প্রকৃতি ও পাহাড়ের মিতালিতে ঘেরা চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর। একসময় যা ছিল নিছক দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল, গত দুই দশকে তা হয়ে উঠেছে এক রহস্যময় জনপদ। একদিকে উচ্ছেদ অভিযান আর সরকারের মহাপরিকল্পনা, অন্যদিকে ভূমিদস্যুদের থাবা—সব মিলিয়ে জঙ্গল সলিমপুর এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
চট্টগ্রাম সদরের বায়েজিদ থেকে দুই কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত এশিয়ান উইমেন ইউনিভার্সিটির বিপরীত পাশে, লিংক রোডের উত্তর দিকে সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর এলাকাটি প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর পাহাড়জুড়ে বিস্তৃত। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘ সময় ধরে এই বিশাল এলাকাটি সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল। গত ৩০ বছর ধরে পাহাড় কেটে এখানে গড়ে উঠেছে অবৈধ বসতি। স্থানীয়দের মতে, এখানে কয়েক হাজার পরিবার বসবাস করে, যাদের অধিকাংশেরই কোনো বৈধ ভূমি দলিল নেই।
নব্বইয়ের দশকে বিভিন্ন এলাকা থেকে সন্ত্রাসীরা এই এলাকায় এসে আশ্রয় নেয়। পরবর্তীতে তারা বিভিন্ন গ্রুপ-উপগ্রুপে বিভক্ত হয়ে দল গঠন শুরু করে। নিজেদের জন্য পাহাড় কেটে বসতি গড়ে তোলে। শুধু তাই নয়, রিকশাচালক, ট্যাক্সিচালক ও বিভিন্ন নিম্নআয়ের মানুষকে টার্গেট করে মাত্র বিশ হাজার টাকায় প্লট বিক্রি করে শীর্ষ সন্ত্রাসী আলী আক্কাস। চারদলীয় জোট সরকারের সময় জঙ্গল সলিমপুরে আত্মগোপন করে প্রথমে নিজের ও তার বাহিনীর জন্য পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন শুরু করে আক্কাস বাহিনী। ‘ছিন্নমূল সমিতি’ গঠন করে প্লট ক্রেতাদেরই শুধু এই সমিতির সদস্য করা হয়। অবৈধভাবে পানি, শিক্ষা ও বিদ্যুতের ব্যবস্থাও করা হয়।
পরে এই প্লট বাণিজ্যের টাকা ভাগাভাগি নিয়ে নিজেদের মধ্যে কোন্দল শুরু হলে বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আসে। সে সময় র্যাবের ক্রসফায়ারে নিহত হয় আলী আক্কাস। এরপর কিছু সময়ের জন্য অপরাধ তৎপরতা স্তিমিত থাকলেও তা বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। ২০০৮–০৯ ও ২০১২–১৩ সালে যৌথ বাহিনীর বিভিন্ন অভিযানে বিপুলসংখ্যক আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার হয় এবং সন্ত্রাসীদের নামে মামলা হয়। পরে যৌথ বাহিনীর অভিযান বন্ধ হয়ে গেলে আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে সন্ত্রাসীরা। পরবর্তীতে ২০২২ ও ২০২৩ সালে অভিযান চালাতে গিয়ে জেলা প্রশাসনের সদস্যরা আহত হন। ২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর অবৈধ ঘরবাড়ি উচ্ছেদ অভিযান শেষে ফেরার পথে তৎকালীন নির্বাহী জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ওমর ফারুক ও সীতাকুণ্ড থানার ওসি-সহ ২০ জন আহত হন। এর আগে ২০২২ সালের ২ আগস্টও অভিযানে হামলার শিকার হন জেলা প্রশাসনের সদস্যরা।
‘মশিউর বাহিনী’র কারণেও জঙ্গল সলিমপুর আবার আলোচনায় আসে। পাহাড়ের গভীরে তারা নিজস্ব শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। একাধিক লোহার গেট তৈরি করে আলাদা একটি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করা হয়। শুধুমাত্র এলাকার বাসিন্দারা ছাড়া বাইরের লোকজনের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। এমনকি তাদের নিজস্ব পরিচয়পত্রও ছিল। অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে এলাকাটি পরিচিতি পায়। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রশাসনের সাঁড়াশি অভিযানে মশিউরসহ একাধিক শীর্ষ সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার হওয়ার পর পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন আসে।
গত বছর ৫ আগস্টের বিপ্লবের মাধ্যমে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ আবার সন্ত্রাসীদের হাতে চলে যায়। এরপর পুনরায় গোলাগুলির ঘটনা ঘটতে থাকে। তারই ধারাবাহিকতায় গতকাল ১৯ জানুয়ারি র্যাব-৭ একটি অভিযান চালায়। এ সময় প্রায় ৪০০–৫০০ ভূমিদস্যু র্যাবের ওপর হামলা চালায়। মাইকে গেট বন্ধ করার ঘোষণা দেওয়া হয় এবং আরও মানুষকে র্যাবের ওপর হামলায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়। এই অভিযানে র্যাবের ডিএডি পদমর্যাদার কর্মকর্তা মো. মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হন।
বর্তমান সরকার জঙ্গল সলিমপুরকে ঘিরে একটি বিশাল মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। প্রশাসনের লক্ষ্য এখানে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার স্থানান্তর, আন্তর্জাতিক মানের স্পোর্টস ভিলেজ, আইকনিক মসজিদ এবং একটি আধুনিক ‘নাইট সাফারি পার্ক’ গড়ে তোলা। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জঙ্গল সলিমপুরকে পরিকল্পিত উপশহর ও পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে, যাতে প্রকৃতির কোনো ক্ষতি না হয়।
সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন দীর্ঘদিন ধরে সেখানে বসবাসকারী সাধারণ মানুষ। প্রশাসনের উচ্ছেদ অভিযানের মুখে তারা ভিটেমাটি হারানোর আতঙ্কে রয়েছেন। তবে জেলা প্রশাসন বারবার আশ্বস্ত করেছে, কেবল প্রকৃত ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং বাস্তুচ্যুত সাধারণ মানুষের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
পরিবেশবাদীরা বলছেন, জঙ্গল সলিমপুরের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় নির্বিচারে পাহাড় কাটা বন্ধ করা জরুরি। উন্নয়নের নামে যেন পাহাড়ের প্রাণবৈচিত্র্য ধ্বংস না হয়—সেদিকে কঠোর নজরদারির দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
এমকে/আরটিএনএন
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!