরে-শোরে প্রস্তুতি শুরু করে। তাদের সুশৃঙ্খল অভ্যন্তরীণ কাঠামোর কারণে প্রচারণাও অনেক বেশি কার্যকর হয়েছে, বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ে। জামায়াত সরাসরি ভোটারদের সাথে সংযোগ স্থাপনে বা ‘ফেস-টু-ফেস’ এনগেজমেন্টে প্রচুর বিনিয়োগ করেছে, যার মধ্যে রয়েছে গ্রামীণ এলাকায় ‘ডোর-টু-ডোর’ বা ঘরে ঘরে গিয়ে জনসংযোগ। বড় সমাবেশ বা মিডিয়া-নির্ভর প্রচারণার চেয়ে এই কৌশল ভোটারদের ওপর অনেক বেশি প্রভাব ফেলতে পারে।

উদার নমনীয় অবস্থান তুলে ধরা
জামায়াতে ইসলামী মূলত একটি ইসলামপন্থী দল, যাদের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য বাংলাদেশে ইসলামি আইন প্রবর্তন করা। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দলটি সচেতনভাবেই নিজেদের একটি উদার ও মধ্যপন্থী ভাবমূর্তিতে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছে। ধর্মীয় এজেন্ডাকে সামনে না এনে, তারা দুর্নীতি দমন, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা এবং সুশাসনের মতো বাস্তবসম্মত সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছে।

এই অবস্থান পরিবর্তনের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ দেখা যায় ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে দলের নীতি নির্ধারণী সম্মেলনে আমির ডা. শফিকুর রহমানের দেওয়া ‘অ্যাসপায়ারিং বাংলাদেশ’ শীর্ষক ভাষণে। লক্ষণীয়ভাবে, সেই ভাষণে ধর্মের কোনো উল্লেখ ছিল না। এর পরিবর্তে, শফিকুর রহমান জামায়াতকে ‘মূলধারার মুসলিম ডেমোক্র্যাট’ হিসেবে অভিহিত করেন, যেখানে তাত্ত্বিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার চেয়ে গণতান্ত্রিক বৈধতার ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছে।

যদিও এই ভাষণটি হয়তো অংশত বিদেশি কূটনীতিকসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কথা মাথায় রেখে তৈরি করা হয়েছিল, তবুও এটি অভ্যন্তরীণভাবে জামায়াতের নিজেকে উপস্থাপনের কৌশলে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। এই ‘রিব্রান্ডিং’ বা নতুন পরিচয়, পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য হোক বা না হোক, এটি নিঃসন্দেহে দলটিকে তরুণ ও শহুরে ভোটারদের কাছে টানতে সাহায্য করেছে, অন্যথায় যারা ধর্মীয় দলগুলোর ব্যাপারে সতর্ক থাকত।

নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং নির্বাচন কমিশন কর্তৃক আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করার সিদ্ধান্তটিও জামায়াতের পক্ষে কাজ করতে পারে। ঐতিহাসিকভাবে, যখন ব্যালটে আওয়ামী লীগ থাকে, তখন জামায়াত হয় স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করে অথবা বিএনপির সাথে জোট বাঁধে। স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করলে আ.লীগ বিরোধী ভোটের বড় অংশ বিএনপির বাক্সে যায়। আর বিএনপির সাথে জোট করলে জামায়াত খুব অল্প সংখ্যক আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে।

কিন্তু আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এই সমীকরণ পাল্টে গেছে। যেসব ভোটার আগে মূলত আওয়ামী লীগের বিজয় ঠেকাতে বিএনপিকে ভোট দিতেন, তারা এখন নির্দ্বিধায় জামায়াতকে সমর্থন দিতে পারেন। কারণ, এখন তাদের ভোট অসাবধানতাবশত আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনতে সহায়তা করবে—এমন কোনো ভয় আর নেই।

ভারতবিরোধী মনোভাব
আওয়ামী লীগের শাসনামলে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব ক্রমশ দানা বেঁধেছে। সীমান্তে হত্যা, ভারতীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বাংলাদেশিদের নিয়ে উসকানিমূলক মন্তব্য এবং আওয়ামী লীগের প্রতি ভারত সরকারের অন্ধ সমর্থনের ধারণা—এসবই এর কারণ। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং শেখ হাসিনার ভারতে পলায়নের পর, ভারতের কথিত ‘আধিপত্যবাদ’-এর বিরুদ্ধে জনমনে ক্ষোভ তীব্র হয়েছে এবং মানুষ এখন এসব নিয়ে খোলাখুলি কথা বলতে পারছে।

এই প্রেক্ষাপটে, কিছু ভোটার মনে করেন, ভারতের প্রভাব মোকাবিলায় বিএনপির চেয়ে জামায়াত অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য শক্তি। কারণ বিএনপিকে ভারতের ব্যাপারে প্রায়শই অনেক বেশি বাস্তববাদী এবং কম সংঘাতপূর্ণ মনে করা হয়। ফলে, যাদের কাছে ভারতের আধিপত্য বিরোধিতা একটি কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক বিষয়, তাদের সমর্থন জামায়াতের দিকে ঝুঁকতে পারে।

পরিবর্তনকামী’ দল হিসেবে জামায়াত
আওয়ামী লীগের পতনের পর জনগণের মধ্যে পরিবর্তনের ব্যাপক আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল—স্বৈরাচার, দীর্ঘদিনের দুর্নীতি এবং যাকে অনেকে দেশের ‘পুরনো ক্লান্তিকর রাজনীতি’ বলে অভিহিত করেছেন, তা থেকে মুক্তি। বিএনপি এবং জামায়াতের মধ্যকার রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে, কিছু ভোটারের কাছে জামায়াতই সেই নতুনের বা নবজাগরণের প্রতীক হিসেবে বেশি গ্রহণযোগ্য।

জামায়াতকে প্রায়শই একটি ‘আউটসাইডার’ বা প্রথাগত ক্ষমতার বাইরের দল হিসেবে দেখা হয়, যারা দেশের রাজনীতিতে জেঁকে বসা দুর্নীতি ও তোষণ-নীতির জালের গভীরে প্রোথিত নয়। দলটির নেতৃত্ব কোনো রাজনৈতিক পরিবারতন্ত্র বা উত্তরাধিকার সূত্রে আসেনি, যা তাদের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক অভিজাতদের থেকে আলাদা করে। তাছাড়া বিএনপির মতো জামায়াতের সরকার পরিচালনার এমন কোনো অতীত রেকর্ড নেই যা ভোটাররা নেতিবাচকভাবে মনে রেখেছেন। অতীতের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করতে চাওয়া ভোটারদের কাছে এই বিষয়গুলো জামায়াতের পক্ষে কাজ করছে।

তদুপরি, বিএনপি যেখানে জুলাইয়ের ‘জাতীয় সনদ’-এর সংস্কার প্রস্তাবগুলোর বিষয়ে কিছুটা সতর্ক ও রক্ষণশীল অবস্থান নিয়েছে, সেখানে জামায়াত অনেক বেশি উৎসাহী মনোভাব দেখিয়েছে। ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) সাথে জামায়াতের সাম্প্রতিক জোট সংস্কার ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের সাথে তাদের সম্পৃক্ততাকে আরও জোরদার করেছে, যা রূপান্তরকামী মানুষের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে।

সূত্র : দা ডেইলি স্টার

আরটিএনএন/এআই