ইরান যুদ্ধ
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে ব্যাপক অস্থিরতা।   ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান এবং ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান সংঘাত এক ভয়াবহ মোড় নিয়েছে। বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি রুট 'হরমুজ প্রণালী'তে জাহাজ চলাচল কার্যত স্থবির হয়ে পড়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এক ধাক্কায় প্রায় ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি ব্যারেল ৮২ মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে।

রণক্ষেত্র হরমুজ প্রণালী

হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাওয়ার সময় অন্তত দুটি তেলবাহী জাহাজে সরাসরি হামলা চালানো হয়েছে। এছাড়া তৃতীয় একটি জাহাজের খুব কাছে শক্তিশালী বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। ইরান দাবি করেছে, তাদের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ডস কোর (আইআরজিসি) যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের তিনটি ট্যাঙ্কার লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে, যা বর্তমানে 'জ্বলন্ত অবস্থায়' রয়েছে।

এই ঘটনার পর থেকেই ওই জলপথে নৌ-যান চলাচলের ওপর সতর্কতা জারি করেছে তেহরান। জাহাজ চলাচলের ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্ম 'কেপলার'-এর তথ্যমতে, বর্তমানে অন্তত ১৫০টি তেলের ট্যাঙ্কার ওই এলাকায় নোঙর ফেলে দাঁড়িয়ে আছে, যা বিশ্ব সরবরাহ ব্যবস্থাকে অচল করে দিয়েছে।

তেলের বাজারে অস্থিরতা 

সংঘাতের খবরে বিশ্ববাজারে ব্রেন্টের অপরিশোধিত তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে ৮২ ডলারের ওপরে উঠলেও পরবর্তীতে তা কিছুটা কমে ৭৯ ডলারে থিতু হয়েছে। অন্যদিকে মার্কিন তেলের দাম ৭.৬% বেড়ে ৭২.২০ ডলারে দাঁড়িয়েছে।

জ্বালানি বিশ্লেষক শৌল কাভোনিকের মতে, "জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার স্পষ্ট লক্ষণ না দেখা পর্যন্ত তেলের দাম কমার সম্ভাবনা ক্ষীণ।" অন্যদিকে দুবাই ভিত্তিক কামার এনার্জির প্রধান রবিন মিলস জানিয়েছেন, বাজার এখনই পুরোপুরি 'সংকটে' না পড়লেও ব্যবসায়ীরা অত্যন্ত সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। তবে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে অনেক বিশ্লেষক আশঙ্কা করছেন।

বিশ্ব অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব

জ্বালানি তেলের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি কেবল পরিবহনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। অর্থনীতিবিদ সুবিথা সুব্রামানিয়াম সতর্ক করে বলেছেন, "তেলের দাম দীর্ঘ সময় চড়া থাকলে তা খাদ্য, কৃষি ও শিল্প পণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেবে, যা সরাসরি বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি সৃষ্টি করবে।" এর ফলে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার কমানোর যে পরিকল্পনা করছিল, তা থমকে যেতে পারে।

বাজার স্থিতিশীল করতে ওপেক প্লাসের উদ্যোগ

তেলের বাজারের এই অস্থিরতা সামাল দিতে জ্বালানি তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর সংগঠন 'ওপেক প্লাস' (OPEC+) জরুরি ভিত্তিতে দৈনিক উৎপাদন ২ লাখ ৬ হাজার ব্যারেল বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ রুট যদি অবরুদ্ধ থাকে, তবে উৎপাদন বাড়িয়েও বাজারে তেলের ঘাটতি মেটানো কঠিন হবে।

বিশ্বের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ মেটানো হয় হরমুজ প্রণালী দিয়ে। বর্তমানে ওই এলাকাটি যে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে, তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের পকেটে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং ইরানের পাল্টা ব্যবস্থার ওপরই এখন নির্ভর করছে বিশ্ব তেলের বাজার তথা বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ।