পাকিস্তান, ইসলামাবাদ, ইমরান খান, তেহরিক ই ইনসাফ
ইমরান খানের ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি কমে মাত্র ১৫ শতাংশে এসে ঠেকেছে   ছবি: সংগৃহীত

কারাগারে থাকাকালীন অভিযোগ উপেক্ষা করায় পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি কমে মাত্র ১৫ শতাংশে এসে ঠেকেছে। জেল কর্তৃপক্ষ টানা তিন মাস তার অভিযোগের প্রতি কর্ণপাত করেনি বলে দাবি করেছেন আদালত-নিযুক্ত একজন আইনজীবী। এই ঘটনা তার কারাবাস নিয়ে চলমান বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট (এসসিপি) কর্তৃক নিযুক্ত ‘অ্যামিকাস কিউরি’ (আদালতের আইনি সহায়তাকারী বন্ধু) ব্যারিস্টার সালমান সাফদার গত ১০ ফেব্রুয়ারি ইমরান খানের সঙ্গে দুই ঘণ্টা কথা বলেন এবং কারাগার পরিদর্শন করেন। এরপর বুধবার তিনি আদালতে সাত পৃষ্ঠার একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দেন। প্রতিবেদনে ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে কারাবন্দী ৭৩ বছর বয়সী এই নেতার স্বাস্থ্যের অবনতি এবং দীর্ঘমেয়াদী নিঃসঙ্গ কারাবাস (আইসোলেশন) নিয়ে উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

এতে বলা হয়, সাবেক জেল সুপার আব্দুল গফুর আনজুমের অধীনে থাকা গত তিন মাসে ইমরান খানের দৃষ্টিশক্তি দ্রুত এবং ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বারবার ঝাপসা ও অস্পষ্ট দেখার অভিযোগ করা সত্ত্বেও "জেল কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগ আমলে নিয়ে কোনো ব্যবস্থাই নেয়নি।" সাফদার তার রিপোর্টে লিখেছেন, "তিনি (ইমরান খান) জানিয়েছেন যে পরবর্তীতে হঠাৎ করেই তিনি ডান চোখে দেখার ক্ষমতা পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেন।"

২০২৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারির একটি মেডিকেল রিপোর্টে এই অবস্থাকে ‘রাইট সেন্ট্রাল রেটিনাল ভেইন অক্লুশন’ (চোখের রেটিনার শিরায় রক্ত জমাট বাঁধা) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পরবর্তীতে ইসলামাবাদের একটি শীর্ষ সরকারি হাসপাতালের চক্ষু বিশেষজ্ঞও এই রোগ নির্ণয় নিশ্চিত করেছেন, যা চোখের রেটিনার মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। সাফদার পর্যবেক্ষণ করে বলেন, সাক্ষাতের সময় সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে "দৃশ্যত বিচলিত এবং গভীরভাবে ব্যথিত" মনে হয়েছে এবং তার চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়ছিল, যা মুছতে বারবার টিস্যু ব্যবহার করতে হচ্ছিল।

প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, "আর সামান্য দেরিও আবেদনকারীর (ইমরান খান) সুস্থতার জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।" এতে অবিলম্বে ইমরান খানের ব্যক্তিগত চিকিৎসকসহ বিশেষজ্ঞ চক্ষু চিকিৎসকদের দিয়ে স্বাধীন পরীক্ষার সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনটি জমা হওয়ার পর সুপ্রিম কোর্ট দ্রুত পদক্ষেপ নেয়। আদালত ইমরান খানের চোখ পরীক্ষার জন্য একটি মেডিকেল বোর্ড গঠনের নির্দেশ দেয় এবং যুক্তরাজ্যে বসবাসরত তার দুই ছেলের সঙ্গে ফোনে কথা বলার অনুমতি দেয়। উভয় কাজ ১৬ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রধান বিচারপতি ইয়াহিয়া আফ্রিদি মন্তব্য করেন, "ইমরান খানের স্বাস্থ্যের বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং এখানে হস্তক্ষেপ প্রয়োজন ছিল।"

স্বাস্থ্যের উদ্বেগ ও পিটিআইয়ের প্রতিক্রিয়া

বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং তার দৃষ্টিশক্তির এই মারাত্মক অবনতির জন্য জেল কর্তৃপক্ষের আচরণের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। দলটি বলেছে, ইমরান খানের স্বাস্থ্যের অবনতির জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে। বিবৃতিতে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়, "ইমরান খানের স্বাস্থ্যের কোনো ক্ষতি হলে তার জবাবদিহি করতে হবে।"

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, "আমরা দাবি করছি, ইমরান খানকে অবিলম্বে তার ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের কাছে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হোক এবং চোখের বিশেষ চিকিৎসার জন্য তার মেডিকেল টিমের সুপারিশকৃত কোনো হাসপাতালে কালবিলম্ব না করে স্থানান্তর করা হোক। তার আইনজীবীদের সঙ্গে অবাধে দেখা করা এবং পারিবারিক সাক্ষাতের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া তার মৌলিক অধিকার।"

পাকিস্তানের সাবেক ক্রিকেট তারকা ও বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক ইমরান খান ২০১৮ সালে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। বিরোধীদের অভিযোগ ছিল, শক্তিশালী সেনাবাহিনীর সহায়তায় নির্বাচনে কারচুপির মাধ্যমে তিনি ক্ষমতায় এসেছিলেন। চার বছর পর অনাস্থা ভোটে ক্ষমতাচ্যুত হন তিনি। ইমরান খান অভিযোগ করেন, সেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হওয়ায় তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগসাজশ করে তাকে সরিয়েছে। তবে সেনাবাহিনী ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই এই অভিযোগ অস্বীকার করে। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে তিনি সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকে তার এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী করে আসছেন।

রাজনৈতিক প্রভাব ও বিশ্লেষকদের মত

২০২৩ সালের আগস্ট থেকে রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা জেলে বন্দী আছেন ইমরান খান। সাফদারের প্রতিবেদন নিশ্চিত করেছে যে, তিনি প্রায় দুই বছর চার মাস ধরে সেখানে নির্জন কারাবাসে (solitary confinement) রয়েছেন। ২০২৪ সালের জুনে জাতিসংঘের একটি ওয়ার্কিং গ্রুপ জানিয়েছিল, ইমরান খানের আটকের কোনো আইনি ভিত্তি নেই এবং তাকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখতেই এটি করা হয়েছে।

ইমরান খানের সঙ্গে সাক্ষাতে দীর্ঘদিনের কড়াকড়ির পরই সুপ্রিম কোর্ট পর্যবেক্ষক নিয়োগের এই সিদ্ধান্ত নেয়। প্রধান বিচারপতি আফ্রিদি জোর দিয়ে বলেছিলেন, সাফদারকে যেন সম্মানের সঙ্গে এবং বাধাহীনভাবে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত পাঁচ মাস ধরে ইমরান খানকে তার প্রধান আইনজীবী ও আইনি দলের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। ইমরান খান সাফদারকে জানিয়েছেন, তার বোন বা পরিবারের অন্য সদস্যদেরও দেখা করার অনুমতি মেলেনি। জেল সুপার পরিবর্তনের পর কেবল তার স্ত্রীকে (যিনি নিজেও দুর্নীতির দায়ে কারাবন্দী) প্রতি মঙ্গলবার প্রায় ৩০ মিনিটের জন্য দেখা করার অনুমতি দেওয়া হয়।

সিনিয়র রাজনৈতিক বিশ্লেষক বেনজির শাহ আল জাজিরাকে বলেন, জনগণ স্বচ্ছতা প্রত্যাশা করে এবং ইমরান খানের পরিবারের উত্তর পাওয়ার অধিকার আছে।

তিনি বলেন, "সরকার শুরু থেকেই ইমরান খানের স্বাস্থ্যের বিষয়টি নিয়ে লুকোচুরি করেছে। প্রথমে খবরটি গোপন রাখা হয়, পরে স্থানীয় পত্রিকায় আসার পর বিষয়টিকে তুচ্ছ বলে উড়িয়ে দেওয়া হয় এবং শেষ পর্যন্ত পরিবারের অজান্তেই চিকিৎসা প্রক্রিয়া চালানো হয়।" তিনি আরও বলেন, "একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দীর্ঘদিনের এমন আচরণ প্রমাণ করে যে বর্তমান পাকিস্তান সরকারের কাছে মৌলিক মানবাধিকারের কোনো গুরুত্ব নেই।"

সূত্র : আল জাজিরা

আরটিএনএন/এআই