শান্ত দুপুর, ব্যস্ত বিকেল, দ্বিতীয় শুক্রবারে বইপ্রেমীদের আগমন বাড়ছে
শান্ত দুপুর, ব্যস্ত বিকেল, দ্বিতীয় শুক্রবারে বইপ্রেমীদের আগমন বাড়ছে   আরটিএনএন

আজ ২১শে ফাল্গুন ১৪৩২, অর্থাৎ ৬ মার্চ শুক্রবার, অমর একুশে বইমেলা’র ৯ম দিন। মেলার দ্বিতীয় শুক্রবার হওয়ায় সাপ্তাহিক ছুটির দিনটি বইপ্রেমীদের জন্য অপেক্ষিত ছিল। যদিও প্রথম সপ্তাহে, রমজানের সঙ্গে মিল রেখে দর্শক উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম ছিল, আজ সেই ফাঁক ধীরে ধীরে পূরণ হতে শুরু করেছে।

দিনের শুরুতে মাঠ তুলনামূলকভাবে শান্ত ছিল। সকালবেলা প্রকাশনার স্টলগুলোতে পড়াশুনোপ্রেমী ছাত্রছাত্রী, তরুণ পেশাজীবী এবং পরিবারের ছোট দলগুলোই বেশি দেখা গেছে। তবে বিকেলের দিকে দর্শকের সংখ্যা ক্রমশ বেড়ে যায়। আজ আলোর ঠিকানা প্রকাশনির স্টলে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম, যিনি কবি মুনাওয়ার হাসনাইনের লেখা ‘গোলাপের ভাঁজে ভাঁজে বিপ্লবের দাগ’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন।

বেশ কিছু জনপ্রিয় প্রকাশক যেমন বাতিসার, প্রথমা, প্রচ্ছদ, অন্যপ্রকাশ এবং কথাপ্রকাশ তাদের স্টলে কিছুটা ভিড় দেখতে পায়। তবে সামগ্রিকভাবে মেলা এখনও পূর্ণ উৎসবের ছন্দে পৌঁছায়নি। অনেক প্রকাশক মনে করছেন, শান্ত ভিড়ের মধ্যেও দর্শকরা বই খুঁজে পাওয়া এবং পছন্দমতো নির্বাচন করার সুবিধা পাচ্ছেন।

বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মোহাম্মদ আজম বলেন, সাপ্তাহিক ছুটির দিনে সাধারণত সবচেয়ে বেশি ভিড় হয়। গত শুক্রবার অনেক দর্শক এসেছিলেন, এবং আশা করছি আগামীকাল যারা আসতে পারেননি তারা মেলায় আসবেন। এতে মেলা আরও প্রাণবন্ত হবে।

মেলায় শিশুদের জন্য বিশেষ আয়োজনও রয়েছে। শিশুপ্রহর উপলক্ষে নির্ধারিত মঞ্চে গল্প বলা, ছড়া আবৃত্তি, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা এবং পাপেট শো চলছে। নিজের পছন্দের লেখকের বই খুঁজে স্টল ঘুরে বেড়াচ্ছে শিশু ও যুবকরা। এবারের শিশু চত্বরে মোট ৬৩টি প্রতিষ্ঠান এবং ১০৭টি ইউনিটের স্টল রয়েছে। কাকতাড়ুয়া পাপেটের জনপ্রিয় শিশুতোষ শো ‘সিসিমপুর’ এবারও শিশুদের আকর্ষণীয় বিনোদনের কেন্দ্রবিন্দু।

সকাল ১০টায় বাংলা একাডেমির সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ সভাগৃহে অমর একুশে শিশু-কিশোর আবৃত্তি প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। এতে ক, খ এবং গ শাখায় মোট ৩০ জন প্রতিযোগী অংশ নেন। বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন নাসিম আহমেদ, টিটো মুনশী এবং অনন্যা লাবণী পুতুল।

বিকেল ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘জন্মশতবর্ষ: কলিম শরাফী’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অণিমা রায়, আলোচনায় অংশ নেন সাইম রানা, এবং সভাপতিত্ব করেন সাধন ঘোষ। অণিমা রায় বলেন, কলিম শরাফী সেই বিরল প্রতিভার অধিকারী ছিলেন, যাঁর কণ্ঠস্বর সংগীতের সুষমা বহনের পাশাপাশি জাতির আত্মপরিচয়ের সংকটময় মুহূর্তে অস্তিত্ব সংরক্ষণের উচ্চারণে পরিণত হয়েছিল। 

সাইম রানা উল্লেখ করেন, কলিম শরাফী সচেতনভাবে রাজনীতির মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছিলেন এবং বাংলার সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। সাধন ঘোষ যোগ করেন, কলিম শরাফী ছিলেন বাংলাদেশের সর্বজনীন সংগীতগুরু, যিনি তার বহুমাত্রিক প্রতিভার মাধ্যমে জীবনকে আলোকিত করেছেন।

দিনশেষে বিকেল ৪টায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আবৃত্তি ও গান পরিবেশন করেন বিভিন্ন শিল্পী, যা মেলাকে আরও প্রাণবন্ত করেছে। লেখক মৃদুল মাহবুব এবং এহসান মাহমুদ তাদের বই নিয়ে আলোচনা করেন, পাঠক এবং দর্শকরা তাদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করতে পারছেন।

আজকের মেলা প্রমাণ করছে, প্রথম সপ্তাহের অপেক্ষা কম ভিড়ের পরও বইপ্রেমীরা এখন ধীরে ধীরে মেলার দিকে ফিরে আসছেন। শান্ত দুপুরের ব্রাউজিং থেকে ব্যস্ত বিকেলের আয়োজন সব মিলিয়ে অমর একুশে বইমেলা যেন পাঠক এবং প্রকাশকদের জন্য এক সমৃদ্ধ সাহিত্য উৎসবে রূপ নিয়েছে।