আফগানিস্তান, পাকিস্তান, বিমান হামলা
আফগানিস্তানের নানগারহার অন্তত ১৭ জন নিহত হয়েছে,   ছবি: সংগৃহীত

রোববার ভোরে (২২ ফেব্রুয়ারি) পাকিস্তানের সেনাবাহিনী আফগানিস্তানে বিমান হামলা চালিয়েছে।  আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেছে, সীমান্ত প্রদেশ নানগারহার ও পাকতিকায় "একটি ধর্মীয় স্কুল ও বসতবাড়িতে হামলা চালানো হয়েছে", যার ফলে "নারী ও শিশুসহ বহু মানুষ হতাহত হয়েছে।" আফগান সূত্র আল জাজিরাকে জানিয়েছে, নানগারহারে অন্তত ১৭ জন নিহত হয়েছে, তবে পাকতিকার হতাহতের সংখ্যা এখনও জানা যায়নি।

এই হামলা দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিকে হুমকির মুখে ফেলেছে। গত অক্টোবরে সীমান্তে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে ডজনখানেক সেনা, বেসামরিক নাগরিক ও সন্দেহভাজন যোদ্ধা নিহত হওয়ার পর আলোচনার মাধ্যমে ওই যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

পাকিস্তানের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এক্সে (সাবেক টুইটার) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, দেশটির সেনাবাহিনী পাকিস্তান তালেবান বা তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) এবং এর সহযোগীদের সাতটি ক্যাম্প ও আস্তানার বিরুদ্ধে "গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সুনির্দিষ্ট অভিযান" চালিয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, সীমান্ত অঞ্চলে ইসলামিক স্টেট গোষ্ঠীর একটি সহযোগী সংগঠনের ওপরও হামলা চালানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় জানায়, ইসলামাবাদ এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় বাজাউর ও বান্নু জেলায় সাম্প্রতিক হামলাগুলো যে "আফগানিস্তানভিত্তিক নেতৃত্ব ও হ্যান্ডলারদের নির্দেশে" চালানো হয়েছে, সে বিষয়ে তাদের কাছে "চূান্ত প্রমাণ" রয়েছে।

তারা আরও জানায়, পাকিস্তান বারবার আফগানিস্তানের তালেবান সরকারকে অনুরোধ করেছে যেন সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার করে হামলা চালাতে না পারে। কিন্তু কাবুল "কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে" ব্যর্থ হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, পাকিস্তান "সর্বদা অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চেষ্টা করেছে", তবে পাকিস্তানি নাগরিকদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষাই তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।

আল জাজিরার কামাল হায়দার বলেন, "পাকিস্তানিরা জোর দিয়ে বলছে এগুলো আফগানিস্তানের ভেতরে থাকা টিটিপি এবং এর সহযোগী গোষ্ঠীগুলোর ক্যাম্প ও আস্তানার বিরুদ্ধে গোয়েন্দাভিত্তিক অভিযান। তারা বেশ কয়েকবার আফগান কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করেছে যে, দোহা চুক্তিতে তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল আফগান মাটি অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে না।" উল্লেখ্য, ২০২০ সালে কাতারের দোহায় তালেবান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই চুক্তি সই করেছিল।

উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের বান্নু জেলায় নিরাপত্তা বাহিনীর বহরে আত্মঘাতী বোমা হামলায় এক লেফটেন্যান্ট কর্নেলসহ দুই সেনা নিহত হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরই আফগানিস্তানে এই বিমান হামলা চালাল পাকিস্তান।

গত সোমবার পাশের জেলা বাজাউরে বন্দুকধারীদের সহায়তায় এক আত্মঘাতী বোমা হামলাকারী বিস্ফোরকভর্তি গাড়ি নিয়ে নিরাপত্তা চৌকির দেয়ালে ধাক্কা দেয়। এতে ১১ জন সেনা ও এক শিশু নিহত হয়। কর্তৃপক্ষ পরে জানায়, হামলাকারী একজন আফগান নাগরিক ছিল। গত ৬ ফেব্রুয়ারি ইসলামাবাদের তারলাই কালান এলাকায় খাদিজা তুল কুবরা মসজিদে জোহরের নামাজের সময় আরেক আত্মঘাতী বোমা হামলায় অন্তত ৩১ জন মুসল্লি নিহত এবং ১৭০ জন আহত হন। ইসলামিক স্টেট গোষ্ঠী ওই হামলার দায় স্বীকার করেছিল।

কড়া নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা রাজধানীতে বোমা হামলা বিরল হলেও তিন মাসের মধ্যে খাদিজা তুল কুবরা মসজিদে এটি ছিল দ্বিতীয় হামলা, যা পাকিস্তানের প্রধান শহরগুলোতে আবারও সহিংসতা ফিরে আসার আশঙ্কা জাগিয়েছে। সে সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী জানিয়েছিল, "হামলার পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ এবং মতাদর্শিক দীক্ষা আফগানিস্তানেই দেওয়া হয়েছে।"

রবিবার পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে তালেবানের ওপর চাপ সৃষ্টি করার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করে বলেছে, তারা যেন দোহা চুক্তির প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে। মন্ত্রণালয় জানায়, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য এই পদক্ষেপ "অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ"। অন্যদিকে, আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় পাকিস্তানের হামলাকে "আন্তর্জাতিক আইন এবং ভালো প্রতিবেশীসুলভ আচরণের লঙ্ঘন" বলে নিন্দা জানিয়েছে।

তারা এর জবাব দেওয়ারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, "বেসামরিক মানুষ ও ধর্মীয় স্থাপনায় হামলার জন্য আমরা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে দায়ী করছি। যথাসময়ে আমরা এর পরিমিত ও উপযুক্ত জবাব দেব।"

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানে সহিংসতা বেড়েছে, যার বেশির ভাগই টিটিপি এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর কাজ বলে অভিযোগ রয়েছে। ইসলামাবাদ টিটিপির বিরুদ্ধে আফগানিস্তানের ভেতর থেকে কাজ করার অভিযোগ আনলেও গোষ্ঠীটি তা অস্বীকার করে আসছে।

সূত্র : আল জাজিরা

আরটিএনএন/এআই