পাকিস্তান, বেলুচিস্তান
পাকিস্তান সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, এই বিচ্ছন্নতাবাদীদের পেছনে ভারতের সমর্থন রয়েছে   ছবি: সংগৃহীত

পাকিস্তানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় বেলুচিস্তান প্রদেশে শনিবার সমন্বিত ও মারাত্মক হামলার পর চালানো অভিযানে কমপক্ষে ৯২ জন বিচ্ছিন্নতাবাদী নিহত হয়েছে। সেনাবাহিনীর বিবৃতিতে আরও বলা হয়, এসব হামলায় ১৫ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং ১৮ জন বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। পাকিস্তান সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, এই বিচ্ছন্নতাবাদীদের পেছনে ভারতের সমর্থন রয়েছে। তবে নয়াদিল্লি একাধিকবার এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে।

এদিকে বিদ্রোহী সংগঠন বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) আগেই হামলার দায় স্বীকার করেছে এবং দাবি করেছে, তাদের হামলায় কয়েক ডজন সৈন্য নিহত হয়েছে। তবে উভয় পক্ষের দাবিই স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এই সংঘর্ষ ও সহিংসতাকে বেলুচিস্তান প্রদেশের সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম রক্তক্ষয়ী দিন হিসেবে দেখা হচ্ছে। দশকের পর দশক ধরে এই দরিদ্র প্রদেশে পাকিস্তান সরকার জাতিগত বিদ্রোহের মুখোমুখি রয়েছে।

শনিবারের হামলা ও পাল্টা অভিযান

শনিবার শেষ রাতে দেওয়া সেনাবাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বিচ্ছিন্নতাবাদীরা প্রাদেশিক রাজধানী কোয়েটা ও আশপাশের বিভিন্ন শহরে বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে একাধিক হামলা চালায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে সামরিক বাহিনী পুরো বেলুচিস্তান জুড়ে "ক্লিয়ারেন্স" তথা নিস্কাশন অভিযান শুরু করে এবং বিদ্রোহীদের "দুষ্ট পরিকল্পনা সফলভাবে ব্যর্থ" করে বলে দাবি করা হয়েছে।

খবরে বলা হয়, দিনের বেলায় কোয়েটার কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ভবন এবং তার আশপাশের রাস্তা সিল করে দেওয়া হয়। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে মোবাইল ফোন সেবা বন্ধ রাখা হয় এবং আঞ্চলিক ট্রেন চলাচলও স্থগিত করা হয়। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ পরে সেনাবাহিনীর প্রশংসা করেন এবং অঙ্গীকার করেন, "সন্ত্রাসবাদের সম্পূর্ণ নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া হবে"

শনিবার সকালের সমন্বিত হামলা

শনিবার ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত বিচ্ছিন্নতাবাদীরা প্রদেশের ১২টি শহর ও জনপদে একযোগে হামলা চালায়। তাদের হাতে ছিল গ্রেনেড ও আগ্নেয়াস্ত্র। লক্ষ্যবস্তু ছিল পুলিশ ও আধা-সামরিক ঘাঁটি, কারাগার এবং সরকারি দপ্তর। বিএলএ এসব হামলার দায় নিয়ে বলেছে, তারা ফেডারেল সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছে। তাদের অভিযোগ, পাকিস্তানের বৃহত্তম প্রদেশ বেলুচিস্তানের সমৃদ্ধ খনিজ সম্পদ কেন্দ্রীয় সরকার শোষণ করছে—কিন্তু স্থানীয় জনগোষ্ঠী কোনো সুবিধা পাচ্ছে না। স্থানীয় কর্মীরা আরও অভিযোগ করেন, পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনী জোরপূর্বক গুম করার ঘটনায় জড়িত। তবে ইসলামাবাদ এসব অভিযোগ অস্বীকার করে।

বেলুচিস্তানে দীর্ঘ সংঘাতের ইতিহাস

বেলুচ জনগোষ্ঠীর জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিতে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ও সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু হয় ১৯৪৮ সালে—ব্রিটিশ ভারতীয় সাম্রাজ্য থেকে পাকিস্তানের স্বাধীনতার পরপরই। ভৌগোলিকভাবে বেলুচিস্তান ইরান ও তালেবান-নিয়ন্ত্রিত আফগানিস্তানের সঙ্গে উত্তপ্ত সীমান্ত ভাগ করে নেয়। একই সঙ্গে আরব সাগরের সুবিশাল উপকূল এই অঞ্চলের অংশ। এই অঞ্চলের নাম এসেছে বেলুচ উপজাতি থেকে, যারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এখানে বসবাস করছেন। বেলুচরা এখনো এই অঞ্চলের বৃহত্তম জাতিগত গোষ্ঠী; এরপরেই আছেন পশতুনরা।

বেলুচিস্তানের সবচেয়ে বড় অংশ দক্ষিণ-পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থিত। প্রদেশটি আয়তনে পাকিস্তানের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৪৪%, কিন্তু জনসংখ্যা মাত্র দেশের ২৪ কোটির ৫% এর কাছাকাছি। প্রাকৃতিক সম্পদে—বিশেষত গ্যাস ও খনিজের দিক থেকে—পাকিস্তানের সবচেয়ে সম্পদশালী প্রদেশও এটি।

সূত্র : বিবিসি

আরটিএনএন/এআই