কখনো প্রবল আত্মবিশ্বাসী, কখনো অহমিকাপূর্ণ বাগাড়ম্বর! ডোনাল্ড ট্রাম্প মানেই যেন— একদিকে বিতর্ক, অন্যদিকে আগ্রাসী সব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে সংহত করতে চাওয়া—এক অঘটনপটিয়সী রাষ্ট্রনায়ক! আমেরিকার ইতিহাসে গ্রোভার ক্লিভল্যান্ড ছাড়া আর কোনো প্রেসিডেন্ট ক্ষমতা হারানোর চার বছর পর পুনরায় হোয়াইট হাউসে ফিরে আসতে পারেননি। ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বারের মতো শপথ নিলেন, তখন তিনি কেবল সেই ইতিহাসই স্পর্শ করলেন না, বরং নিজেকে প্রমাণ করলেন এক অপ্রতিরোধ্য রাজনৈতিক ফিনিক্স পাখি হিসেবে। অসংখ্য মামলা, ইমপিচমেন্টের মত কলঙ্ক মুছে ফেলে, এই প্রত্যাবর্তন তার আত্মজীবনীতে যোগ করল এক নতুন অধ্যায়, যার নাম হতে পারে— ‘প্রতিশোধ ও পুনর্গঠন’।
ট্রাম্প এই দফায় ক্ষমতায় আরোহণ করেছিলেন কিছু চমকপ্রদ আশ্বাস দিয়ে! আশ্বাসের মান রাখতে, অভিবাসন প্রক্রিয়ায় হাত দিয়েই পরিবর্তনের বার্তা দেন মার্কিনীদের। ২০২৫-২৬ সালে ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ নীতির কেন্দ্রবিন্দু ছিল—অভিবাসন। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ‘ডিপোর্টেশন অপারেশন’ বা গণহারে অবৈধ অভিবাসীদের দেশছাড়া করার প্রক্রিয়া শুরু করেন তিনি। ন্যাশনাল গার্ড এবং প্রয়োজনে সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করে তিনি সীমান্তে কঠোরতা আরোপ করেন। তার এই পদক্ষেপে মার্কিন সমাজ দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে। একদিকে তার কট্টর সমর্থকরা একে ‘দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা’ বলে উল্লাস প্রকাশ করে, অন্যদিকে মানবাধিকার সংগঠনগুলো একে মানবিক বিপর্যয় হিসেবে আখ্যায়িত করে।
অর্থনীতির ক্ষেত্রে তিনি আবারও সংরক্ষণবাদী নীতি গ্রহণ করেন। ‘ইউনিভার্সাল ট্যারিফ’ বা সকল আমদানিকৃত পণ্যের ওপর ১০% শুল্ক এবং চীনের পণ্যের ওপর ৬০% বা তার বেশি শুল্ক আরোপ করে তিনি বিশ্ববাণিজ্যে এক অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করেন। এতে সাময়িকভাবে মার্কিন উৎপাদনকারীরা খুশি হলেও, মুদ্রাস্ফীতি এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মার্কিনিদের জীবনে চাপ সৃষ্টি করে।
পররাষ্ট্রনীতি: ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ এর চরম রূপ :
২০২৫-২৬ সালে বিশ্ব রাজনীতিতে আমেরিকার ভূমিকা নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে ট্রাম্প তার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ইউক্রেনের সামরিক সহায়তা বন্ধ করে দেন এবং জেলেনস্কিকে রাশিয়ার শর্ত মেনে শান্তি চুক্তিতে আসতে বাধ্য করার চেষ্টা করেন। এতে ইউরোপীয় মিত্রদের সাথে ওয়াশিংটনের দূরত্ব যোজন যোজন বেড়ে যায়। ন্যাটো (NATO)-কে তিনি একটি অকার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণ্য করতে থাকেন এবং আমেরিকার অংশগ্রহণ কমিয়ে আনার হুমকি দেন।
অন্যদিকে, ইসরায়েলের প্রতি তার সমর্থন হয় নিঃশর্ত এবং আরও আগ্রাসী। মধ্যপ্রাচ্যে এবং এশিয়ায় তার নীতি ছিল দ্বিপাক্ষিক লেনদেনের ওপর ভিত্তি করে, যেখানে মানবাধিকার বা গণতন্ত্রের চেয়ে ব্যবসায়িক স্বার্থই প্রাধান্য পায়। বিশ্বমঞ্চে আমেরিকা তার ‘বিশ্বনেতা’র আসন থেকে সরে এসে একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী পরাশক্তিতে পরিণত হয়।
ক্ষ্যাপাটে নাকি কৌশলী :
২০২৬ সালের মধ্যবর্তী সময়ে এসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনটি লক্ষণীয় হয়ে ওঠে। তিনি আর কেবল টুইটারে ঝড় তোলা বা মিডিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করা সেই শো-ম্যান নন। তিনি এখন এমন এক শাসক, যিনি বিশ্বাস করেন যে সিস্টেম তাকে ধ্বংস করতে চেয়েছিল, সেই সিস্টেমকে তিনি ধ্বংস করবেন।
তার আত্মজৈবনিক বয়ানে এখন ‘ভুক্তভোগী’ (Victim) হওয়ার গল্পের চেয়ে ‘বিজয়ীর’ (Victor) দম্ভ বেশি। তিনি নিজেকে এমন এক ত্রাণকর্তা হিসেবে উপস্থাপন করেন, যিনি একা পুরো এস্টাবলিশমেন্টের বিরুদ্ধে লড়েছেন। তবে এই সময়ে তার আচরণে অস্থিরতার চেয়ে প্রতিহিংসাপরায়ণতা বেশি দেখা যায়। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সংকুচিত করা এবং বিরোধীদের কণ্ঠরোধ করার প্রবণতা তাকে পশ্চিমা উদারনৈতিক গণতন্ত্রের মডেল থেকে সরিয়ে একনায়কতন্ত্রের কাছাকাছি নিয়ে যায়।
যুদ্ধ আর দুধের বোতলের বিস্ময়কর সহাবস্থান :
সবচেয়ে বিস্ময়কর দৃশ্য দেখা গেল ওভাল অফিসে। যখন বিশ্ববাসী অপেক্ষা করছে ট্রাম্প ইরানে হামলা চালাবেন কি না, তখন তিনি ব্যস্ত ছিলেন স্কুলে শিশুদের জন্য 'ফুল-ফ্যাট মিল্ক' বা ননিযুক্ত দুধের প্রচারণায়। একটি নতুন আইনের অধীনে স্কুলে এই দুধ সরবরাহ করা হবে।
সাংবাদিকরা যখন তাকে ইরান যুদ্ধ নিয়ে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করছেন, তখন ট্রাম্প পুরনো দিনের স্মৃতিচারণ শুরু করলেন, ‘মনে আছে আমরা যখন ছোট ছিলাম? সবাই এক বোতল ভাগ করে খেতাম। আজ অবশ্য আমরা তা করি না। তবে আপনি যদি পাশের মানুষটিকে বিশ্বাস করেন, তবে খেতেই পারেন। এই যে দেখুন, বোতলটি ঠিক এখানে, পাঁচ-ছয় দিনের পুরনো... বেশ টাটকা!’—রেজোলিউট ডেস্কে রাখা দুধের বোতল দেখিয়ে বলছিলেন প্রেসিডেন্ট।
গ্রিনল্যান্ড উপাখ্যান: এক অবিশ্বাস্য মোড় :
দুনিয়ার মানচিত্রে গ্রিনল্যান্ড একটি রহস্যময় নাম। তুষারাবৃত সুবিশাল দ্বীপখন্ডটি প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর। ডেনমার্কের অধীনে থাকা এই উত্তরমেরুর দেশটি যে কখনো কেউ অধিকার করার কথা ভাবতে পারে, ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আরোহণের আগে তা জানার উপায় ছিলনা।

অবশ্য ট্রাম্পের জমানায় ওয়াশিংটনে আজব ঘটনা এখন নিত্যনৈমিত্তিক। গত বুধবার হোয়াইট হাউসে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের প্রতিনিধিদলের আগমন ঘটে। প্রসঙ্গ—বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপ গ্রিনল্যান্ড কেনার বিষয়ে ট্রাম্পের আজব আবদার।
ডেনমার্কের প্রতিনিধিরা পরিষ্কার জানাতে এসেছিলেন যে, তাদের এই আধা-স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল বিক্রির জন্য নয়। কিন্তু ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে, ইউরোপীয় নেতারা তার এই 'ম্যানিফেস্ট ডেস্টিনি' বা নতুন ভূখণ্ড দখলের খায়েশকে আর কৌতুক হিসেবে নিচ্ছেন না। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে কারণ গ্রিনল্যান্ড ন্যাটোর (NATO) অংশ। ট্রাম্পের যুক্তি, ডেনমার্ক এটি রক্ষা করতে পারবে না। অথচ ডেনমার্ক বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্য!
ভাইস প্রেসিডেন্ট জে.ডি. ভ্যান্স এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও-র সাথে বৈঠকটি কোনোমতে বড় কোনো অঘটন ছাড়াই শেষ হয়। তবে ট্রাম্প পরে অভিযোগ করেন, তার প্রস্তাবিত 'গোল্ডেন ডোম' মিসাইল শিল্ড বা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য গ্রিনল্যান্ড প্রয়োজন। তার দাবি, রাশিয়া ও চীন সেখানে ঘাঁটি গাড়তে চাইছে।
ন্যাটোর বিরুদ্ধে ন্যাটোর প্রস্তুতি :
দিনের শেষে গ্রিনল্যান্ড সংকট এক অভূতপূর্ব রূপ নেয়। ট্রাম্পের হাত থেকে ন্যাটোর মাটি রক্ষা করতে ন্যাটোর মিত্ররাই সেখানে সেনা পাঠাতে শুরু করে! এরই মধ্যে—
- ডেনমার্ক: অতিরিক্ত সেনা পাঠিয়েছে।
- সুইডেন ও নরওয়ে: তাদের স্ক্যান্ডিনেভিয়ার প্রতিবেশীরাও সেনা ও লোকবল পাঠাচ্ছে।
- জার্মানি: ১৩ জন সেনা সদস্যের একটি দল পাঠিয়েছে 'অনুসন্ধান মিশনে'।
- ফ্রান্স: ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ টুইট (X) করে জানিয়েছেন, ফরাসি বাহিনী ইতিমধ্যেই 'অপারেশন আর্কটিক এন্ডিউরেন্স'-এ যোগ দিতে রওনা হয়েছে।
যদিও মার্কিন বিশাল সামরিক বাহিনীর সামনে এই সেনা মোতায়েন প্রতীকী, কিন্তু এর তাৎপর্য গভীর। এর অর্থ হলো, ইউরোপীয় দেশগুলো এখন রাশিয়া বা চীনের ভয়ে নয়, বরং খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্টের হাত থেকে নিজেদের ভূখণ্ড রক্ষা করতে একজোট হচ্ছে।
বহুমুখী সংকটের জাদুকর :
ইরান, ভেনেজুয়েলা, গাজা—ট্রাম্প যেন একজন জাদুকর, যিনি একই সাথে অনেকগুলো বল শূন্যে ভাসিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। তার সমর্থকরা বলছেন, ট্রাম্পের এই অনিশ্চিত আচরণই আমেরিকার শক্তি। প্রতিপক্ষ বুঝতেই পারে না তিনি কী করবেন।
ইতিমধ্যেই তিনি ভেনেজুয়েলায় মাদুরো সরকারকে উৎখাত করেছেন, গাজায় হামাসের নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়া শুরু করেছেন এবং ইরানে হামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কিন্তু বিশ্লেষকরা ভয় পাচ্ছেন, ট্রাম্পের এই জুয়া খেলার ভাগ্য সবসময় সহায় নাও হতে পারে।
ইরান নিয়ে দ্বিধা ও প্রতিশ্রুতির ফাঁদ :
ইরান পরিস্থিতি ট্রাম্পের জন্য এক বড় পরীক্ষা। তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় ইরানি বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বলেছেন, "সাহায্য আসছে (HELP IS ON ITS WAY)"। কিন্তু এখন যদি তিনি হামলা না করেন, তবে তা হবে আন্দোলনকারীদের সাথে এক ঐতিহাসিক বিশ্বাসঘাতকতা। কার্নেগি এনডাউমেন্টের করিম সাজাদপুর বলেন, "তিনি যদি এখন কিছু না করেন, তবে ইতিহাস তাকে নৈতিক বিশ্বাসঘাতক হিসেবে মনে রাখবে। কারণ তিনি মানুষকে রাস্তায় নামতে উৎসাহিত করেছেন।"

সব মিলিয়ে সাম্প্রতিক সময়কালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সি কেবল একটি রাজনৈতিক পালাবদল নয়, বরং এটি মার্কিন গণতন্ত্রের জন্য এক বড় পরীক্ষা (Stress Test)। একজন ‘ক্ষ্যাপাটে’ প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার যাত্রা শুরু হলেও, দ্বিতীয় মেয়াদে তিনি নিজেকে এক আপোষহীন এবং কর্তৃত্বপরায়ণ শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তার এই সময়কাল প্রমাণ করে যে, প্রতিষ্ঠানের চেয়ে ব্যক্তির ক্ষমতা যখন বড় হয়ে ওঠে, তখন গণতন্ত্রের সংজ্ঞাও বদলে যেতে পারে। ভবিষ্যৎ ইতিহাসবিদরা হয়তো এই সময়কে চিহ্নিত করবেন ‘দ্য এজ অফ ট্রাম্প’ বা ট্রাম্পের যুগ হিসেবে, যেখানে বিশৃঙ্খলা, আগ্রাসন ও বিভাজনই ছিল রাজনীতির প্রধান চালিকাশক্তি।
সূত্র: সিএনএন
আরটিএনএন/এআই
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!