২০২৪-২৫ সালে বাংলাদেশে নারী অধিকার ও অগ্রগতির চিত্রটি একদিকে যেমন নতুন আশার সঞ্চার করেছে, অন্যদিকে কিছু ডিজিটাল ও সামাজিক চ্যালেঞ্জও সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নারী শিক্ষার্থী ও সাধারণ নারীরা নেতৃত্বের পাশাপাশি রাজপথেও সক্রিয় ছিলেন। যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীদের নতুন বাতায়ন উন্মুক্ত করেছে। সংরক্ষতি আসনের দিকে নারীদের তীর্থের কাকের মত চেয়ে থাকার দীর্ঘ পরিক্রমার ইতি টানার ইঙ্গিত দিয়েছে জুলাই বিপ্লব।
রাজনীতি নিয়ে ভাবনায় নারীরা যেমন সক্রিয় অংশ নিচ্ছে তেমনি নানা নীতি নিধারণী ফোরামেও জায়গা করে নিচ্ছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে নারীদের প্রতিনিধিত্ব এবং নারী অধিকার সংস্কার কমিশন গঠনের মাধ্যমে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পরিবর্তনের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। এবারের জাতীয় নির্বাচনে বেশ কয়েকজন প্রতিশ্রুতিশীল তরুণীর অংশগ্রহণ সে বার্তা জোড়ালো করছে।
২০২৪-২৫ সালের ডাটা অনুযায়ী, বাংলাদেশে সচিব, অতিরিক্ত সচিব এবং জেলা প্রশাসক (DC) ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার (UNO) এর মতো গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী পদে নারীদের সংখ্যা আগের তুলনায় বেড়েছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ১৬০ জন নারী ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
তথ্য-প্রযুক্তি খাতেও দ্রুত এগিয়ে আসছে নারীরা। বাঙলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো’র তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় ২০২৫ সালে আইটি খাতে নারী কর্মীদের হার পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ১২% বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) গবেষণায় নারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ ডাটা সায়েন্টিস্ট, এআই স্পেশালিস্ট এবং সাইবার সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞ হিসেবেও নারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে।
চাকরির পাশাপাশি উদ্যোক্তা হবার প্রবণতাও বেড়েছে বাংলাদেশি নারীদের মধ্যে। উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা এবং ডিজিটাল কমার্সের প্রসারের ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে (SME) নারীদের অংশগ্রহণ ২০% বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বিভিন্ন এনজিও’র ডাটা অনুযায়ী এই তথ্য জানা যায়।
কন্টেন্ট ক্রিয়েশন, ডিজিটাল মার্কেটিং এবং ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে নারীরা এখন সামনের সারিতে। বাংলাদেশে ফেসবুক-ভিত্তিক এন্টারপ্রেনারশিপ গ্রুপের প্রায় ৪০ শতাংশই নারীরা পরিচালনা করছেন।
মোবাইল ব্যাংকিং এবং ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে গ্রাম পর্যায়ের নারীরাও এখন আয়ের পথ খুঁজে পেয়েছেন, যা তাদের পারিবারিক সিদ্ধান্তে গুরুত্ব বাড়িয়েছে। স্বল্পশিক্ষিত নারীরা ঘর সামলানোর পাশাপাশি সংসারের আয় বাড়াতে মোবাইল বাড়ির পাশেই ছোট্ট দোকান বসিয়ে নিত্যপণ্যেরে পাশাপাশি বিকাশ, নগদের মত নানা অ্যাপে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে যুক্ত হচ্ছেন।
খেলাধূলায় নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে ক্রমান্বয়ে। ২০২৪ সালের সাফ (SAFF) চ্যাম্পিয়নশিপ জয় নারী ফুটবলের জন্য একটি মাইলফলক। অন্যান্য আন্তর্জাতিক ইভেন্টে দক্ষিণ এশিয়ার নারী ফুটবল ও ক্রিকেট দলগুলোর সাফল্যও নারী ক্ষমতায়নের নতুন প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০২৬ সালের বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেখা যাচ্ছে, জুলাই বিপ্লবের পর নারীরা গতানুগতিক পেশার বাইরেও এমন কিছু ক্ষেত্রে অভাবনীয় উন্নতি করেছেন যা আগে পুরুষদের একক আধিপত্যের ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হতো।
নারীদের এ অগ্রগতির পাশাপাশি সহিংসতাসহ নানা প্রতিবন্ধকতাও ছিল। ২০২৪ সালে নারীদের নিয়ে সাইবার বুলিং এবং ব্ল্যাক-মেইলিংয়ের হার ১৫% বৃদ্ধি পায়। ২০২৫ সালে এসে বিভিন্ন দেশের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর ব্যবস্থা নিলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নারীরা সবচেয়ে বেশি নিগৃহীত হয়েছেন। বিটিআরসি-র ডাটা অনুযায়ী, সাইবার অপরাধের শিকারদের ৭০% নারী।
শুধু প্রান্তিক পর্যায়ে নয়, সমাজের উচ্চ স্তরেও সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়েছেন নারীরা। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বা কোনো সেক্টরের প্রতিদ্বন্দ্বী হলেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নারীরা হামলার মুখে পড়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ- ডাকসু’র নির্বাচনে ফাতেমা তাসনিম জুমা ও সাবিকুন্নাহার তামান্না চরমভাবে প্রতিপক্ষের দ্বারা আক্রান্ত হন। এ বিষয় নিয়ে তামান্না নিজেই সংবাদমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেন, নারী প্রার্থীদের দমানোর জন্য একটি সুসংগঠিত গোষ্ঠী সাইবার বুলিংকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
'ইসলামোফোবিয়া' ও 'হিজাব-ফোবিয়া' থেকেও সাইবারে উল্লেখেযোগ্য সংখ্যক নারী আক্রান্ত হন। তাছাড়াও ভিন্ন মত প্রকাশ করায় অনেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য ও 'চরিত্র হনন'-এর শিকার হয়েছেন। সম্পাদিত কুরুচিপূর্ণ বিভিন্ন ছবিও ছাড়া হয়েছে ফেসবুকে। ডেইলি স্টার’র একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে নারীদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আক্রমণ করা হয়।
সব কিছু উপেক্ষা করে ২০২৫ সালের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় লিঙ্গ সমতায় শীর্ষে অবস্থান করছে এবং বিশ্বজুড়ে ২৪তম স্থান অধিকার করেছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে নারীর ক্ষমতায়নে বিশ্বে দৃষ্টান্ত স্থাপনে সমর্থ হবে বাংলাদেশ।
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!