ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেত্রী মারিয়া করিনা মাচাদো গত বৃহস্পতিবার তার নোবেল শান্তি পুরস্কারের মেডেলটি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে তুলে দিয়েছেন। ঘটনাটি ট্রাম্প বিরোধীদের মধ্যে তাৎক্ষণিক হাসির খোরাক জোগালেও, রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন—বিষয়টি মোটেই হাস্যকর নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে গভীর এক রাজনৈতিক সমীকরণ।
হাস্যরস বনাম বাস্তবতা :
এবিসি (ABC)-র লেট-নাইট শো উপস্থাপক জিমি কিমেল ঘটনাটি নিয়ে রসিকতা করতে ছাড়েননি। তিনি তার শো-তে ২০১৫ সালের সোল ট্রেন অ্যাওয়ার্ডের "হোয়াইট পারসন অফ দ্য ইয়ার" (কাল্পনিক পুরস্কার) সহ নিজের জেতা বেশ কয়েকটি পুরস্কার প্রদর্শন করেন এবং রসিকতা করে বলেন, ট্রাম্প যদি মিনিয়াপোলিস থেকে আইস (ICE) বাহিনী প্রত্যাহার করেন তবে তিনিও তার পুরস্কারগুলো ট্রাম্পকে দিয়ে দেবেন।
বিষয়টি একদিক থেকে হাস্যকর মনে হতে পারে। স্বীকৃতির জন্য ট্রাম্পের অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষা তাকে এর আগে একটি বানোয়াট "ফিফা শান্তি পুরস্কার" গ্রহণ করতে প্ররোচিত করেছিল, যা মূলত নোবেল না পাওয়ার পর তাকে খুশি করার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। এখন আবার তিনি অন্যের নোবেল মেডেল গ্রহণ করলেন, যদিও নোবেল কমিটি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে এই পুরস্কার হস্তান্তরযোগ্য নয়। কিন্তু কিমেলের কৌতুকের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর উদ্বেগের বিষয়।
তোষামোদ ও পররাষ্ট্রনীতির ঝুঁকি :
ট্রাম্পের ক্ষেত্রে এ ধরণের তোষামোদ নতুন কিছু নয়, কিন্তু এবারের ঘটনাটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ধারণা করা হচ্ছে, মাচাদো হয়তো চাপের মুখে পড়ে মেডেলটি হস্তান্তর করেছেন অথবা তিনি এটিকে একটি দাবার গুটি হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এই ঘটনা এমন একটি আশঙ্কার জন্ম দেয় যে, যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশের গুরুত্বপূর্ণ পররাষ্ট্র নীতি এবং বড় বড় সিদ্ধান্তগুলো ব্যক্তিগত তোষামোদের দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে।
ঘটনাপ্রবাহের নেপথ্যে :
এই ঘটনার সূত্রপাত গত বছর, যখন ট্রাম্প নোবেল পুরস্কার পাওয়ার জন্য খুব প্রকাশ্যেই লবিং শুরু করেছিলেন। কিন্তু অক্টোবরে যখন ভেনেজুয়েলার নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের স্বীকৃতিস্বরূপ মাচাদো এই পুরস্কার পান, তখন তিনি একটি সুযোগ দেখতে পান। তিনি দ্রুত তার পুরস্কারটি ট্রাম্পকে উৎসর্গ করেন এবং ভেনেজুয়েলার সরকার পরিবর্তনে ট্রাম্পের ভূমিকার প্রশংসা করেন।
সিএনএন-এর ক্রিশ্চিয়ান আমানপুরকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মাচাদো মাদুরোর "যুদ্ধ" থামাতে ট্রাম্পের সাহায্য চেয়েছিলেন। এর তিন মাসেরও কম সময়ের মধ্যে, ৩ জানুয়ারি ট্রাম্প প্রশাসন মাদুরোকে উৎখাতের জন্য একটি সংক্ষিপ্ত অভিযান শুরু করে। তবে অবাক করা বিষয় হলো, সেই অভিযানের দিনই ট্রাম্প মাচাদোকে মাদুরোর স্থলাভিষিক্ত নেতা হিসেবে সমর্থন দিতে অস্বীকৃতি জানান এবং বলেন, মাচাদোর "দেশের ভেতরে সম্মান নেই"।
এর দুদিন পরেই ফক্স নিউজের উপস্থাপক শন হ্যানিটি—যিনি ট্রাম্পের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ—ইঙ্গিত দেন যে মাচাদো হয়তো তার মেডেলটি ট্রাম্পকে দিয়ে দিতে পারেন। মাচাদো তখন সেই ইঙ্গিত মেনে নিয়েছিলেন এবং এখন তা বাস্তবে রূপ নিল।
লেনদেনভিত্তিক রাজনীতি?
এই পুরো ঘটনাকে দুটি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হচ্ছে। প্রথমত, ট্রাম্পের লবিং সফল হয়েছে এবং একজন নোবেল বিজয়ী নারী নিজের অবস্থান ধরে রাখতে পুরস্কারটি ট্রাম্পকে দিতে বাধ্য হয়েছেন। দ্বিতীয়ত, মাচাদো তার এবং তার দেশের স্বার্থে মেডেলটিকে একটি দর কষাকষির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
তবে এই ঘটনা ট্রাম্পের তোষামোদ-প্রিয়তার ঝুঁকিকে সামনে নিয়ে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে "এমোলুমেন্টস ক্লজ" (Emoluments Clause) রাখা হয়েছিল যাতে সরকারি কর্মকর্তারা বিদেশি রাষ্ট্র থেকে উপহার নিয়ে প্রভাবিত না হন। মাচাদো রাষ্ট্রপ্রধান না হওয়ায় এটি হয়তো আইনত সেই ধারার লঙ্ঘন নয় (যেমনটা বারাক ওবামার নোবেল জয়ের সময় আইন মন্ত্রণালয় মত দিয়েছিল), কিন্তু মাচাদো বা তার মতো বিদেশিরা বুঝতে পেরেছেন যে ব্যক্তিগত চাটুকারিতা দিয়ে ট্রাম্পকে প্রভাবিত করা সম্ভব।
মাচাদোর এই মেডেল প্রদান কি মাদুরোকে উৎখাতের সিদ্ধান্তে ট্রাম্পকে প্রভাবিত করেছিল? কিংবা ভবিষ্যতে ভেনেজুয়েলার নিয়ন্ত্রণে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে এটি প্রভাবিত করবে কিনা—তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে ট্রাম্প বারবার প্রমাণ করেছেন যে তিনি লেনদেনে বিশ্বাসী (transactional)। এই ঘটনাটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তগুলো জাতীয় স্বার্থের চেয়ে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত স্বার্থ বা তোষামোদের ভিত্তিতে নেওয়ার এক বিপজ্জনক প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
সূত্র : সিএনএন
আরটিএনএন/এআই
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!