রাশিয়ান টেলিভিশনের এক জনপ্রিয় উপস্থাপক তার শো-তে যুক্তরাজ্যের ওপর তোপ দাগলেন, উগরে দিলেন তীব্র ক্ষোভ। তার কথা শুনে আমি শুধু ভাবছি, ভাগ্যিস পারমাণবিক বোমার বোতামটা এই লোকটার হাতে নেই! ভ্লাদিমির সলোভিভ চিৎকার করে বলছিলেন, "আমরা এখনও লন্ডন বা বার্মিংহাম ধ্বংস করে দিইনি। আমরা এখনও পৃথিবী থেকে ওই ব্রিটিশ আবর্জনাগুলোকে মুছে ফেলিনি।" তার কণ্ঠে যেন একরাশ হতাশা।
তিনি আরও বললেন, "আমরা ওই অভিশপ্ত বিবিসি আর তাদের সেই ‘স্টিভ রটেন-বার্গ’কে (স্টিভ রোজেনবার্গকে বিকৃত করে) এখনও লাথি মেরে বের করে দিইনি। সে একটা মলত্যাগরত কাঠবিড়ালির মতো ঘুরে বেড়ায়... সে আমাদের দেশের একজন সচেতন শত্রু!" আমার জগতে আপনাকে স্বাগতম: রাশিয়ায় একজন বিবিসি সংবাদদাতার জগত এটি।
বিবিসি প্যানোরামার তথ্যচিত্র ‘আওয়ার ম্যান ইন মস্কো’-তে আমরা এই জগতেরই এক ঝলক দেখানোর চেষ্টা করেছি। ক্রেমলিন যখন ইউক্রেনে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে, দেশের ভেতরে কড়াকড়ি বাড়াচ্ছে এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করছে—ঠিক সেই সময়ে বিবিসির মস্কো ব্যুরোর একটি বছরের চিত্র এতে ফুটে উঠেছে।
আমাকে ‘কাঠবিড়ালি’ বলায় আমার গায়ে লাগেনি। কাঠবিড়ালিরা বেশ সুন্দর হয়। আর তাদের চামড়াও বেশ মোটা—একজন বিদেশি সংবাদদাতার এখানে টিকে থাকতে হলে চামড়া মোটা হওয়াটাই জরুরি। কিন্তু "রাশিয়ার শত্রু"? এই কথাটা বুকে বাজে।
আমি মস্কোতে বসবাস ও কাজ করে জীবনের ত্রিশটি বছর পার করেছি। তরুণ বয়সে আমি রাশিয়ার ভাষা, সাহিত্য আর সঙ্গীতের প্রেমে পড়েছিলাম। লিডস ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় আমি একটি গানের দল চালাতাম যারা রাশিয়ান লোকসঙ্গীত গাইতো। একবার এক কনসার্টের জন্য আমি রাশিয়ান ভাষায় একটি গানও লিখেছিলাম—এমন এক স্নোম্যান বা তুষারমানবের গল্প, যে এত বেশি জামাকাপড় পরেছিল যে শেষমেশ গলেই গিয়েছিল।
সেই স্নোম্যানের মতোই, আমার চেনা রাশিয়াও ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে গলে মিলিয়ে গেল। ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে বিশ্বের বৃহত্তম দেশটি এক অন্ধকার পথে পা বাড়াল। প্রেসিডেন্ট পুতিনের সেই "বিশেষ সামরিক অভিযান" দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে ভয়াবহ যুদ্ধে পরিণত হলো।
পেছনের দিকে তাকালে দেখা যায়, এটি হঠাৎ করে ঘটেনি। রাশিয়া ২০১৪ সালেই ইউক্রেনের কাছ থেকে ক্রিমিয়া দখল করে নিয়েছিল; পূর্ব ইউক্রেনে সশস্ত্র বিদ্রোহে অর্থায়ন ও ইন্ধন জোগানোর অভিযোগও ছিল তাদের বিরুদ্ধে। পশ্চিমাদের সঙ্গে সম্পর্ক ক্রমশ তিক্ত হচ্ছিল। তবুও, ২০২২-এর সেই আগ্রাসন ছিল এক চূড়ান্ত মোড় ঘোরানো মুহূর্ত।
এর পরের দিনগুলোতে ভিন্নমত দমন করতে এবং কর্তৃপক্ষের সমালোচকদের শাস্তি দিতে একের পর এক কঠোর আইন জারি করা হলো। বিবিসির প্ল্যাটফর্মগুলো ব্লক করে দেওয়া হলো। হঠাৎ করেই রাশিয়ায় সাংবাদিকতা করাটা যেন আইনি মাইনফিল্ডের ওপর দিয়ে দড়াবাজি করে হাঁটার মতো হয়ে দাঁড়াল। চ্যালেঞ্জটা হলো—সততার সঙ্গে সঠিক খবরটি জানানো, কিন্তু সেই দড়ি থেকে পড়ে না যাওয়া।
২০২৩ সালে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সাংবাদিক ইভান গেরশকোভিচের গ্রেপ্তার বুঝিয়ে দিল যে, বিদেশি পাসপোর্ট পকেটে থাকলেই জেল থেকে বাঁচার গ্যারান্টি নেই। একজন মার্কিন নাগরিক হয়েও তাকে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং ১৬ মাস কারাগারে কাটাতে হয়। যদিও তিনি এবং তার নিয়োগকর্তা এই মামলাকে সাজানো বলে দাবি করেছেন। বিবিসির মস্কো অফিসে আমাদের দল এখন অনেক ছোট। আমরা সবাই মিলে রাশিয়া থেকে খবর পাঠানোর নিত্যদিনের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করার চেষ্টা করি।
প্রযোজক বেন তাভেনার এবং আমাকে রাশিয়ায় ঢোকা ও বের হওয়ার সময় প্রায়ই "বাড়তি তল্লাশির" মুখে পড়তে হয়। ক্রেমলিন যেসব দেশকে "অবন্ধু" হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে (যার মধ্যে যুক্তরাজ্যও আছে), সেসব দেশের সাংবাদিকদের এখন আর এক বছরের পারমিট দেওয়া হয় না। আমাদের সাংবাদিক ভিসা এবং অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড প্রতি তিন মাস অন্তর নবায়ন করতে হয়।
আগে যারা আমাদের সঙ্গে কথা বলতেন, তাদের অনেকেই এখন কথা বলতে ভয় পান। আন্তর্জাতিক উত্তেজনার এই সময়ে বিবিসির সঙ্গে যুক্ত থাকাটা তারা হয়তো নিরাপদ মনে করেন না। তবুও, রাশিয়ায় অবস্থানরত অন্যান্য পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমের মতো আমরা এখনও ক্রেমলিনের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পাই। মাঝে মাঝে আমি প্রেসিডেন্ট পুতিনকে প্রশ্ন করার সুযোগও পাই।
সংবাদ সম্মেলনে একটি মাত্র প্রশ্ন ও তার উত্তরও অনেক সময় রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের চিন্তাভাবনা বুঝতে সাহায্য করে। ভ্লাদিমির পুতিনের মনে পশ্চিমাদের প্রতি তীব্র ক্ষোভ রয়েছে। ন্যাটোর পূর্বদিকে বিস্তার এবং পশ্চিমা নেতাদের কাছ থেকে বছরের পর বছর ধরে রাশিয়া যে অসম্মান পেয়েছে বলে তিনি মনে করেন—এসবই তাকে চালিত করে। তার সমালোচকরা তাকে সাম্রাজ্যবাদী এবং রাশিয়ার প্রভাব বলয় পুনরুদ্ধারের চেষ্টাকারী বলে অভিযুক্ত করেন।
গত ডিসেম্বরে আমি প্রেসিডেন্ট পুতিনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, "আর কি কোনো নতুন 'বিশেষ সামরিক অভিযান' হবে?" ক্রেমলিন নেতা উত্তর দিয়েছিলেন, "যদি আপনারা আমাদের সম্মানের চোখে দেখেন, আমাদের স্বার্থকে সম্মান করেন... তবে আর কোনো অভিযান হবে না।" এতে প্রশ্ন জাগে: যদি ভ্লাদিমির পুতিন মনে করেন যে রাশিয়ার স্বার্থকে সম্মান জানানো হচ্ছে না, তখন কী হবে?
ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে ফিরে আসার পর, মস্কো মনে করছে ওয়াশিংটন এখন তাদের কিছুটা সম্মান দিচ্ছে। গত আগস্টে আলাস্কা সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রাশিয়ার নেতার জন্য লাল গালিচা বিছিয়ে দিয়েছিলেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প ভ্লাদিমির পুতিনকে সেখানে আমন্ত্রণ জানিয়ে তাকে বিশ্বমঞ্চে ফিরিয়ে এনেছিলেন, যদিও সেই সম্মেলন ইউক্রেন যুদ্ধ থামাতে ব্যর্থ হয়েছিল।
অবশ্য সব কিছুই মস্কোর পক্ষে যায়নি। ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো, যিনি রাশিয়ার মিত্র ছিলেন, সম্প্রতি মার্কিন সেনাদের হাতে আটক হয়েছেন। এরপর আমেরিকা আটলান্টিক মহাসাগরে একটি তেলের ট্যাঙ্কার জব্দ করে, যা রাশিয়ার পতাকাবাহী ছিল।
তবুও অবাক করার বিষয় হলো, গত ১২ মাসে ক্রেমলিন আমেরিকার খুব একটা সমালোচনা করেনি। মস্কো হয়তো বিশ্বাস করে, ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখলে ইউক্রেন যুদ্ধটি এমনভাবে শেষ করা সম্ভব হবে যা ক্রেমলিনের জন্য লাভজনক। তাই এখন রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় মিডিয়ায় পশ্চিমা-বিরোধী যত বিষদগার, তার বেশিরভাগই আমেরিকা নয়, বরং ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাজ্যের দিকেই তাক করা হয়েছে।
সূত্র : বিবিসি
আরটিএনএন/এআই
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!