আব্দুল আউয়াল মিন্টু বিমানে ভ্রমনের নথি
১৫ ডিসেম্বর ব্যাংকক থেকে ঢাকা ফিরতে আমেরিকান পাসপোর্ট ব্যবহার করেন আব্দুল আউয়াল মিন্টু   ছবি : আরটিএনএন

বালাদেশের সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদের ২ এর (গ) ধারা অনুযায়ী, কোনো বিদেশি নাগরিক বা দ্বৈত নাগরিক জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার যোগ্য নন। এ কারণেই নির্বাচনী হলফনামায় প্রার্থীদের বাধ্যতামূলকভাবে উল্লেখ করতে হয়—তাদের কোনো বিদেশি নাগরিকত্ব আছে কি না এবং থাকলে তা কখন ও কীভাবে ত্যাগ করা হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে ফেনী–৩ (দাগনভূঞা–সোনাগাজী) আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও দলটির ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল আউয়াল মিন্টুকে ঘিরে একাধিক গুরুতর প্রশ্ন ও অভিযোগ সামনে এসেছে।

হলফনামায় নাগরিকত্ব ত্যাগের ঘোষণা

নির্বাচনী হলফনামায় আব্দুল আউয়াল মিন্টু নিজেই স্বীকার করেছেন যে, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ছিলেন। একই হলফনামায় তিনি উল্লেখ করেন, ৯ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে তিনি মার্কিন নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন। এই তথ্যের ভিত্তিতেই নির্বাচন কমিশন ও রিটার্নিং কর্মকর্তা তার মনোনয়নপত্র যাচাই করে বৈধ ঘোষণা করেন।

আপিল ও অভিযোগ: নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রমাণ নেই

তবে মিন্টু আসলে মার্কিন নাগরিকত্ব ত্যাগ করেননি—এমন অভিযোগ তুলেছেন ফেনী–৩ আসনে তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ডা. মোহাম্মদ ফখরুদ্দিন মানিক। এ বিষয়ে তিনি নির্বাচন কমিশনে আপিল দায়ের করেছেন। আপিলে অভিযোগ করা হয়— যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পরিত্যাগের কোনো আনুষ্ঠানিক দলিল নির্বাচন কমিশনে জমা দেননি আব্দুল আউয়াল মিন্টু এরং কেবল হলফনামার ঘোষণার ওপর ভিত্তি করেই মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।

এ বিষয়ে ফেনীর জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মনিরা হক বলেন, “আব্দুল আউয়াল মিন্টু প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়েছেন বলেই তার মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।”

তবে সেই কাগজপত্র দেখতে চাইলে স্থানীয় সাংবাদিকদের তা দেখাতে অস্বীকৃতি জানান রিটার্নিং কর্মকর্তা, যা স্বচ্ছতা নিয়েই নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।

আরটিএনএন-এর অনুসন্ধান: চাঞ্চল্যকর পাসপোর্ট তথ্য-- আরটিএনএন-এর অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নথি।

ডকুমেন্ট অনুযায়ী— ৪ ডিসেম্বর ২০২৫, মার্কিন পাসপোর্ট নম্বর A-36686893 ব্যবহার করে ঢাকা থেকে থাইল্যান্ড ভ্রমণ করেন আব্দুল আউয়াল মিন্টু। ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫ সকাল একই মার্কিন পাসপোর্ট ব্যবহার করে তিনি ঢাকায় ফেরেন। অথচ হলফনামা অনুযায়ী, তিনি ৯ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখেই মার্কিন নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন। প্রশ্ন উঠছে— যদি ৯ ডিসেম্বর নাগরিকত্ব ত্যাগ করা হয়ে থাকে, তাহলে ১৪–১৫ ডিসেম্বর তিনি কীভাবে সেই পাসপোর্ট ব্যবহার করলেন?

হলফনামায় ৯ ডিসেম্বর আমেরিকান নাগরিকত্ব ত্যাগ করার কথা বলেছেন আব্দুল আউয়াল মিন্টু।

মামলার তথ্য গোপনের অভিযোগ

নাগরিকত্বের প্রশ্নের পাশাপাশি মিন্টুর বিরুদ্ধে মামলার তথ্য গোপনের অভিযোগও উঠেছে। নির্বাচনী হলফনামায় তিনি নিজের নামে ২৬টি মামলার তথ্য উল্লেখ করেছেন।

কিন্তু আরটিএনএন-এর অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে, তার নামে মামলা রয়েছে মোট ৩১টি। নির্বাচনী হলফনামায় আব্দুল আউয়াল মিন্টু নিজের নামে থাকা মামলার সংখ্যা উল্লেখ করেছেন ২৬টি। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, তার বিরুদ্ধে থাকা অন্তত চারটি মামলা হলফনামায় উল্লেখই করা হয়নি—যেগুলোর কয়েকটি এখনও বিচারাধীন এবং জামিনে চলমান।

২০১৩ সালের ৯ নভেম্বর, দাগনভূঞা থানায় বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে একটি মামলা দায়ের হয় আব্দুল আউয়াল মিন্টুর নামে। মামলাটির এফআইআর নম্বর ০৩/১২১। এই মামলায় তিনি বর্তমানে জামিনে রয়েছেন এবং আদালতের নির্ধারিত পরবর্তী হাজিরা আগামী ২৩ ফেব্রুয়ারি। অথচ এই চলমান মামলার কোনো তথ্যই তার নির্বাচনী হলফনামায় নেই।

এর আগে, ১৮ মার্চ ২০১৩, একই থানায় আরও একটি গুরুতর মামলা দায়ের হয়। এফআইআর নম্বর ০৬/২৭–এর এই মামলায় অভিযোগ আনা হয়েছে দণ্ডবিধির ১৪৭, ১৪৮, ১৪৯, ৩৪১, ৪২৭, ৩২৩ ও ৩০২ ধারায়। মামলাটি বর্তমানে ফেনীর অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন এবং ১৩ জানুয়ারি এর শুনানির দিন নির্ধারিত রয়েছে। এই মামলার কথাও হলফনামায় উল্লেখ করা হয়নি। শুধু এই দুইটি নয়— ২ মার্চ ২০১৫ তারিখে দায়ের করা একটি মামলা (এফআইআর ০১/২০) এবং১২ নভেম্বর ২০১৩ তারিখে বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে দায়ের করা আরেকটি মামলার তথ্যও হলফনামায় অনুপস্থিত।

নির্বাচন আইন অনুযায়ী, প্রার্থীর বিরুদ্ধে থাকা মামলা সংক্রান্ত তথ্য সম্পূর্ণ ও নির্ভুলভাবে হলফনামায় উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক। কোনো মামলা গোপন করা বা অসম্পূর্ণ তথ্য প্রদান করা হলে, তা মনোনয়নপত্র বাতিলের বৈধ কারণ হিসেবে গণ্য হয়।

এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে— একজন প্রার্থী যখন সংবিধান ও আইনের প্রতি আনুগত্যের শপথ নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেন, তখন এমন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন থাকা কি কেবল ভুল, নাকি এটি আইন লঙ্ঘনের একটি গুরুতর নজির— সেই সিদ্ধান্ত এখন নির্ভর করছে নির্বাচন কমিশনের ওপর।

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আলাল উদ্দিন আলাল বলেন, “পিনাকির বানানো গল্প থেকেই জামায়াতের প্রার্থী আব্দুল আউয়াল মিন্টুর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে। মিন্টু আমেরিকান নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন এবং কাগজপত্র রিটার্নিং কার্যালয়ে জমা দিয়েছেন। রিটার্নিং কর্মকর্তা কাগজ কেন দেখাননি, সেটা আমি জানি না।”

মামলা গোপনের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, “সব নেতাকর্মীর নামেই মামলা আছে। এগুলোর কোনো মূল্য নাই। অনেক সময় এত মামলা মনেও থাকে না। দুই-একটা গোপন হলেও তাতে সমস্যা হওয়ার কথা না।”

মিন্টুর বক্তব্য

নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রসঙ্গে আব্দুল আউয়াল মিন্টু বলেন, “বিষয়টি এখন নির্বাচন কমিশনে শুনানির অপেক্ষায় আছে, তাই বেশি কিছু বলতে চাই না। এগুলো সব জামায়াতিদের ষড়যন্ত্র। আমি অনলাইনে নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন করেছি এবং দেশে ফেরার প্রয়োজনে পাসপোর্ট ব্যবহার করেছি।”

কূটনৈতিক সূত্র জানায়, নির্দিষ্ট নিয়মে মার্কিন নাগরিকত্ব বাতিলের আবেদন করতে হয়। বাতিলের পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে কয়েকমাস সময়  লেগে। কিন্তু কেউ নাগরিকত্ব বাতিলের আবেদন করলে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসার আগ পর্যন্ত ওই পাসপোর্ট ব্যবহার করে আর ভ্রমণ করা যাবে না।