ডোনাল্ড ট্রাম্প, গ্রিনল্যান্ড
দাভোসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দীর্ঘ ও আক্রমণাত্মক ভাষণ পশ্চিমা জোটের ফাটল মেরামতের পরিবর্তে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে   ছবি: সংগৃহীত

সুইজারল্যান্ডের আল্পস পর্বতমালার দাভোসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দীর্ঘ ও আক্রমণাত্মক ভাষণ পশ্চিমা জোটের ফাটল মেরামতের পরিবর্তে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বুধবার ব্যবসায়ী মুঘল এবং বিশ্বনেতাদের সামনে দেওয়া এই ভাষণে তিনি ইউরোপ, ন্যাটো এবং নিজের মিত্রদের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ তুলে ধরেন। তবে উত্তেজনার মধ্যেও ইউরোপীয় নেতাদের জন্য একটি স্বস্তির খবর ছিল। ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়েছেন, গ্রিনল্যান্ড নিয়ন্ত্রণে নিতে তিনি কোনো সামরিক শক্তি প্রয়োগ করবেন না।

. গ্রিনল্যান্ড দখলে শক্তি প্রয়োগ করবেন না :
ট্রাম্পের পুরো ভাষণে ইউরোপীয় নেতাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল চারটি শব্দ—"আমি শক্তি প্রয়োগ করব না।" এর আগে হোয়াইট হাউস সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়নি, কিন্তু বুধবার ট্রাম্পের এই বক্তব্যে যুদ্ধের আশঙ্কা কমল। তবে তিনি গ্রিনল্যান্ডের ওপর পূর্ণ মালিকানা ছাড়া অন্য কিছু মেনে নেবেন না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, "এই বিশাল অরক্ষিত দ্বীপটি আসলে উত্তর আমেরিকার অংশ। এটি আমাদের ভূখণ্ড।"

. ডেনমার্ককেঅকৃতজ্ঞআখ্যা ঐতিহাসিক যুক্তি :
ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ চাওয়ার যৌক্তিকতা তুলে ধরতে গিয়ে ভুলবশত চারবার এটিকে ‘আইসল্যান্ড’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি ডেনমার্ককে ‘অকৃতজ্ঞ’ আখ্যা দিয়ে বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মাত্র ছয় ঘণ্টায় জার্মানির কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল ডেনমার্ক। তখন যুক্তরাষ্ট্রই গ্রিনল্যান্ড রক্ষা করেছিল। তিনি বলেন, "আমরা তখন কতই না বোকা ছিলাম যে এটি ফেরত দিয়েছিলাম। কিন্তু এখন দেখুন তারা কতটা অকৃতজ্ঞ।"

. মিত্রদের প্রতি ক্ষোভ অবজ্ঞা :
ট্রাম্প আয়োজক দেশ সুইজারল্যান্ড থেকে শুরু করে কানাডা পর্যন্ত কাউকেই ছাড় দেননি। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের জন্যই সুইজারল্যান্ড টিকে আছে। কানাডার মার্ক কার্নির মন্তব্যের জবাবে তিনি বলেন, "কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের দয়ায় বেঁচে আছে। মার্ক, পরের বার কথা বলার সময় এটা মনে রেখো।" তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া ইউরোপের দেশগুলো অচল। তিনি কটাক্ষ করে বলেন, "আমরা না থাকলে আপনারা সবাই এখন জার্মান বা জাপানি ভাষায় কথা বলতেন।"

. ইলহান ওমর পশ্চিমা সংস্কৃতি নিয়ে মন্তব্য :
ট্রাম্প তাঁর ভাষণে মার্কিন ডেমোক্র্যাট নেত্রী ইলহান ওমরের তীব্র সমালোচনা করেন। সোমালিয়া বংশোদ্ভূত ওমরের প্রসঙ্গ টেনে ট্রাম্প বলেন, "তিনি এমন দেশ থেকে এসেছেন যা কোনো দেশই নয়, আর তিনি আমাদের শেখাতে আসছেন আমেরিকা কীভাবে চালাতে হবে।" এছাড়া তিনি ‘বাতাস থেকে বিদ্যুৎ’ (উইন্ডমিল) উৎপাদনকারী দেশগুলোকে ‘বোকা’ বলে উপহাস করেন এবং ভুল তথ্য দিয়ে চীনের প্রশংসা করে বলেন, তাদের দেশে উইন্ডফার্ম নেই।

. শ্রোতাদের অস্বস্তি নীরবতা :
ট্রাম্পের ভাষণের সময় হলরুমের পরিবেশ ছিল থমথমে। উপস্থিত শ্রোতারা কখনো হতভম্ব হয়ে নীরব ছিলেন, আবার কখনো অস্বস্তিতে হেসেছেন। শুরুতে ভিড় থাকলেও ভাষণের দীর্ঘসূত্রিতা এবং অপ্রাসঙ্গিক মন্তব্যে বিরক্ত হয়ে অনেকে অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার আগেই হল ত্যাগ করেন।

গ্রিনল্যান্ড নিয়ে নতুন মোড় :
ভাষণের কয়েক ঘণ্টা পর অবশ্য ট্রাম্প ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ জানান, ন্যাটো মহাসচিবের সঙ্গে বৈঠকের পর গ্রিনল্যান্ড নিয়ে একটি "ভবিষ্যৎ চুক্তির কাঠামো" তৈরি হয়েছে। এর ফলে আগামী মাসে তিনি যে শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছিলেন, তা বাতিল করা হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, "এই সমাধান চূড়ান্ত হলে তা আমেরিকা এবং সমস্ত ন্যাটো দেশের জন্য দারুণ হবে।" সম্মেলন শেষে সিএনএন-এর প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি হতে যাচ্ছে।

ট্রাম্পের এই ভাষণ এবং ইউরোপীয় নেতাদের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি প্রমাণ করে যে, তিনি মনে করেন ইউরোপ তার সঠিক পথ থেকে সরে গেছে। অভিবাসন ও অর্থনৈতিক নীতির কারণে ইউরোপকে এখন আর ‘চেনা যায় না’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সূত্র : সিএনএন

আরটিএনএন/এআই