ইসরায়েলি আগ্রাসনের শুরু থেকে গাজার আবু আমর পরিবার অন্তত ১৭ বার বাস্তুচ্যুত হয়েছে। প্রতিটি স্থান পরিবর্তন তাদের বাঁচার পথ আরও সংকুচিত করেছে। বর্তমানে গাজা শহরের কেন্দ্রস্থলে রেমাল এলাকায় একটি বিশাল আবর্জনার স্তূপের পাশে তাঁবু টানিয়ে কোনোমতে মাথা গোঁজার ঠাঁই পেয়েছে তারা। কারণ, তাদের জন্য আর কোনো জায়গা অবশিষ্ট নেই। এই পরিবারের জন্য এখন বেঁচে থাকা মানেই দূষণ, রোগবালাই আর অপমানের বিরুদ্ধে প্রতিদিনের এক কঠিন সংগ্রাম।
আবর্জনার স্তূপই যখন প্রতিবেশী :
৬৫ বছর বয়সী সাদা আবু আমর বেইত লাহিয়া থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে এখন গাজা শহরে আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমরা সবসময় বলি, গাজায় আমরা দুটি যুদ্ধের মধ্যে বাস করছি—একটি বোমার আঘাতে আমাদের মারে, আরেকটি আবর্জনা দিয়ে।”
তিনি আরও জানান, “আমার অ্যাজমা আছে, ইনহেলার সবসময় আমার বালিশের নিচেই থাকে। আবর্জনার গন্ধে রাতে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়, তাই বারবার ইনহেলার নিতে হয়।” সাদার পুত্রবধূ ৩৫ বছর বয়সী সুরাইয়া আবু আমর, পাঁচ সন্তানের মা। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, “মৌলিক পরিচ্ছন্নতা এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। আমরা পরিষ্কার করার জিনিসপত্র ব্যবহার করি, কিন্তু সব টাকা তো শুধু এ কাজেই খরচ করতে পারি না। পানির অভাবে আবর্জনার পাশের তাঁবু কখনোই পরিষ্কার থাকে না। মাসে কয়েকবার আমরা গ্যাস্ট্রোএন্টেরাইটিসে আক্রান্ত হই।”
সুরাইয়া বলেন, “একবার তো আমি গ্যাস্ট্রোএন্টেরাইটিসে মারা যাওয়ার উপক্রম হয়েছিলাম। হাসপাতালের ডাক্তাররা বলেছিল, অপরিচ্ছন্ন স্যানিটেশনের কারণেই এমন হয়েছে।” যুদ্ধের আগে সুরাইয়ার জীবন ছিল ভিন্ন। তিনি বলেন, “আগে আমি দিনে কয়েকবার ঘর পরিষ্কার করতাম। আমি স্বপ্নেও ভাবিনি যে এমন দুঃস্বপ্নের মধ্যে বাস করতে হবে।”
কীটপতঙ্গ আর ইঁদুরের উপদ্রব :
সুরাইয়ার স্বামী সালেম (৪০) জানান, নিরুপায় হয়েই তারা এই আবর্জনার স্তূপের পাশে থাকছেন। তিনি বলেন, “বাতাসের সঙ্গে দুর্গন্ধ ভেসে আসে, আমরা ঠিকমতো খেতেও পারি না। বমি চলে আসে। কীটপতঙ্গ আর মশার উৎপাতে আমার দুই সপ্তাহের মেয়ে সাবার মুখ ফুলে গেছে।”
সালেম আরও বলেন, “চারপাশে ইঁদুরের দৌরাত্ম্য। সম্প্রতি আমরা সবাই ইঁদুরের প্রস্রাবজনিত সংক্রমণে মারাত্মক ফ্লুতে ভুগেছি। আমার অসুস্থ বাবা তো মারাই যাচ্ছিলেন। ডাক্তাররা বলেছেন, এটি করোনাভাইরাসের মতোই ভয়াবহ।” বৃষ্টির সময় তাঁবুতে পয়োবর্জ্য ঢুকে পড়ার করুণ চিত্র তুলে ধরে সালেম বলেন, “নোংরা পানি পোশাকে লাগে। আমাদের কাছে পাল্টানোর মতো কাপড় নেই। বাধ্য হয়ে অপবিত্র পোশাকেই নামাজ পড়তে হয়।”
চিকিৎসকদের উদ্বেগ :
আল-শিফা মেডিকেল কমপ্লেক্সের মেডিসিন ও বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ ডা. আহমেদ আলরাবিই জানান, “গাজার জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি বিপর্যয়কর। মেনিনজাইটিস, হেপাটাইটিস-এ, তীব্র গ্যাস্ট্রোএন্টেরাইটিস এবং অ্যাজমার প্রকোপ বেড়েছে। হাসপাতালগুলোতে শয্যা সংখ্যার চেয়ে ১৫০ শতাংশ বেশি রোগী ভর্তি। করিডোর ও মেঝেতে রোগীদের চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।” তিনি আরও বলেন, “ওষুধ, অ্যান্টিবায়োটিক ও চিকিৎসা সরঞ্জামের তীব্র সংকট রয়েছে, ফলে রোগীরা সঠিক সময়ে চিকিৎসা পাচ্ছেন না।”
পৌরসভার অসহায়ত্ব :
গাজা পৌরসভার মুখপাত্র হুসনি মুহান্না জানান, “ইসরায়েলি বাহিনী গাজার প্রধান ল্যান্ডফিল বা বর্জ্য ফেলার স্থানে যাওয়ার পথ বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে গাজা শহরে সাড়ে ৩ লাখ টনের বেশি বর্জ্য জমে আছে। আমরা বাধ্য হয়ে ঐতিহাসিক ফিরাস মার্কেটের জায়গায় সাময়িক ল্যান্ডফিল তৈরি করেছি, যা এখন পরিবেশগত বিপর্যয়ে রূপ নিয়েছে।” পৌরসভার আরেক কর্মকর্তা আহমেদ ড্রিমলি জানান, গাজার পানির লাইনের দেড় লাখ মিটারের বেশি পাইপ এবং ৮৫ শতাংশ পানির কূপ ধ্বংস হয়ে গেছে।
অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ :
মার্কিন-সমর্থিত যুদ্ধবিরতির ঘোষণা সত্ত্বেও পুনর্গঠন কাজে বাধা দিচ্ছে ইসরায়েল। ফলে ধ্বংসপ্রাপ্ত পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
রোজান জারাদ নামে এক বাস্তুচ্যুত মা জানান, টয়লেট ব্যবহার এড়াতে তারা অনেক সময় পানি বা খাবার গ্রহণ করা কমিয়ে দেন। তিনি বলেন, “স্কুলের টয়লেট ব্যবহারের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হয়, আর সেগুলো এতটাই নোংরা যে বর্ণনা করা যায় না। এটি অপমানজনক।” গাজাবাসীর জন্য এই নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ থেকে সহসাই মুক্তি মিলছে না বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র : আল জাজিরা
আরটিএনএন
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!