ভারতের আসামের বাসিন্দা ৫০ বছর বয়সী ফজীলা খাতুনের এই প্রশ্ন। তিনি বলেন, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ গেলে তো আমাদের নাগরিকত্বই শেষ হয়ে যাবে। চিন্তায় ঘুমাতে পারিনা, কোন কিছু খেতে পারি না, চিন্তায় ভালো লাগে না। ঘর বাড়ি ভেঙে দেওয়ার পরে এখন যদি নাগরিকত্বও না থাকে, তাহলে আমরা কোথায় যাব?
ফজীলা খাতুন ও তার মতো আরো ৩৩১ টি পরিবার বর্তমানে প্লাস্টিকের চাদরে তৈরি ছোট ছোট বস্তিঘরে থাকেন। দেড় মাস আগে তারা লুটুমারি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের নানা গ্রাম থেকে নগাঁও জেলার এই অঞ্চলে উঠে এসেছেন। খবর বিবিসি বাংলার।
তাদের গ্রাম জঙ্গলের জমিতে জবরদখল করে গড়ে উঠেছে অভিযোগ করে ভারত সরকার গত ২৯ নভেম্বর থেকে দুদিনের উচ্ছেদ অভিযান চালায়।
একই অভিযোগে ওই প্রদেশের আরো অঞ্চলে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছে ভারত সরকার। উচ্ছেদ অভিযানে যে সকল পরিবারের ঘর বাড়ি ভেঙে দেয়া হয়েছে তারা অন্যত্র সরে যাওয়ায় আসামের ভোটার তালিকায় যে বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়া চলছে, তার অধীনে এদেরকে নোটিশ পাঠাচ্ছে নির্বাচন কমিশন।
শুধু আসাম নয়, ভারতের উত্তরপ্রদেশেও একই ভাবে মুসলিমদের উপর উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছে ভারত সরকার। তবে উত্তরপ্রদেশ ও আরো কয়েকটি রাজ্যে যে বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর চলছে, তার সঙ্গে আসামের ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধনের পার্থক্য রয়েছে। আসামে এই প্রক্রিয়াটি অনেক বেশি সংবেদনশীল এবং আইনি জটিলতাযুক্ত।
ভারতীয় নির্বাচন কমিশনের একটি নোটিশ দেখিয়ে ফাজিলা খাতুন বলেন, নোটিশ পাওয়ার পর আমি আমার ছেলেদের নিয়ে যে যে অফিসে যেতে বলা হয়েছে, প্রত্যেকটি অফিসে গিয়েছি। কর্মকর্তাদের প্রত্যেকটা নথি দেখিয়েছি। তিন-চার বার শুনানিতে ডাকা হয়েছিল আমাকে। না গেলে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দিয়ে দেওয়া হত।
ফজীলা খাতুন জানান, আমার মনে এখনও ভয় আছে। দিুশ্চিন্তা হচ্ছে, নাগরিকত্ব না থাকলে আমাদের কী হবে? তার মতো যারা আছেন তারা বলছেন, আমাদের নাম বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা কার কাছে যাব, কী করব কিছুই ভেবে পাচ্ছি না।
বিবিসির এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, আসামের উচ্ছেদ অভিযানে যাদের ঘর বাড়ি ভেঙে দেওয়া হয়েছিল তারেদ ভোটার তালিকায় বিশেষ সংশোধন বা এএসআর প্রক্রিয়ার শুনানির জন্য যেতে হয়েছিল। এদরেকে শুনানিতে ডাকার একটি কারণ হলো, যাদেরকে উচ্ছেদ করা হয়েছে তাদের ঠিকানা বদলে গেছে, এমনকি অনেকের বিধানসভাকেন্দ্রও পাল্টে গেছে।
ফজীলা খাতুনদের এখন হোজাই জেলার নির্বাচনী কর্মকর্তাদের কাছে যেতে হচ্ছে। একই রকম নোটিশ পেয়েছেন তারই প্রতিবেশী, ৫১ বছর বয়সী মিনারা বেগম।
তিনি বলেন, আমরা যে জমিতে ৪০ বছর ধরে বসবাস করছিলাম, সেই জমিটা নাকি সরকারের, তাই আমাদেরকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। থাকার জায়গা ছিল না, এখানে অন্যলোকের জমিতে প্লাস্টিকের ছাউনি দেওয়া ঘর করে থাকতে হচ্ছে। এখন ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার কথা হচ্ছে। নোটিশ পাওয়ার পর এ পর্যন্ত কয়েকদিন শুনানিতে গিয়েছি। সব নথি জমা করেছি, কিন্তু আমাদের তাও উত্ত্যক্ত করা হচ্ছে। জানি না দশই ফেব্রুয়ারি কী হবে!
১০ ফেব্রুয়ারি আসামের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করার কথা। এই দিনটি নিয়ে তাই বাংলাভাষী মুসলিমদের মধ্যে আতঙ্ক কাজ করছে।
বাংলাভাষী মুসলিমদের উপর লাগাতার আক্রমণ
আসামে বাংলাভাষী মুসলিমদেরকে কটূক্তি করে ‘মিঞা’ বলা হয়। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত বিশ্বশর্মা সম্প্রতি মুসলিমদেরকে নিশানা করে বিভিন্ন আক্রমণাত্মক কথা বলে।
গত বছর রাজ্যে এএসআর ঘোষিত হওয়ার পর ২০ নভেম্বর মুখ্যমন্ত্রী সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, ‘যতদিন আমি মুখ্যমন্ত্রী আছি, কোনো মিঞাঁ শান্তিতে থাকতে পারবেন না। এটা নিশ্চিত। যে মিঞারা সন্দেহভাজন নাগরিক তাদের হয়রানি করাই আমার কাজ। আমাকে মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ার থেকে সরিয়ে দেওয়া হলেই মিঞাঁ সম্প্রদায় শান্তি পেতে পারে।’
মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত বিশ্বশর্মার এই বক্তব্য থেকে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের জন্য তার নির্বাচনী কৌশলের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এরপর থেকেই তিনি মিঞাঁ মুসলমানদের বিরুদ্ধে একপ্রকার লড়াই শুরু করেন।
এ বছর জানুয়ারি মাসে মুখ্যমন্ত্রী মন্তব্য করেন, যে যেভাবে পারবেন, মিঞাঁদের হেনস্থা করুন। আপনারাও তাদের কষ্ট দিন। রিকশার ভাড়া যদি পাঁচ টাকা চায়, তাহলে আপনি চার টাকা দিন। হয়রানি হলেই তারা আসাম থেকে চলে যাবে।
মিঞাঁদের বিষয়টা কোনো ইস্যু নয়। হেমন্ত বিশ্বশর্মা এবং বিজেপি সরাসরি মিঞাঁদের বিরুদ্ধে। এখন আমি সবাইকে উৎসাহিত করছি যাতে মিঞাঁদের হেনস্থা করা হয়।
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রেক্ষিতে মিনারা বেগম প্রশ্ন করেন, আমাদের হয়রানি করা হচ্ছে কেন? আসাম সরকার কী করতে চাচ্ছে?
মিনারা বেগম বলেন, ‘মুখ্যমন্ত্রী বলছেন যে মিঞাঁ মুসলমানদের হেনস্থা চালাতেই থাকবেন। কিন্তু আমরা তো এদেশেরই নাগরিক। মুসলমান হয়ে আমরা কি কোনো অপরাধ করে ফেলেছি? তাই যদি হয় সরকার আমাদের একেবারে মেরে কেন ফেলছে না? এত হেনস্থার থেকে ভাল হত যদি আমাদের সরাসরি গুলি করে মেরে ফেলত।’
রায়হান/আরটিএনএন
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!