চাঁদা।
রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে চাঁদা আদায় করছে চাঁদাবাজরা।   ছবি: আরটিএনএন

৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশেই যে ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা দ্রুতই ভেঙে পড়ে। ক্ষমতার শূন্যতার সুযোগ নিয়ে ৬ আগস্ট সকাল থেকেই সংঘবদ্ধ দখলদার চক্র আবার সক্রিয় হয়ে রাস্তা, ফুটপাত ও জনপরিসর পুনর্দখল শুরু করে। দুর্নীতি ও চাঁদাবাজিমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন স্থায়ী না হওয়ায় কারা এই দখলদার, কীভাবে তারা সংগঠিত, কারা নেপথ্যে নিয়ন্ত্রণ করছে এবং প্রতিদিনের চাঁদার অর্থ কোন স্তর পেরিয়ে কোথায় পৌঁছায়—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গত এক মাস ধরে রাজধানীর চারটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে অনুসন্ধান চালায় আরটিএনএন টিম। সেই অনুসন্ধানে দখলদার চক্রের কাঠামো, অর্থ আদায়ের পদ্ধতি ও বণ্টনের পূর্ণ চিত্র উঠে এসেছে, যার দ্বিতীয় পর্ব আজ প্রকাশ করা হলো।

রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও আদাবর—ঢাকার দুটি ঘনবসতিপূর্ণ ও বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। অথচ এই এলাকাগুলোতেই দিনের পর দিন গড়ে উঠেছে একটি সুসংগঠিত চাঁদাবাজি নেটওয়ার্ক, যা স্থানীয়দের ভাষায় ‘জমিদারি প্রথা’র আদলে পরিচালিত হচ্ছে। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ভ্যান ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক, ভবন নির্মাণকারী এমনকি বাসাবাড়ির বাসিন্দারাও এই চক্রের বাইরে নন।

চাঁদাবাজির অদৃশ্য শেকল
স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মোহাম্মদপুর ও আদাবরে ব্যবসা পরিচালনা বা বাড়ি নির্মাণ করতে গেলে চাঁদা দেওয়া কার্যত বাধ্যতামূলক। পরিবহন খাত থেকে শুরু করে বর্জ্য সংগ্রহের নামেও নিয়মিত অর্থ আদায় করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, চাঁদাবাজদের দাপটে অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না।

সরকার বদলায়, চাঁদাবাজি টিকে থাকে
সরকার পরিবর্তন হলেও রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় চাঁদাবাজি বন্ধ হয় না—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বরং ক্ষমতার পালাবদলের পর নিয়ন্ত্রণের হাতবদল ঘটে, আরও সংগঠিতভাবে চাঁদাবাজি শুরু হয়। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে হামলা, মারধর এমনকি খুন-জখমের ঘটনাও ঘটছে বলে জানান স্থানীয়রা।

‘ডন’ কাঠামো ও রাজনৈতিক আশ্রয়
অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রতিটি ওয়ার্ড বা এলাকায় একজন করে ‘ডন’ নিয়োগ দিয়ে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এসব ডনের পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক গডফাদার। সামাজিক, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক ক্লাবগুলোকে ব্যবহার করে গড়ে তোলা হয়েছে এই অপরাধ নেটওয়ার্ক, যার অধীনে সক্রিয় ছোট-বড় গ্রুপ ও কিশোর গ্যাং।

নিয়ন্ত্রণের হাতবদল
একসময় এই এলাকাগুলোতে শীর্ষ সন্ত্রাসী জোসেফ–হারিসের ভাতিজা ও তৎকালীন ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আসিফ আহমেদের প্রভাব ছিল। তার আগে কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান রাজিবের নাম ছিল আলোচনায়, যার পেছনে তৎকালীন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের আশীর্বাদ থাকার অভিযোগ স্থানীয়দের।

২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অধিকাংশ এলাকায় চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ চলে যায় বিএনপি সংশ্লিষ্ট নেতাদের হাতে—এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে। বর্তমানে পিচ্চি হেলাল ও ক্যাপ্টেন ইমনকে কেন্দ্র করে এই চক্র পরিচালিত হচ্ছে বলে স্থানীয়দের দাবি।

কারা কোথায় নিয়ন্ত্রণে
অনুসন্ধানে জানা যায়, পিচ্চি হেলালের হয়ে ৩২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি সভাপতি বেলাল আহমেদ, যুবদল নেতা জাহিদ মোড়ল এবং ‘শুটার পাপ্পু’ নামে পরিচিত এক ব্যক্তি বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করেন। টাউন হল, লালমাটিয়া, কৃষি মার্কেটের একাংশ ও আদাবরের কিছু এলাকা তাদের আওতায় রয়েছে। অন্যদিকে ক্যাপ্টেন ইমনের হয়ে মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড ও আশপাশের এলাকায় জসিম নামে এক ব্যক্তি সক্রিয়। বর্জ্য বাণিজ্যের আড়ালে ২৯ নম্বর ওয়ার্ডের কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার সম্পৃক্ততার অভিযোগও উঠেছে।

ভ্যান থেকেই কোটি কোটি টাকা
সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র উঠে আসে ভ্যান ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে। তিন রাস্তার মোড় থেকে বেরিবাঁধ এবং শিয়া মসজিদ থেকে শ্যামলী রিং রোড—এই দুটি পয়েন্টেই প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার ভ্যান থেকে গড়ে ৩০০ টাকা করে চাঁদা আদায় হয়। এতে দৈনিক প্রায় ৬ লাখ টাকা, মাসে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ এবং বছরে প্রায় পৌনে ২২ কোটি টাকা আদায় হচ্ছে বলে হিসাব উঠে এসেছে। এক ভ্যান বিক্রেতা ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, আমরা চাঁদা দিই বলেই তো প্রভাবশালীরা বিলাসী জীবনযাপন করে।

পরিবহন ও নির্মাণ খাতেও চাঁদা
পরিবহন শ্রমিকরা জানান, মোহাম্মদপুর থেকে চলাচলকারী বিভিন্ন রুটের যানবাহন থেকেও নিয়মিত চাঁদা নেওয়া হয়। একইভাবে ঢাকা উদ্যান, সাত মসজিদ হাউসিং, বসিলা মডেল টাউনসহ বিভিন্ন এলাকায় ভবন নির্মাণে চাঁদা ছাড়া কাজ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে নিরাপত্তার কারণে কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে চাননি।

বর্জ্য সংগ্রহের নামে চাঁদাবাজি
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, বর্জ্য সংগ্রহের নামে বাসাবাড়িতে রসিদ দিয়ে ইচ্ছামতো অঙ্ক বসিয়ে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, এই অর্থের একটি অংশ রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালীদের কাছে পৌঁছে যায়।

এত বড় পরিসরে চাঁদাবাজি চললেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের মতে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কঠোর আইন প্রয়োগ ছাড়া এই ‘জমিদারি চাঁদাবাজি’ বন্ধ করা সম্ভব নয়। অনুসন্ধান বলছে, মোহাম্মদপুর ও আদাবরের চাঁদাবাজি শুধু অপরাধ নয়—এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থায় রূপ নিয়েছে, যা ভাঙতে হলে প্রয়োজন রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা ও শক্ত হাতে আইন প্রয়োগ।

পর্ব-১: গুলিস্তানে চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ রাজনৈতিক বলয়ের হাতে