ডোনাল্ড ট্রাম্প, গ্রিনল্যান্ড
সুইজারল্যান্ডে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য অপেক্ষা করছে এক জরুরি কূটনৈতিক হস্তক্ষেপ   ছবি: সংগৃহীত

গ্রিনল্যান্ড নিয়ে গত কয়েক দিন ধরে মার্কিন মিত্রদের ক্রমাগত হুমকি-ধমকি দেওয়ার পর এবার সুইজারল্যান্ডের ডাভোসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য অপেক্ষা করছে এক জরুরি কূটনৈতিক হস্তক্ষেপ বা ‘ইন্টারভেনশন’। ইউরোপীয় শীর্ষ কর্মকর্তারা এই সপ্তাহের বিশ্বনেতাদের সম্মেলনকে (ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম) কাজে লাগিয়ে একটি আসন্ন সংকট মোকাবিলার পরিকল্পনা করছেন। সিএনএন-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের জিদ পুরো মহাদেশকে অস্থির করে তুলেছে এবং আমেরিকার সঙ্গে ইউরোপের সাত দশকের পুরনো মৈত্রী এখন অস্তিত্বের সংকটে। এমনকি ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলের অনেকেই প্রেসিডেন্টের এমন আগ্রাসী বক্তব্যে গোপনে অস্বস্তি প্রকাশ করেছেন এবং সম্মানজনক সমাধানের পথ খুঁজছেন।

ইউরোপের কৌশল: ট্রাম্পকে থামানোর চেষ্টা
ইউরোপীয় নেতাদের তাৎক্ষণিক লক্ষ্য হলো উত্তেজনা কমানো। বিশেষ করে, ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন যে—যারা তার গ্রিনল্যান্ড নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার বিরোধিতা করবে, তাদের ওপর নতুন শুল্ক আরোপ করা হবে। ইউরোপীয় কূটনীতিকরা এবং ট্রাম্পের উপদেষ্টারা গ্রিনল্যান্ড পুরোপুরি হাতছাড়া না করেও ট্রাম্পকে সন্তুষ্ট করার বেশ কিছু বিকল্প নিয়ে আলোচনা করছেন:

১. সামরিক বাণিজ্যিক চুক্তি: বিদ্যমান চুক্তিগুলো সম্প্রসারণ করে গ্রিনল্যান্ডে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম বাড়ানো। এ ক্ষেত্রে একটি বড় ‘স্বাক্ষর অনুষ্ঠান’-এর আয়োজন করা হতে পারে, যাতে ট্রাম্প এটিকে নিজের ‘বিজয়’ হিসেবে দেখাতে পারেন।
২. কমপ্যাক্ট অব ফ্রি অ্যাসোসিয়েশন: গ্রিনল্যান্ডকে পালাউ বা মার্শাল আইল্যাণ্ডসের মতো ‘ফ্রি অ্যাসোসিয়েশন’-এর মর্যাদায় রাখা। এতে গ্রিনল্যান্ডের বর্তমান স্ট্যাটাস বজায় থাকবে, তবে আমেরিকা আর্থিক সহায়তার বিনিময়ে বাড়তি নিরাপত্তা সুবিধা পাবে।
৩. চীনা বিনিয়োগ নিষিদ্ধ: ১৯৫১ সালের চুক্তি নবায়ন করে গ্রিনল্যান্ডে চীনা বিনিয়োগ পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব দেওয়া হতে পারে।

এদিকে, ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা গোপনে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে গ্রিনল্যান্ড কেনার একটি প্রস্তাবনা তৈরি করছেন, যদিও ডেনমার্ক নিজেদের ভূখণ্ড ছাড়তে নারাজ।

ট্রাম্পের অনড় অবস্থান :
বুধবার সকালে ডাভোসে পৌঁছানোর আগে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে সেখানে অনেক বৈঠক হবে এবং তিনি এমন একটি চুক্তি করবেন যা ‘‘সবার জন্যই খুব ভালো হবে।’’ তিনি দাবি করেন, এতে ন্যাটো ‘‘খুব খুশি’’ হবে এবং গ্রিনল্যান্ডবাসী ‘‘রোমাঞ্চিত’’ হবে। ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে সম্মেলনের ফাঁকে ট্রাম্পের সঙ্গে একান্ত বৈঠক করবেন বলে জানা গেছে।

তবে ট্রাম্প তার দাবিতে অনড়। তিনি আবারও জোর দিয়ে বলেছেন, ‘‘গ্রিনল্যান্ড আমাদের প্রয়োজন।’’ গ্রিনল্যান্ড পেতে কতদূর যাবেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘আপনারা শীঘ্রই টের পাবেন।’’ হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি এক বিবৃতিতে দাবি করেছেন, আমেরিকার হাতে গ্রিনল্যান্ড থাকলে ন্যাটো আরও শক্তিশালী হবে এবং আধুনিক হুমকি থেকে গ্রিনল্যান্ডবাসীকে রক্ষা করা সহজ হবে।

ইউরোপের পাল্টা ব্যবস্থা শুল্ক যুদ্ধের শঙ্কা :
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ ইউরোপীয় মিত্ররা এখনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি যে ট্রাম্প আগ্রাসন বাড়ালে তারা কীভাবে জবাব দেবে। ইউরেশিয়া গ্রুপের প্রেসিডেন্ট ইয়ান ব্রেমার বলেন, ‘‘তাদের জবাব দিতেই হবে। তবে তা যথেষ্ট শক্তি ও ঐক্য নিয়ে করতে হবে।’’

ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ডাভোসে দেওয়া ভাষণে বলেন, ‘‘সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে শুল্ককে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা এবং একের পর এক শুল্ক আরোপ মেনে নেওয়া যায় না।’’ ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন ‘ইউরোপীয় স্বাধীনতার’ নতুন রূপরেখা তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন।

ইউরোপীয় কূটনীতিকরা ট্রাম্পকে আটকাতে বিভিন্ন কঠোর পদক্ষেপের কথা বিবেচনা করছেন:

  • গত বছর স্থগিত করা ৯৩ বিলিয়ন ইউরোর (১০৯ বিলিয়ন ডলার) পাল্টা শুল্ক কার্যকর করা।
  • মার্কিন ট্রেজারি বন্ড বিক্রি করে দেওয়া।
  • মার্কিন কোম্পানিগুলোর ওপর বিধিনিষেধ আরোপ।
  • ইউরোপীয় সামরিক ঘাঁটিতে আমেরিকার প্রবেশাধিকার সীমিত করা।
  • এমনকি, আসন্ন ফুটবল বিশ্বকাপ (যা ট্রাম্পের ব্যক্তিগত গর্বের বিষয়) থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেওয়া।

সর্বশেষ ব্যবস্থা হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের ‘অ্যান্ট-কোয়েরশন ইনস্ট্রুমেন্ট’ বা জবরদস্তি-বিরোধী অর্থনৈতিক অস্ত্র প্রয়োগ করতে পারে।


ট্রাম্পের উপদেষ্টাদের কেউ কেউ মনে করছেন, তিনি আসলে পরিস্থিতি যাচাই করছেন এবং সামরিক হস্তক্ষেপের কোনো ইচ্ছা তার নেই। তবে ইউরোপীয় নেতাদের আশঙ্কা, ট্রাম্পের এই ‘মনস্তাত্ত্বিক’ জিদ এবং বিজয়ের আকাঙ্ক্ষা দীর্ঘদিনের সম্পর্ককে চিরতরে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। ডাভোসে ট্রাম্প কী করবেন বা বলবেন, তা নিয়ে ইউরোপীয় মহলে এখন শুধুই শঙ্কা আর ‘উদ্বেগ’।

সূত্র : সিএনএন

আরটিএনএন/এআই