জাপান, শিনজো আবে
জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবেকে হত্যার দায়ে তার হত্যাকারী তেতসুয়া ইয়ামাগামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে দেশটির আদালত   ছবি: সংগৃহীত

জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবেকে হত্যার দায়ে তার হত্যাকারী তেতসুয়া ইয়ামাগামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে দেশটির আদালত। ২০২২ সালে নারা শহরে এক নির্বাচনী প্রচারণার সময় আবেকে গুলি করে হত্যা করার প্রায় সাড়ে তিন বছর পর এই রায় ঘোষণা করা হলো।

৪৫ বছর বয়সী ইয়ামাগামি গত বছর বিচার কার্যক্রম শুরুর সময়ই নিজের দোষ স্বীকার করে নিয়েছিলেন। তবে তার শাস্তি কী হওয়া উচিত, তা নিয়ে জাপানি জনমত ছিল বিভক্ত। অনেকে তাকে ‘ঠাণ্ডা মাথার খুনি’ হিসেবে দেখলেও, কেউ কেউ তার দুর্বিষহ শৈশব এবং পারিবারিক পরিস্থিতির কারণে তার প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেছেন।

হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট ও মোটিভ :
প্রসিকিউটররা এই হত্যাকাণ্ডকে একটি ‘জঘন্য কাজ’ উল্লেখ করে ইয়ামাগামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দাবি করেন। আবের হত্যাকাণ্ড জাপানের মতো দেশে—যেখানে বন্দুক সহিংসতা বিরল—পুরো জাতিকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল।

অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবীরা আদালতের কাছে নমনীয়তা (সর্বোচ্চ ২০ বছর জেল) চেয়ে দাবি করেন যে, ইয়ামাগামি ‘ধর্মীয় নির্যাতনের’ শিকার। আদালতে জানানো হয়, ইয়ামাগামির মা বিতর্কিত ‘ইউনিফিকেশন চার্চ’-এ মৃত স্বামীর জীবন বীমার টাকা ও অন্যান্য সম্পদসহ প্রায় ১০ কোটি ইেন (জাপানি মুদ্রা) দান করে দিয়েছিলেন। এতে তাদের পরিবার দেউলিয়া হয়ে পড়ে। ওই চার্চের সঙ্গে সাবেক প্রধানমন্ত্রী আবের সম্পর্ক রয়েছে জানতে পেরে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন ইয়ামাগামি।

আদালতে আবেগের মুহূর্ত :
বুধবার নারা জেলা আদালতের বাইরে প্রায় ৭০০ মানুষ রায় শোনার জন্য ভিড় করেন। বিচার চলাকালীন ইয়ামাগামির বোন সাক্ষ্য দিতে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং মায়ের চার্চ-আসক্তির কারণে তাদের ভাই-বোনদের অবর্ণনীয় কষ্টের কথা তুলে ধরেন। সাংবাদিক ইতো সুজুকি জানান, ‘‘সেটি ছিল অত্যন্ত আবেগঘন মুহূর্ত, আদালতের গ্যালারিতে উপস্থিত প্রায় সবাই তখন কাঁদছিলেন।’’

তবে আবের স্ত্রী আকি আবে আদালতে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, স্বামী হারানোর বেদনা কখনোই মুছবে না। তিনি বলেন, ‘‘আমি শুধু চেয়েছিলাম তিনি বেঁচে থাকুন।’’ ইয়ামাগামি যখন জানান যে আবে তার মূল লক্ষ্য ছিলেন না, বরং চার্চের ওপর ক্ষোভ মেটাতে তিনি আবেকে ব্যবহার করেছেন, তখন আকি আবের চোখে ছিল কেবল অবিশ্বাসের ছাপ।

হত্যার বিবরণ :
২০২৫ সালের অক্টোবরে বিচারের প্রথম দিনে ইয়ামাগামি বলেছিলেন, ‘‘সবই সত্য। কোনো সন্দেহ নেই যে আমিই এটা করেছি।’’ ২০২২ সালের ৮ জুলাই তিনি দুটি ধাতব পাইপ ও ডাক্ট টেপ দিয়ে তৈরি হাতে বানানো বন্দুক দিয়ে আবেকে লক্ষ্য করে দুটি গুলি ছোড়েন।

সামাজিক প্রভাব ও চার্চ বিতর্ক :
শিনজো আবের হত্যাকাণ্ডের পর জাপানে ইউনিফিকেশন চার্চ এবং ক্ষমতাসীন লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (এলডিপি) রাজনীতিবিদদের মধ্যকার সম্পর্কের বিষয়টি সামনে আসে। এর জেরে বেশ কয়েকজন মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হয়। গত বছরের মার্চে টোকিও আদালত ভক্তদের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগে চার্চটির ‘ধর্মীয় কর্পোরেশন’ মর্যাদা বাতিল করে দেয়।

সমাজবিজ্ঞানী রিন উশিয়ামা মনে করেন, ইয়ামাগামির প্রতি মানুষের সহানুভূতির মূল কারণ হলো বিতর্কিত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি জাপানিদের অবিশ্বাস। তবে তিনি এও বলেন, ‘‘পারিবারিক অবহেলা ও অর্থনৈতিক কষ্টের শিকার হলেও এটি হত্যাকাণ্ডের মতো অপরাধের ন্যায্যতা দিতে পারে না।’’

সূত্র : বিবিসি

আরটিএনএন/এআই